পিলখানা হত্যাকাণ্ডে জীবন দেন সুবেদার নুরুল ইসলাম, বীরত্বসূচক রাষ্ট্রীয় খেতাব দাবি সন্তানের

পিলখানায় বিডিআর হত্যাকান্ডে বীরের মত জীবন দিয়েছেন তৎকালীন কেন্দ্রীয় সুবেদার মেজর নুরুল ইসলাম-এমনটাই দাবি করছে তার পরিবার। এসময় তারা দাবি জানান, বীরত্বসূচক রাষ্ট্রীয় খেতাবের।

মৃত নুরুল ইসলাম লক্ষ্মীপুরের রামগতির চর গাজীর চর লক্ষ্মী গ্রামের বিডিআর নুরুল ইসলামে বাড়ির মৃত লুৎফর করিম মিয়ার পুত্র। মৃত্যকালীন সময়ে এক স্ত্রী, তিন কন্যা ও এক পুত্র রেখে যান তিনি।

নুরুল ইসলামের ছেলে আশরাফুল আলম বলেন, পিলখানায় সে দিন হাজার হাজার জওয়ান হত্যাকাণ্ডের পক্ষে, তারা খুঁজে খুঁজে সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করছেন নৃশংসভাবে। ওই অবস্থায় কোনো কোনো বিডিআর সদস্য এহত্যাকাণ্ডের সমর্থন না করলেও, কেউ ব্যাপক ভাবে প্রতিবাদও করেননি। তার মধ্যেও বিডিআরের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সুবেদার মেজর নুরুল ইসলাম এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিরোধ করতে গিয়ে বীরের মতো জীবন দেন। এর স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ সরকার তাকে বীরের মর্যাদা দিয়েছে। 

২০০৯ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি পিলখানায় দরবারে যোগ দিতে দেরি হয়ে যাবে- এই আশঙ্কায় নুরুল ইসলাম সকালে নাশতা না খেয়েই বাসা থেকে বের হয়ে যায়। সেদিন আমার পরীক্ষা ছিল, বাবা খাবার খেয়ে পরীক্ষা দিতে যেতে বলেছিল, কিন্তু দেরি হয়ে যাবে বলে নিজে না খেয়ে দরবারে চলে যান, এই যাওয়ার ৭ দিন পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে বাবার মৃতদেহ গ্রহণ করি, এই ৭ দিনে এমন কোনো হসপিটাল নেই বা যে যেখানে বলেছে সেখানেই আমরা বাবাকে খুঁজেছি, কেউই বলেনি বাবাকেও মেরে ফেলা হয়েছে।  

আশরাফুল আলম আরও বলেন, ২০০৯ সালে বিডিআর পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহত অন্যান্যের মতো তার বাবার লাশ গণকবর থেকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়। পরে ওই বছরের ৪ঠা মার্চ আমাদের গ্রামের বাড়িতে বাবার লাশ দাফন করি। বাবা ছিলেন খুবই পরহেজগার মানুষ, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন ও কোরআন তিলওয়াত করতেন নিয়মিত। 

তিনি আরও বলেন, পরে শুনেছি, দরবার হলে জওয়ানেরা হত্যাকাণ্ড শুরু করার পর অনেকে যেখানে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছিলেন, সেখানে আমার বাবা কেন্দ্রীয় সুবেদার নুরুল ইসলাম এগিয়ে যান সশস্ত্র জওয়ানদের প্রতিরোধ করতে। হত্যাকাণ্ডে বাধা দেয়ায় হত্যাকারীরা মশারির লোহার স্ট্যান্ড দিয়ে পিটিয়ে তার পর ব্রাশফায়ার করে নৃশংসভাবে হত্যা করে। 

‘বিডিআর সদর দপ্তরে কেন্দ্রীয় সুবেদার মেজর হিসেবে তিনি ছিলেন বিডিআরের প্রতিনিধি। মহাপরিচালকের সঙ্গে তার ছিল সরাসরি দাপ্তরিক সম্পর্ক। 
ঘটনার শুরুর মুহূর্তে মহাপরিচালকের নির্দেশে তিনি মাইকযোগে জওয়ানদের শান্ত হতে বার বার বিভিন্নভাবে অনুরোধ জানান, এগিয়ে যান সশস্ত্র জওয়ানদের প্রতিরোধ করতে, হত্যাকাণ্ডে বাধা দেয়ায় পরে ৪ জন বিডিআর সদস্য তার কাছ থেকে মাইক কেড়ে নিয়ে তাকে লোহার স্ট্যান্ড দিয়ে পিটিয়ে, পেটে ক্ষতবিক্ষত করে, পরে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে গণকবরে রাখা হয়।’

আশরাফুল আলম জানান, পরে তদন্তে বেরিয়ে আসে নুরুল ইসলামের এই বীরত্বের কথা। এ হত্যাকাণ্ডের ছয় মাস পর একমাত্র বিডিআর সদস্য কেন্দ্রীয় সুবেদার মেজর নুরুল ইসলাম রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদের মর্যাদা পান এবং পরবর্তীতে বিজিবির সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ পদকে ভূষিত করে। আমার বাবার এই অসীম সাহসিকতা ও দৃষ্টান্তমূলক আচরণের জন্য সরকার আমার বাবাকে শহীদ ঘোষণা করে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান করে। কর্মজীবনে তিনি চারবার ডিজি পদক পেয়েছেন এবং অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য সরকার তাকে পবিত্র হজব্রত পালন করান। তিনি শ্রেষ্ঠ বিওপি কমান্ডার ও শ্রেষ্ঠ কোম্পানি কমান্ডারের স্বীকৃতি লাভ করেন। চোরাচালান রোধে তিনি পেয়েছেন বিশেষ পুরস্কার।  রাইফেলস ট্রেনিং সেন্টারে প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘ আট বছর। হয়তো তার কোনো ছাত্রের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি। ২০২১ সালে পাদুয়া যুদ্ধে সংগ্রাম ক্যাম্পের ক্যাম্প কমান্ডার ছিলেন তিনি। 

বীরত্বসূচক রাষ্ট্রীয় খেতাব দাবি করে আশরাফুল আলম বলেন, সেদিন দরবার হলসহ পিলখানায় ৯ হাজারের অধিক বিডিআর সদস্য উপস্থিত ছিল এবং সারা দেশে ৫০ হাজারের অধিক বিডিআর সদস্য উপস্থিত খাকলেও কেউই এ হত্যাকাণ্ডে অফিসারদের জীবন রক্ষার্থে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে শাহাদৎবরণ করেনি।  পৃথিবীর ইতিহাসে এ ধরনের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড এবং নৃশংসতা বীরের মত বাধাদানকারী শহীদ হিসেবে আমার বাবাকে বীরত্বসূচক রাষ্ট্রীয় খেতাব প্রদানের মাধ্যমে সম্মানিত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধসহ আবেদন করছি। 

আশরাফুল আলম হান্নান সঠিক তদন্তের মাধ্যমে এ ঘটনার প্রকৃত কুশীলব এবং প্রকৃত হত্যাকারী ও অপরাধীদের বিচার বাস্তবায়ন করা, শহীদ সেনা দিবসটিকে শোক দিবস হিসেবে পালন, শহীদদের মূল্যায়ন ও পরিবারকে সম্মান প্রদানের দাবি জানান।