কওমি মাদ্রাসায় কৃতিত্বের সঙ্গে একযুগ শিক্ষকতা করেছেন মুফতি মিয়াদাদ হক আবদুল্লাহ। উদার চিন্তা-ভাবনা, শিক্ষাদান পদ্ধতি ও সম্মোহনী আচরণের কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিলেন তুমুল জনপ্রিয়। সম্প্রতি অনার্স সম্পূর্ণ করেছেন মসজিদে হারামের কলেজ থেকে। গবেষণা করছেন উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মিশআল বিন হুমাইদ আল-লুহাইবির অধীনে। কওমি মাদ্রাসার নানা বিষয়ে কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। অনলাইনে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুফতি আতিকুর রহমান
দেশ রূপান্তর : অভিভাবকরা কোন বিষয়গুলো বিবেচনা করে সন্তানকে কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি করবেন বলে মনে করেন?
মুফতি মিয়াদাদ হক আবদুল্লাহ : একজন অভিভাবক আখেরাতের চিন্তা করেই সন্তানকে মাদ্রাসায় দিয়ে থাকেন। সাধারণত তাদের ইখলাসের মাঝে কোনো কমতি থাকে না।
দেশ রূপান্তর : কওমি মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থায় কী ধরনের পরিবর্তন বা সংযোজন সময়ের দাবি বলে মনে করেন?
মুফতি মিয়াদাদ হক আবদুল্লাহ : কওমি মাদ্রাসার সিলেবাসে দুটি অংশ রয়েছে। একটি অংশে হাত দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যেমন ওপরের স্তরের কিতাবগুলো কেউ পরিবর্তন করতে চান না। ধরুন, সহিহ বুখারি পরিবর্তনের দাবি তো কেউ করেনি। যারা পরিবর্তন চান, তারা আসলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের বিভিন্ন সহায়ক ইলম, যেমন ব্যাকরণ বা ভাষাবিষয়ক কিতাবের কথা বলে থাকেন। এগুলো প্রয়োজন অনুসারে পরিবর্তন করা যেতে পারে। স্বয়ং দারুল উলুম দেওবন্দের সিলেবাসে পরিবর্তন হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। দারুল উলুম করাচির সিলেবাসেও পরিবর্তন হয়েছে।
আমি বক্তিগতভাবে কওমি মাদ্রাসার সিলেবাসের মাঝে বাড়তি কিছু যোগ করার পক্ষে নই। বরং বিভিন্ন উপকারী জ্ঞান, যেমন ইংরেজি ভাষা, বাংলা ভাষা, সাংবাদিকতা, অর্থনীতি ইত্যাদি বিষয়ের জন্য কওমি মাদ্রাসায় আলাদা বিভাগ চালু করার পক্ষপাতি। যারা আগ্রহী হবেন, তারা এসব জ্ঞান অর্জন করবেন। আমার ধারণা, এতে কারও আপত্তি থাকার কথা নয় এবং কওমি শিক্ষার্থীরা সমাজের বিভিন্ন স্তরে কাজ করার সুযোগ পাবেন।
সমাজের সব ছাত্রকে আলেম বানাবো, এটা বাস্তবসম্মত চিন্তা নয়। বরং সবাই ফরজ পরিমাণ জ্ঞানের অধিকারী হবে। তাই ভাগ করতে হবে, কে আলেম হবে, কে ব্যবসায়ী হবে, কে ডাক্তার হবে। আমি স্বপ্ন দেখি, আমরা নিজেরা স্কুল ও আলিয়া মাদ্রাসা চালু করব। যাতে আমরা আমাদের সমমনা ছাত্রদের দিয়ে বিভিন্ন খেদমত নিতে পারি।
দেশ রূপান্তর : কওমি মাদ্রাসা থেকে পড়াশোনা সম্পন্ন করে প্রতি বছর ২০-৩০ হাজার শিক্ষার্থী কর্মজীবনে প্রবেশ করছেন। কর্মক্ষেত্র সীমিত হওয়ায় অনেকেই সমস্যায় পড়ছেন। কেউ কেউ নিজেরাই মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করছেন। কিন্তু গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা না করে তাদের অন্য পেশায় চলে যাওয়াই কি উচিত নয়? অন্য পেশায় যদি যায়, তাহলে সেটার বন্দোবস্ত তো শিক্ষাব্যবস্থায় থাকতে হবে। এর সমাধান কীভাবে হতে পারে বলে মনে করেন?
