আল্লাহর সঙ্গে বান্দার আন্তরিক মুহূর্ত

আত্মশুদ্ধি ও আত্মগঠনের অনন্য মাধ্যম তাহাজ্জুদ নামাজ। এটি এমন এক শক্তিশালী আমল, যা মানুষের ভেতরের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা, চরম হতাশা ও পাপাচারের তীব্র প্রবণতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। রাতের সেই নিবিড় নির্জনতায় যখন দুনিয়ার সমস্ত কোলাহল স্তব্ধ হয়ে যায় এবং পৃথিবীর মানুষ গভীর নিদ্রায় নিমগ্ন থাকে, তখন মহান রবের সামনে দাঁড়িয়ে যে বান্দা অশ্রুসিক্ত হৃদয়ে মিনতি করে, সে কখনোই শূন্য হাতে ফিরে না। কারণ এই পবিত্র ক্ষণটিই হলো দোয়া কবুলের শ্রেষ্ঠ সময়, যেখানে বান্দা তার স্রষ্টার কাছে সবচেয়ে বেশি আন্তরিক হতে পারে।

তাহাজ্জুদ আরবি শব্দ। এর অর্থ নিদ্রা ত্যাগ করা বা ঘুম থেকে জেগে ওঠা। আরবি ভাষায় এই শব্দটি একটি চমৎকার বৈচিত্র্য বহন করে, এটি যেমন ঘুমানোর অর্থে ব্যবহৃত হয়, ঠিক তেমনি ঘুমের ঘোর কাটিয়ে জেগে ওঠার ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়।

তবে ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, রাতের গভীরে প্রিয় শয্যা ও আরামের ঘুম বিসর্জন দিয়ে মহান আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হওয়াকেই তাহাজ্জুদ বলা হয়। অর্থাৎ এটি কেবল জেগে থাকা নয়, বরং আল্লাহর প্রেমের টানে ঘুমের মায়া ত্যাগ করার এক বিশেষ নাম। এক কথায় তাহাজ্জুদ হচ্ছে, যখন পুরো পৃথিবী ঘুমের কোলে ঢলে পড়ে, তখন একজন মুমিন তার নফস বা প্রবৃত্তিকে জয় করে জেগে ওঠে শুধু তার রবের সন্তুষ্টির জন্য।

তাহাজ্জুদ আত্মাকে শয়তানের প্ররোচনা থেকে রক্ষা করে এবং মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাহাজ্জুদ আদায়কারীদের প্রশংসিত স্থানে অধিষ্ঠিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেন, ‘রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় করো, এটি তোমার জন্য অতিরিক্ত কর্তব্য। শিগগিরই তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রশংসিত স্থানে (মাকামে মাহমুদ) অধিষ্ঠিত করবেন।’ (সুরা বনি ইসরাইল ৭৯) আয়াতটি আমাদের শেখায় যে, বড় কোনো অর্জন বা উচ্চ মর্যাদা পেতে হলে আরাম ত্যাগ করতে হয়। যখন সবাই গভীর ঘুমে মগ্ন, তখন বিছানা ত্যাগের এই কষ্টই বান্দাকে সাধারণের কাতার থেকে তুলে আল্লাহর বিশেষ প্রিয়জনদের কাতারে নিয়ে যায়।

নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ ওই ব্যক্তির ওপর রহমত নাজিল করেন, যিনি রাতে নিদ্রা থেকে জেগে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করেন এবং তার স্ত্রীকে নিদ্রা থেকে জাগিয়ে দেন। অতঃপর তিনি (তার স্ত্রী) তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করেন। এমনকি যদি তিনি (স্ত্রী) ঘুম থেকে জেগে উঠতে না চান, তাহলে তার মুখে পানির ছিটান। (আবু দাউদ) পৃথিবীতে যারা আল্লাহর প্রিয় বান্দা হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তাহাজ্জুদ ছিল তাদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। এই হাদিস আমাদের শেখায় যে, আমরা যদি শ্রেষ্ঠ মানুষদের কাতারে শামিল হতে চাই, তবে আমাদেরও তাদের মতো রাতের নির্জনতাকে বেছে নিতে হবে।

তাহাজ্জুদ কেন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার? এর প্রধান রহস্য নিহিত রয়েছে এর বিশেষ সময়ের মধ্যে। যখন রাত গভীর হয়, পৃথিবীর যাবতীয় শোরগোল স্তব্ধ হয়ে আসে এবং প্রতিটি প্রাণ ঘুমের কোলে ঢলে পড়ে, ঠিক তখনই শুরু হয় এক অলৌকিক রহমতের ক্ষণ। সহিহ হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, রাতের শেষ তৃতীয়াংশে মহান আল্লাহ দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন। এটি তার বিশেষ রহমত ও সান্নিধ্যের এক অপূর্ব প্রকাশ। তিনি তখন কোনো মাধ্যম ছাড়াই তার বান্দাদের সরাসরি ডাকতে থাকেন। মহান রব পরম মমতায় ঘোষণা করেন, ‘কে আছ, যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দেব। কে আছ, যে আমার কাছে কিছু চাইবে? আমি তাকে তা দান করব। কে আছ, যে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। (সহিহ বুখারি)

দুনিয়ার সামান্য কারও সাক্ষাৎ পেতে কত কাঠখড় পোড়াতে হয়। অথচ বিশ্বজাহানের মালিক প্রতি রাতে আপনার আরজি শুনতে নিজেই ডাকছেন। যখন কেউ আপনার কষ্ট জানে না, তখন স্বয়ং রাজাধিরাজ আপনার অপেক্ষায় থাকেন। নিভৃত রাতের এই প্রার্থনা লোকদেখানোমুক্ত এবং কবুলিয়াতের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। যাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, তাহাজ্জুদ তাদের জন্য ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি। এক ফোঁটা চোখের পানিই পারে আপনার ভাগ্য বদলে দিতে, আপনার সারা জীবনের অপূর্ণতাকে পূর্ণতায় বদলে দিতে।

লেখক : শিক্ষার্থী, আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া