সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির ধর্ম ইসলাম

ইসলামের মূল শিক্ষা শান্তি, সৌহার্দ্য, সহমর্মিতা ও মানবিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করা। ইসলাম শব্দটির অর্থই হলো শান্তি ও আত্মসমর্পণ। অর্থাৎ মহান আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের মধ্যেই মানুষের ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হয়। কোরআন ও হাদিসে মানবজাতির মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা, সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্ব গড়ে তোলার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়, ইসলাম সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির ধর্ম।

কোরআনে ভ্রাতৃত্বের ঘোষণা : ইসলাম মানুষের মধ্যে জাতি, বর্ণ, ভাষা বা গোত্রভিত্তিক বিভেদ দূর করে মানবিক ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যেন তোমরা একে অপরকে চিনতে পারো। আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বাধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।’ (সুরা হুজুরাত ১৩) এই আয়াত প্রমাণ করে, ইসলামে সব মানুষ সমান মর্যাদার অধিকারী। এখানে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির ভিত্তি হিসেবে তাকওয়াকে নির্ধারণ করা হয়েছে, কোনো জাতিগত বা সামাজিক শ্রেষ্ঠত্বকে নয়।

শান্তি ও সদাচরণের নির্দেশ : ইসলাম কেবল মুসলমানদের মধ্যেই নয়, বরং সব মানুষের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের শিক্ষা দেয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না তাদের প্রতি সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে, যারা তোমাদের সঙ্গে ধর্মের ব্যাপারে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের দেশ থেকে বের করে দেয়নি।’ (সুরা মুমতাহিনা ৮) এই আয়াত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গেও সদাচরণ ও ন্যায়বিচার ইসলামের অন্যতম নীতি। এটি সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

নবীজির সম্প্রীতি : হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন মানবতার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তার পুরো জীবনই ছিল সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বাস্তব দৃষ্টান্ত। মক্কা বিজয়ের দিন তিনি তার ওপর বছরের পর বছর নির্যাতনকারী শত্রুদেরও ক্ষমা করে দেন। তিনি ঘোষণা করেন, ‘আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। তোমরা সবাই মুক্ত।’ এই ক্ষমাশীলতা ও উদারতা মানব সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার অনন্য দৃষ্টান্ত।

মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্ক : ইসলাম মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বকে ইমানের অংশ হিসেবে গণ্য করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা একে অপরকে ভালোবাসবে না।’ (সহিহ মুসলিম) এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক ভালোবাসা শুধু সামাজিক গুণ নয়, বরং ইমানের অপরিহার্য অংশ।

প্রতিবেশী ও সমাজের অধিকার : ইসলাম প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘জিবরাইল আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে এত বেশি উপদেশ দিতে থাকলেন, আমার মনে হলো প্রতিবেশীকে বুঝি উত্তরাধিকারী করে দেওয়া হবে।’ (সহিহ বুখারি)

সহনশীলতা ও ভিন্ন মতের সম্মান : ইসলাম মতভিন্নতাকে দমন নয়, বরং সহনশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করতে শেখায়। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘ধর্মের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।’ (সুরা বাকারা ২৫৬) এই নীতির মাধ্যমে ইসলাম চিন্তার স্বাধীনতা ও পারস্পরিক সম্মানের শিক্ষা দেয়, যা সমাজে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য অপরিহার্য।

অন্যায় ও সহিংসতার বিরোধিতা : ইসলাম কোনো প্রকার অন্যায়, জুলুম ও সহিংসতাকে সমর্থন করে না। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘ন্যায়বিচার করো, কারণ তা তাকওয়ার নিকটতর।’ (সুরা মায়েদা ৮) ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ছাড়া সমাজে প্রকৃত সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি সম্ভব নয়। তাই ইসলাম ন্যায় ও ইনসাফকে শান্তির মূলভিত্তি হিসেবে স্থাপন করেছে।

আলোর পথে আহ্বান : ইসলাম মানবতার জন্য শান্তি ও সম্প্রীতির এক পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা। কোরআন ও হাদিসে ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। আজকের বিভক্ত ও অস্থির বিশ্বে ইসলামের এই শিক্ষা বাস্তবায়িত হলে মানবসমাজে প্রকৃত শান্তি, সহাবস্থান ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হবে।

লেখক : মুহতামিম, জহিরুল উলুম মহিলা মাদরাসা, গাজীপুর