মুফতি মিয়াদাদ হক আবদুল্লাহ : ধরলাম, কোনো একদিন আমরা বাংলাদেশের নব্বই হাজার গ্রামের প্রতিটিতেই একটি করে মক্তব চালু করলাম। সব মসজিদে যোগ্য ইমাম দিয়ে ফেললাম। সব মাদ্রাসার ওস্তাদের জোগান দিলাম। তখন আমাদের ফারেগ হওয়া ছাত্ররা কোথায় নতুন মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করবে?
আমাদের পূর্বসূরি আলেমদের প্রায় সবাই কোনো না কোনো পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ইমাম আবু হানিফা, ইমাম বুখারি, ইমাম মুসলিম (রহ.)-সহ সবারই আলাদা পেশাগত পরিচয় ছিল। হাদিস বর্ণনাকারীদের নামের পাশেও তাদের পেশাগত উপাধি দেখা যায়। ইসলাম কখনই একজন আলেমকে শিক্ষকতা ছাড়া অন্য কোনো পেশা গ্রহণে নিরুৎসাহিত করেনি। বরং উৎসাহিত করেছে।
একজন আলেমের কাজ হলো, সে সারা দুনিয়ার যে প্রান্তেই থাকুক না কেন নিজের ইলমের চর্চা করা এবং ইলম প্রচারে লিপ্ত হওয়া। এ দুটি কাজ করার জন্য মাদ্রাসার প্রয়োজন নেই। সে তার ব্যবসার মাঝেও ইলম প্রচার করতে পারে, চাকরিক্ষেত্রেও ইসলামের দাওয়াত দিতে পারে।
হ্যাঁ, কিছু আলেম এমন থাকবেন যারা পাঠদান ও রচনার কাজেই শতভাগ নিমগ্ন থাকবেন। তাহলে আশা করা যায়, কোনো ক্ষেত্রেই শূন্যতা তৈরি হবে না, ইনশাআল্লাহ।
দেশ রূপান্তর : কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা আরবি ভাষায় পারদর্শী মন্তব্য করে বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী তাদের যথোপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির জন্য সৌদির দুই উপমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন। সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যকার এক বৈঠক শেষে এমন খবর শোনা যায়। এই বিষয়টি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
মুফতি মিয়াদাদ হক আবদুল্লাহ : সরকার যদি এ বিষয়ে উদ্যোগ নেন, তাহলে তা আশাব্যঞ্জক। আরবি ভাষায় দক্ষ হলে মধ্যপ্রাচ্যে বেশ কিছু জায়গাতে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
দেশ রূপান্তর : আপনি মসজিদে হারামের কুল্লিয়া (কলেজ) থেকে অনার্স করেছেন। এক্ষেত্রে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সুযোগ কেমন? আর এটা সম্পন্ন করলে সেখানে কর্মক্ষেত্রে কেমন সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়?
মুফতি মিয়াদাদ হক আবদুল্লাহ : অনেক সুযোগ রয়েছে। আমি দাওরায়ে হাদিসের সার্টিফিকেট দিয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু এখন সম্ভবত আরেকটু কঠিন হয়েছে। তবে সৌদি আরবে আবেদনকারীর বৈধ ইকামা থাকতে হবে। এখানে ভর্তির শর্ত হলো আরবি মাধ্যমে পড়াশোনা চালানোর মতো আরবি জানতে হবে এবং ভর্তি হওয়া অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় সহজ। তবে এই ডিগ্রি উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির সমমানের। এখানে যারা পড়াশোনা করে, তাদের বাইরে কাজ করার সুযোগ থাকে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লে কাজের সুযোগ থাকে না। আর পরিবেশ অনেকটাই কওমি মাদ্রাসার মতো, মসজিদে ক্লাস হয়।
দেশ রূপান্তর : শিশুদের শারীরিক শাস্তির বিষয়টি প্রায়ই গণমাধ্যমে আসে। ইসলামি দৃষ্টিকোণ এবং আধুনিক শিশু মনস্তত্ত্বের আলোকে এই বিষয়টি কীভাবে নিরসন করা যায়?
