নিষেধাজ্ঞায় মিলছে না কাঙ্ক্ষিত বরাদ্দ, জেলেদের হাহাকার

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম

সরকারি নিষেধাজ্ঞা এলেই হতাশ হয়ে পড়ে লক্ষ্মীপুরের রামগতি-কমলনগরের মেঘনাপাড়ের জেলেরা। নদীতে মাছ ধরে যাদের জীবন-জীবিকা চলে। সেই তাদেরকে বছরের চার মাসই নিষেজ্ঞার মধ্যে থাকতে হয়।  

মাছের প্রজনন ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বছরে একটা সময় নদীতে সকল ধরনের মাছ ধরা, বাজারজাতকরণ, গুদামজাতকরণ, পরিবহন নিষেধ রাখছে সরকার ৷ এসময় সরকার জেলেদের চাল ও নিত্যপণ্য সামগ্রী বিতরণ করেন। এরপরও অবরোধ হলে জেলেরা খুবই বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েন। নদীতে মাছ শিকার ছাড়া তেমন কোন কাজ তারা শিখেনি। যার কারণে অন্য পেশায় কাজ করতে হিমশিম খেতে হয় তাদের। নিষেধাজ্ঞার মাঝ পথে এসেও হাজার হাজার জেলে বরাদ্দ বঞ্চিত। এসময় এসে সরকারে বরাদ্দ না পেয়ে জেলেদের মধ্যে হাহাকার দেখা দিয়েছে। তাই তো অনেক উপকূলীয় জেলেরা সুযোগ পেলেই নিষেধজ্ঞা অমান্য করে নদীতে নেমে পড়েছেন।

কমলনগর মৎস্য অফিস জানায়, এ উপজেলায় সাড়ে ১১ হাজার নিবন্ধিত জেলে থাকলেও চাল পেয়েছে ৭হাজার ৭শ ও খাদ্য সামগ্রী পেয়েছে দেড় হাজার জেলে। এদিকে নিবন্ধিত জেলের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে আরও কয়েক হাজার মৎস্য শিকার ও নদীতে যাতায়াত করা জেলে। তারা প্রকৃত জেলে হলেও কার্ডধারী বা নিবন্ধিত হতে পারেনি। সাগরের ৬৫দিনের অবরোধে বরাদ্দ পান ১ হাজার ৮১৫জন।

অপরদিকে, রামগতিতে সাড়ে ২১ হাজার নিবন্ধিত জেলের মধ্যে চাল পেয়েছে ১৩ হাজার ৭শ ও খাদ্য সামগ্রী পেয়েছে দেড় হাজার জেলে। আর ৬৫ দিনের নিষেধজ্ঞায় বরাদ্দ পান ১৭ হাজার ৮৬০ জেলে।

বরাদ্দ বঞ্চিতদের একজন জেলে নুরুল ইসলাম বলেন, শিশু কাল থেকে নদীতে নৌকা চালিয়ে সংসার চালাই। প্রায় ২০-২৫বছর ধরে নিজের নৌকা এবং বিভিন্ন মাঝির সঙ্গে মাছ ধরি। তবে আক্ষেপ একটি আমার জেলে কার্ড নেই। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসেও নানা হয়রানির মধ্যে নিবন্ধিত জেলে হতে পারেনি।

সংসারে দুই ছেলে-মেয়ে ও স্ত্রী রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, নদীতে অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞা দিলে চোখে মুখে অন্ধকার নেমে আসে। বছরে চার মাস নদীতে বিভিন্ন ধরনের অবরোধ থাকে। এই চার মাস খুবই কষ্টে ও অসহায়ত্বের মধ্য সংসার জীবন-জীবিকা চালাতে হয়। অন্য কাজও জানা নেই। তারপরও অন্যের জমিতে কাজ করে সংসারে বোঝা সামলাচ্ছি। 

এদিকে, মো. গিয়াস উদ্দিন কালকিনি ইউনিয়ন (মতিরহাট) অরজিনাল মাঝি জেলে কার্ড থাকার পরও চাল পাননি বলে জানিয়েছেন তিনি।

জেলে মো.গিয়াস উদ্দিন জানান, মাছ ধরার বয়স ১৫ বছর, চার সন্তান খেতে-খামারে কাজ করেন। নিবন্ধিত জেলে হলেও কূলহারা মাঝির মত জীবন পার করছেন। ছয়জনের সংসারে নদীতে মাছ ধরা ছাড়া বাড়তি কোনো আয় নেই। সরকারের বরাদ্দকৃত চালের ভাগ তার ভাগ্যে জোটেনি। এক কথায় খুবই আক্ষেপ করেই তিনি কথাগুলো বলেন।

আবুল হোসেন (৫০) চর লরেন্স ইউনিয়নে বাড়ি করে বসবাস করছেন। নদী ভাঙার পর জীবনের তাগিদে নৌকা নিয়ে মেঘনায় মাছ শিকার করেন। জীবনের শেষ সময়ে এসেও জেলে নিবন্ধন করাতে পারেনি।

কয়েকবার জেলে নিবন্ধন করাতে হয়রানির শিকার হন। তবে হাল ছাড়েননি। জেলে নিবন্ধন করতে উপজেলা মৎস্য অফিসের যাতায়াত করছেন।

মো. মোফাজ্জল মাঝি তার বয়স ৫০ হলেও মেঘনার বুকে নৌকা আর জাল নিয়ে কাটিয়েছেন প্রায় ৩০বছর। পেশা জেলে হলেও অন্যদের মতো তিনিও নিবন্ধিত হতে পারেননি। সংসারে খাওয়ার মানুষ ৮জন। তবে অবরোধে সংসার চালাতে খুবই দুর্বিষহ কষ্ট করতে হয় তাকে। একদিকে নিবন্ধিত কার্ড নেই...অন্যদিকে সরকারের বরাদ্দের চাল বা খাদ্য সামগ্রী বঞ্চিত তিনি।

মো.শরীফ জেলে কার্ড থাকার পরও চাল বা খাদ্যসামগ্রী পাননি। ৬ সদস্যের সংসারে চালাতে অবরোধে সময় কৃষিকাজ করেন। অন্যের জমিতে বদলা দেন তিনি। 

নিজাম উদ্দিন মাঝি নদীতে ২২ বছর নৌকা আর জালের সঙ্গে জীবন পার করলেও নিবন্ধিত জেলে হতে পারেনি। নিজের নৌকা জাল ও মাঝি মাল্লা রয়েছে। সংসারে ৭জন সদস্য রয়েছে। সরকারি কোন বরাদ্দ তার ভাগ্যে এখনো জোটেনি। অবরোধে অন্যের জমিতে কামলা করে জীবন চলছে তার।

এ বিষয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা তুয্য সাহা জানান, সরকারের কাঙ্ক্ষিত বরাদ্দ খুবই সীমিত হওয়ায় সব জেলেদের মধ্যে বরাদ্দ পৌঁছে দেওয়া যায় না। শতভাগ বরাদ্দ হলে কিছু স্বস্তি পেত জেলেরা। মেঘনার উপকূলীয় অঞ্চলে হাজার হাজার নিবন্ধিত জেলের মধ্যে অনেক প্রকৃত জেলে বাদ পড়েছে। পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় অবরোধ মানছে না জেলেরা। সুযোগ পেলেই নদীতে নেমে পড়ছে। তবে তাদের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে বলে জানান তিনি।   

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত