জীবনের গতি থেমে নেই। পঙ্গু স্বামী মজনু মাঝিকে হুইলচেয়ারে নিয়ে মানুষের ধারে ধারে ভিক্ষা করে জীবন চালাচ্ছেন বিবি খতিজা বেগম। স্থানীয় আকবর হোসাইন বলেন, মজনু মাঝি মেঘনার ভাঙনে সাত বার বসতি ও ফসলি জমি হারিয়ে নিঃস্ব। জীবন যুদ্ধে উত্তাল মেঘনায় প্রকম্পিত ঢেউয়ে সাহসিকতায় জীবন পার করেন মঞ্জু মাঝি। যার হাঁকডাকে প্রকম্পিত হতো উত্তাল মেঘনার ঢেউ। বিশাল ট্রলার নিয়ে একাই লড়তেন উত্তাল ঢেউয়ে সাহসী মজনু মাঝি। আজ নিথর, নিস্তব্ধ তার জীবন ও জীবিকা। জীবনের শেষ সময়ে কেবলই জীবন্ত পাথর হয়ে বেঁচে রয়েছেন মজনু মাঝি। স্ত্রীর চলার পথে হুইলচেয়ারই তার একমাত্র ভরসা। তবে তার চেয়েও বড় ট্র্যাজেডি লুকিয়ে আছে তার দুই ছেলেকে ঘিরে, যা তাকে আজ ঠেলে দিয়েছে ভিক্ষাবৃত্তির পথে।
তিনি আরও বলেন, মজনু মাঝি ২০১২ সালে মেঘনার ভয়াবহ ভাঙনের শিকার হয়ে উপজেলার চর কালকিনি ইউনিয়ন থেকে এসে লরেন্স ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে বাড়ি করেন। তার ৩ ছেলে ও দুই মেয়ের সংসার ছিল। তিনি সুস্থ থাকা অবস্থায় কোটরিয়া ঘাট, বাতিরঘাট ইত্যাদি জায়গা থেকে মাছ এনে নিজের একটা প্যাডেল চালিত রিকশা ছিল। সেটা দিয়ে মহল্লায় মহল্লায় ঘুরে ঘুরে বিক্রি করতেন। যা উপার্জন হতো তা দিয়েই কোনও রকম সংসার চলত। একটা সময় অসুস্থ হয়ে বড় ছেলে মারা যান। বাবার সঙ্গে সংসারের হাল ধরেন ছোট ছেলে। তিনিও বিভিন্ন ধরনের কাজ করে বাবার সঙ্গে সংসার পরিচালনা করতেন। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, এক বাড়িতে কাজ করতে গিয়ে পানির মোটরের সঙ্গে বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়ে মারা যান। দুটি সন্তান হারিয়ে যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে একদিন মজনু মাঝি স্ট্রোক করেন। একদিকে অসহায় পরিবার অন্যদিকে তার চিকিৎসার খরচ চালানো প্রায় অসম্ভব হয়। অসুস্থতা কারণে তার এক হাত এক পাসহ শরীরের প্রায় অংশ অবশ হয়ে পড়ে। জীবনের গতি সচল রাখতে একমাত্র সম্বল হুইলচেয়ার এবং স্ত্রী। স্ত্রী খতিজা বেগম মজনু মাঝিকে হুইলচেয়ার বসিয়ে বিভিন্ন মানুষের ধারে ধারে হাত পেতে ভিক্ষা করে জীবন চালাচ্ছে।
মজনু মাঝি লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার চর লরেন্স ইউনিয়নের পাঁচ নম্বর ওয়ার্ড এলাকার শহীদনগর এলাকায় এক জীর্ণ ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করছে। মজনু মাঝির বর্তমান বয়স ৭১ বছর বয়স। সঙ্গে রয়েছে ৫৯ বছর বয়সী স্ত্রী বিবি খতিজা।
বিবি খতিজা বেগম বলেন, এমএ পাস করা বড় ছেলে আবুল খায়ের এবং সংসারের হাল ধরা ছোট ছেলে বাবুল দুই ভাই ছিলেন মজনু মাঝির অন্ধের যষ্টি। কিন্তু বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে মুহূর্তেই ছাই হয়ে যায় সব স্বপ্ন। ছোট ভাইকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারান বড় ভাইও। চোখের সামনে দুই টগবগে সন্তানের লাশ দেখে স্তব্ধ হয়ে যান মজনু মাঝি। সেই শোক সইতে না পেরে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে প্যারালাইজড হয়ে পড়েন মজনু মাঝি। তখন স্বামী এবং পরিবার ও জীবন চালাতে হুইলচেয়ারে করে তাকে নিয়ে মানুষের ধারে ধারে ভিক্ষা করছি। ভিক্ষা না করলে স্বামীর ওষুধ এবং খাওন জোটে না। দুই মেয়ে গার্মেন্টস করে তাদের জীবন সংসার চালাচ্ছে।
সংবাদকর্মী আমজাদ হোসেন আমু দাবি করেন, সমাজের বিত্তবান আর সহৃদয়বান মানুষের সামান্য সহযোগিতাই পারে এই বৃদ্ধ দম্পতিকে দুই বেলা অন্নের নিশ্চয়তা দিতে। এই মানবিক আবেদনে সাড়া দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে।