মুফতি মিয়াদাদ হক আবদুল্লাহ : মক্কা আসার পর একটি বিষয় আমার কাছে খুব বেশি ভালো লেগেছে। এখানে পড়াশোনায় কোনো চাপ নেই। বড়দেরও কোনো চাপ নেই। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে তো কল্পনাই করা যায় না। ইসলামে বাচ্চাদের শাসন করার একটি নীতিমালা রয়েছে। সেটার অনুসরণ করলেই এসব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বলে আমার ধারণা।
দেশ রূপান্তর : ফতোয়া বিভাগে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের সুবাদে আপনি খুব কাছ থেকে সমাজের নানা জটিলতা দেখেছেন, বর্তমান সময়ে কোন ধরনের সামাজিক ও পারিবারিক সংকট নিয়ে মানুষ বেশি ফতোয়া জানতে আসে?
মুফতি মিয়াদাদ হক আবদুল্লাহ : প্রধাণত তালাকের ফতোয়া। তা ছাড়া নামাজ, রোজা, জাকাত, ওয়াকফ ও বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা সংক্রান্ত ফতোয়া আমাদের কাছে আসত।
দেশ রূপান্তর : সৌদি আরবের শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশের সঙ্গে আমাদের দেশের কওমি মাদ্রাসার মৌলিক পার্থক্যগুলো আপনার চোখে কীভাবে ধরা পড়ে?
মুফতি মিয়াদাদ হক আবদুল্লাহ : প্রথমত, শাসন নেই বললেই চলে। দ্বিতীয়ত, সিলেবাসে অতিরিক্ত চাপ নেই। স্কুলেই প্রায় সব পড়া শেষ। বাসায় খুব বেশি পড়ার দরকার হয় না। তৃতীয়ত, অধিকাংশ স্কুল-কলেজ অনাবাসিক। চতুর্থত, পড়াশোনা অনুশীলন ভিত্তিক, শুধু মুখস্থ পড়া না। পঞ্চমত, পরীক্ষাতে খুব বেশি লিখতে হয় না, শুনেছি ইউরোপেও এমন সিস্টেম। অধিকাংশ প্রশ্ন হলো সত্য-মিথ্যা, শূন্যস্থান পূরণ, সঠিক উত্তর নির্বাচন। তবে ভালো করে না পড়লে, নব্বই প্লাস নম্বর তোলা খুবই কঠিন।
দেশ রূপান্তর : প্রবাস জীবনে সৌদি আরবের সংস্কৃতি ও সমাজব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের সামাজিক মূল্যবোধের কোন দিকগুলো আপনাকে সবচেয়ে বেশি ভাবায়?
মুফতি মিয়াদাদ হক আবদুল্লাহ : এখানে মানুষ তুলনামূলক বেশি সৎ। মিথ্যা বলে খুবই কম। মাপে ও ওজনে কেউ কম দেয় না। সহজে কোনো জিনিস চুরি হয় না। তবে এখানকার আদব-কায়দা উপমহাদেশের তুলনায় কম। যেমন অনেক মানুষ কেবলার দিকে পা মেলে বসে থাকে। মসজিদে জুতা পড়ে হাটে।
দেশ রূপান্তর : এক যুগেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষকতা করার পর এখন প্রবাসে বসে যখন আমাদের ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থার দিকে ফিরে তাকান, তখন কোন কোন অপূর্ণতা আপনাকে সবচেয়ে বেশি ভাবায় বা দ্রুত সমাধান হওয়া উচিত বলে মনে হয়?
মুফতি মিয়াদাদ হক আবদুল্লাহ : আমাদের শিক্ষকদের বেতন খুবই কম। যারা মন দিয়ে শিক্ষকতা করতে চান, তারা অবর্ণনীয় অর্থকষ্টে জীবনযাপন করেন। এটাই আমার সবচেয়ে বেশি কষ্ট লাগে। আরেকটি বিষয় হলো, শিক্ষকদের স্টাফ কোয়ার্টার থাকা উচিত।
দেশ রূপান্তর : আগামী ২০-২৫ বছর পর বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসাকে আপনি কোন অবস্থানে দেখতে চান?
মুফতি মিয়াদাদ হক আবদুল্লাহ : আমাদের কওমি মাদ্রাসায় উচ্চতর গবেষণা করার সুযোগ নেই। আমি চাই, উচ্চতর গবেষণার দুয়ার উন্মুক্ত হোক। শিক্ষকদের যথাযতভাবে মূল্যায়ন করা হোক। কওমির ছাত্ররা বিভিন্ন সেক্টরে কাজ করুক।