হত্যার অভিযোগ সমঝোতা আট লাখ টাকায়

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে এক গাড়ি মেকানিককে ‘চোর’ আখ্যা দিয়ে রাতভর নির্যাতন চালিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে আল সাবিদ হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক নাজমুল হাসান সম্রাট ও হাসপাতালের ব্যবস্থাপক সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে। নিহতের পরিবারের দাবি, ঘটনা ধামাচাপা দিতে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মাহবুবুর রহমান মাহবুবের নেতৃত্বে ৮ লাখ টাকায় পুলিশের সঙ্গে রফাদফা হয়েছে। এ ছাড়া হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব করা হয়েছে বলে অভিযোগ।

গত রবিবার বিকেলে উপজেলার তারাব পৌরসভার রূপসী গন্ধর্বপুর এলাকার রূপসী-কাঞ্চন সড়ক থেকে রনি মিয়া (২৮) নামে ওই মেকানিকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহে নির্যাতনের একাধিক চিহ্ন ছিল। অনুসন্ধানে জানা যায়, রনি মিয়া তারাব পৌরসভার দীঘিবরাব এলাকার বাসিন্দা। তিনি দীর্ঘদিন ধরে মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার ও ট্রাক মেরামতের কাজ করতেন। গত শনিবার বিকেলে রূপসী এলাকায় অবস্থিত আল সাবিদ হাসপাতালের একটি অ্যাম্বুলেন্স মেরামত করতে যান রনি। অ্যাম্বুলেন্সের ইঞ্জিনে জটিল সমস্যা থাকায় তা পুরোপুরি ঠিক করতে পারেননি। এ নিয়ে হাসপাতাল মালিক নাজমুল হাসান সম্রাট ও ব্যবস্থাপক সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে তার বাগ্বিতণ্ডা হয়।

অভিযোগ, এরপর তাকে ‘অ্যাম্বুলেন্স চোর’ আখ্যা দিয়ে হাসপাতালের ভেতর আটকে রেখে রাতভর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। রনির অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব করা হয় বলে পরিবারের দাবি। পরদিন সকালে রনিকে ‘অটো চোর’ সাজিয়ে সম্রাট ও সাদ্দাম আরেক নাটক সাজান।

কয়েক দিন আগে মৈকুলী এলাকার সিরাজুল ইসলামের অটো চুরির ঘটনায় রনিকে দায়ী করে সিরাজুল ও তার মা সিরতাজ বেগমের কাছে তাকে হস্তান্তর করা হয়। রনির অবস্থা আরও খারাপ হলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। পরে সিরাজুল ও তার মা লাশ রাস্তার পাশে বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে হেলান দিয়ে রেখে চলে যান।

এ ঘটনায় নিহতের পরিবারের অভিযোগ সত্ত্বেও মামলা হয় অজ্ঞাতনামা আসামি করে। তদন্ত কর্মকর্তা রূপগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আহসান হাবিব। পুলিশ নাজমুল হাসান সম্রাট, সাদ্দাম হোসেন, সিরাজুল ইসলাম ও সিরতাজ বেগমকে গ্রেপ্তার করে।

পরিবারের দাবি, গত সোমবার বিকেলে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মাহবুবুর রহমান মাহবুব রূপগঞ্জ থানায় গিয়ে ৮ লাখ টাকার বিনিময়ে পুলিশের সঙ্গে রফাদফা করে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এরপর তদন্তকারী কর্মকর্তা দুটি পৃথক নথি করে আদালতে পাঠান। রনিকে ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ দেখিয়ে সম্রাট ও সাদ্দামকে সন্দেহভাজন হিসেবে ৫৪ ধারায় চালান করা হয়।

অথচ এলাকাবাসী জানায়, রনি ছিলেন সুস্থ ও সবল। অন্যদিকে সিরাজুল ইসলাম ও সিরতাজ বেগমের সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। সম্রাট আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন, যা নিয়ে পরিবার ক্ষুব্ধ।

নিহত রনির বড় ভাই জাকির হোসেন বলেন, ‘আমার ভাই কখনো চুরি করেনি। সম্রাট অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করতে ডেকে নিয়ে রাতভর নির্যাতন করে হত্যা করেছে। পুলিশ ৮ লাখ টাকা খেয়ে ভাইকে পাগল সাজিয়ে মামলায় সম্রাট-সাদ্দামের নাম সন্দেহভাজন দেখিয়েছে। আমরা দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।’

রনির নানি খোরশেদা বলেন, ‘আমার নাতি রনিকে সম্রাট ও সাদ্দাম মিলে অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করার কথা বলে ডেকে নিয়ে রাতভর মেরে ফেলেছে। পুলিশ তাদের নাম মামলায় দেয়নি। আমি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে বিচার চাই।’

রনির মা বেবী বেগম বলেন, ‘পুলিশ আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছে, জোর করে সাক্ষ্য নিয়েছে। মামলায় যে সম্রাটের নাম নেই, তার বিচার চাই।’

এলাকার তরুণ চন্দ্র মিশ্র, রেনু বালাসহ অন্তত সাতজন জানান, রনি চুরি-ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত ছিল না। সে ভালো আচরণের মানুষ ছিল। প্রকৃত দোষীদের বিচার দাবি করেছেন তারা।

জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মাহবুবুর রহমান মাহবুব বলেন, ‘আমি রূপগঞ্জ উপজেলা হাসপাতাল অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে যতটুকু দরকার ততটুকু করেছি।’

রূপগঞ্জ থানার ওসি সবজেল হোসেন বলেন, ‘বাদী নিজেই এজাহারে ছেলেকে মানসিক প্রতিবন্ধী উল্লেখ করেছেন। দুজনের সরাসরি সম্পৃক্ততা পেয়েছি, সন্দেহভাজন হিসেবে দুজনকে ৫৪ ধারায় চালান করা হয়েছে। উপযুক্ত প্রমাণ পেলে গ্রেপ্তার দেখানো হবে। টাকা লেনদেনের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।’