উভয় জগতে পাপের পরিণতি

পাপ মানুষকে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। পাপ কেবল আখেরাতের নয়, দুনিয়ার জীবনকেও বিষাক্ত করে তোলে। তাই পাপের স্বরূপ ও তার পরিণতি সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রতিটি মুমিনের জন্য অপরিহার্য।

পাপ মানে অপরাধ বা আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করা। প্রতিটি পাপের একটি মানসিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক পরিণতি আছে। দেহে রোগ হলে যেমন মানুষ দুর্বল হয়, তেমনি পাপ করলে আত্মাও দুর্বল হয়। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন, ‘বান্দা যখন কোনো গুনাহ করে তখন তার হৃদয়ে একটি কালো দাগ পড়ে। পরে যখন সে গুনাহ থেকে বিরত হয়, ক্ষমা প্রার্থনা ও তওবা করে তখন তার হৃদয় উজ্জ্বল হয়ে যায়। কিন্তু সে যদি (গুনাহের) পুনরাবৃত্তি করে তবে কালো দাগ বৃদ্ধি পায়। এমনকি তার হৃদয়ের ওপর তা প্রবল হয়ে ওঠে। এই অবস্থাটিকেই আল্লাহ ‘মরচে পড়া’ বলে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ সুরা মুতাফফিফিনের ১৪ নম্বর আয়াতে বলেন, ‘কখনো নয়, বরং এদের কৃতকর্মের দরুন এদের হৃদয়ে মরিচা (জং) ধরেছে।’ (তিরমিজি ৩৩৩৪)

সুতরাং প্রতিটি পাপ অন্তরের ওপর একেকটি আঘাতের মতো। যত বেশি পাপ হয়, তত বেশি অন্তর আঘাতপ্রাপ্ত হয়। এতে অন্তর থেকে ভালো-মন্দের পার্থক্য মুছে যায়, মানুষ সত্য থেকে দূরে সরে যায়। পাপের কারণে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। কয়েকটি উল্লেখ করা হলো।

রিজিক সংকুচিত হওয়া : হিংসা, প্রতারণা, মিথ্যা, অন্যায় প্রভৃতি পাপের কারণে রিজিকের বরকত চলে যায়। আয় হয়তো থাকে, কিন্তু শান্তি থাকে না, রিজিক সংকুচিত হয়ে যায়। হজরত সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ পাপের কারণে রিজিক থেকে বঞ্চিত হয়।’ (ইবনে মাজাহ ৪০২২)

দোয়া কবুল না হওয়া : পাপ আল্লাহর সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের পথ বন্ধ করে দেয়। অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ ভোগকারী ব্যক্তি দোয়া করলেও আল্লাহ সে দোয়া কবুল করেন না। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ পাক-পবিত্র। তিনি কেবল পাক-পবিত্র বস্তুকেই কবুল করেন।’ তাই পাপ বর্জন ছাড়া আর উপায় নেই। কেননা পাপ বর্জন না করলে মহান আল্লাহ আমাদের কোনো দোয়া কবুল করবেন না। ফলে আমাদের পরকাল ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

হৃদয় কঠোর হওয়া : হৃদয় যখন আল্লাহভীতি হারায়, তখন মানুষ পাপকে স্বাভাবিক মনে করে। আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন, ‘পাপের শাস্তিগুলোর মধ্যে একটি হলো, এগুলো অন্তরকে মেরে ফেলে। আর মৃত হৃদয়ের লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে যায়। কারণ সে আর মন্দকে মন্দ মনে করে না, ভালোকে ভালো মনে করে না, সৎকর্মকে চিনতে পারে না এবং অসৎকর্মকে নাকচও করতে পারে না।’ ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) আরও বলেন, ‘পাপকাজে অন্তর মরে যায়, এর জ্বলন্ত প্রমাণ হলো, মানুষ পাপকাজে আনন্দিত হয়, অনুতপ্ত হয় না।’

পাপের শাস্তি : পাপের জন্য প্রথমে দুনিয়াতেই শাস্তি পেতে হয়। আর আখেরাতের শাস্তি তো অনিবার্য। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ শাস্তি হলো আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়া।

পাপ নীরব ঘাতকের মতো, যা ধীরে ধীরে অন্তরকে অন্ধকারে ডুবিয়ে দেয়। রিজিকের সংকট, দোয়া কবুল না হওয়া, হৃদয়ের কঠিন হয়ে যাওয়া এবং আখেরাতের ভয়াবহ শাস্তি, এ সবই পাপের অনিবার্য পরিণতি। তবে আল্লাহর রহমত অপরিসীম। তওবা ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে মরিচা ধরা অন্তরও আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারে। তাই প্রতিটি মুমিনের উচিত, পাপ থেকে বিরত থেকে আল্লাহমুখী জীবন যাপন করা এবং ক্ষমা প্রার্থনায় সদা সচেষ্ট থাকা। এটিই দুনিয়া ও আখেরাতের মুক্তির একমাত্র পথ।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা