ইমানের সৌন্দর্য আনুগত্যে

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৩২ এএম

ইমানের সৌন্দর্য প্রকাশ পায় আনুগত্যে। মহান আল্লাহ কোনো নির্দেশ দিলে মুমিনের কাজ হলো তা গ্রহণ করা। রাসুল (সা.) কোনো বিষয়ে পথনির্দেশ দিলে তা মেনে নেওয়া। নিজের ইচ্ছা, প্রবৃত্তি ও যুক্তিকে আল্লাহ ও রাসুলের নির্দেশের ওপর প্রাধান্য না দেওয়াই প্রকৃত ইমানের দাবি।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা, তোমরা আল্লাহ ও রাসুলের আহ্বানে সাড়া দাও, যখন তিনি তোমাদের এমন বিষয়ের দিকে আহ্বান করেন, যা তোমাদের জীবন দান করে। আর জেনে রেখো, আল্লাহ মানুষ ও তার অন্তরের মাঝে অন্তরায় হয়ে থাকেন এবং তার কাছেই তোমাদের সমবেত করা হবে।’ (সুরা আনফাল ২৪)

এই আয়াতে মহান আল্লাহ মুমিনদের তার ও তার রাসুলের আহ্বানে সাড়া দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ এই আনুগত্যেই মানুষের প্রকৃত জীবন। দুনিয়ায় এর ফল প্রশান্তি, সম্মান, সাহায্য ও কল্যাণ। আর আখেরাতে এর পরিণতি চিরস্থায়ী জান্নাতের নেয়ামত।

ইসলামের প্রকৃত অর্থই হলো আল্লাহ ও তার রাসুলের কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা তার নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ করে তারা যেন তাদের ওপর বিপর্যয় নেমে আসা অথবা যন্ত্রণাদায়ক আজাব পৌঁছার ভয় করে।’ (সুরা নুর ৬৩)

মহান আল্লাহ ও রাসুলের নির্দেশে নিজের ইচ্ছাকে সমর্পণ করাই হলো প্রকৃত আনুগত্য। মুমিনের জন্য আল্লাহ ও তার রাসুল কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিলে নিজের পছন্দকে সেখানে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুযোগ নেই। মহান আল্লাহ বলেন, ‘কোনো মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর জন্য এটা সংগত নয় যে, আল্লাহ ও তার রাসুল কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিলে সেই বিষয়ে তাদের নিজেদের কোনো সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবে।’ (সুরা আহজাব ৩৬)

সাহাবায়ে কেরামের জীবনে আল্লাহ ও রাসুলের নির্দেশে সাড়া দেওয়ার অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। তাদের বিশেষত্ব ছিল নির্দেশ পাওয়ার পর অযথা বিলম্ব না করা। তারা আল্লাহ ও তার রাসুলের নির্দেশকে নিজেদের জীবনের চূড়ান্ত পথনির্দেশ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।

একবার রাসুল (সা.) সাহাবিদের নিয়ে নামাজ পড়ছিলেন। নামাজের মধ্যে তিনি তার জুতা খুলে বাম পাশে রাখলেন। সাহাবিরাও সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের জুতা খুলে রাখলেন। নামাজ শেষে রাসুল (সা.) তাদের কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা বললেন, তাকে জুতা খুলতে দেখে তারাও খুলেছেন। তখন রাসুল (সা.) জানালেন, জিবরাইল (আ.) এসে তাকে জানিয়েছেন, তার জুতায় ময়লা রয়েছে। এরপর তিনি নির্দেশ দিলেন, কেউ মসজিদে এলে জুতায় কোনো অপবিত্রতা বা ময়লা দেখতে পেলে তা যেন পরিষ্কার করে নামাজ আদায় করে। (সুনানে আবু দাউদ)

কেবলা পরিবর্তনের ঘটনাতেও সাহাবিদের আনুগত্যের অসাধারণ দৃষ্টান্ত দেখা যায়। মুসলমানরা প্রথমে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামাজ পড়তেন। পরে কাবার দিকে মুখ করার নির্দেশ এলে সাহাবিরা কোনো দ্বিধা করেননি। কুবা মসজিদের মুসল্লিরা ফজরের নামাজরত অবস্থায় জানতে পারলেন যে কেবলা পরিবর্তন করা হয়েছে। তারা নামাজের মধ্যেই কাবার দিকে ফিরে গেলেন। (সহিহ বুখারি)

এটি ছিল এমন আনুগত্য, যেখানে নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য নামাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয়নি। নির্দেশ পাওয়া মাত্রই তারা তা বাস্তবায়ন করেছেন।

একইভাবে রাসুল (সা.) ছোট একটি বিষয়েও নিষেধ করলে সাহাবিরা সেটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতেন। আবদুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল (রা.) এক ব্যক্তিকে কঙ্কর নিক্ষেপ করতে দেখে তাকে নিষেধ করেন। তিনি জানান, রাসুল (সা.) এ কাজ নিষেধ করেছেন। কারণ এভাবে শিকার করা যায় না, শত্রুকে পরাস্ত করা যায় না। বরং এতে দাঁত ভেঙে যেতে পারে এবং চোখ নষ্ট হতে পারে। পরে ওই ব্যক্তিকে আবার একই কাজ করতে দেখে তিনি কঠোরভাবে আপত্তি জানান। (সহিহ বুখারি)

রাসুল (সা.)-এর একটি নির্দেশ শুনে সঙ্গে সঙ্গে তা পালন করার আরেকটি ঘটনা পাওয়া যায় জাবের (রা.)-এর বর্ণনায়। এক জুমার দিন রাসুল (সা.) খুতবার জন্য দাঁড়ানোর পর বললেন, ‘বসো’। তখন আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) মসজিদের বাইরে ছিলেন। তিনি রাসুলের নির্দেশ শুনেই সেখানে বসে পড়লেন। পরে রাসুল (সা.) তাকে কাছে আসতে বললেন। (সুনানে আবু দাউদ)

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ধর্মীয় নিবন্ধকার

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত