কিশোরগঞ্জ-ভৈরব আঞ্চলিক মহাসড়কে পুলিশের নাম ভাঙিয়ে টোকেনের মাধ্যমে মাসিক চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। চালকদের দাবি, নির্দিষ্ট প্রতীকযুক্ত টোকেন কিনলে মাস জুড়ে আর কোনো হয়রানি হয় না। টোকেন না থাকলে কাগজপত্র ঠিক থাকলেও মামলা, রিকুইজিশনসহ নানা ঝামেলার মুখে পড়তে হয়। চালকরা বলছেন, কটিয়াদি হাইওয়ে থানার পরিদর্শক (ওসি) মো. মারগুব তৌহিদের আশকারায় তার ভাগ্নে নাঈম হাসান পুলিশের পোশাক পরে চেকপোস্টে দায়িত্ব পালন করেন। তার কথা না মানলে মারধরসহ নানা হয়রানির শিকার হতে হয়।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পরিদর্শক মারগুব তৌহিদ বলেন, কাজের সুবিধার্থে মাঝেমধ্যে স্বেচ্ছাসেবক নেওয়া হয়। তবে কোনো চাঁদাবাজি হয় না। ভাগ্নেকে পুলিশের পোশাক পরানোর বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান।
কিশোরগঞ্জ-ভৈরব মহাসড়কে প্রতিদিন হাজার হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা, পিকআপ ভ্যান, মাইক্রোবাস ও দূরপাল্লার বাস চলাচল করে। ঢাকা, কিশোরগঞ্জ ও ময়মনসিংহগামী যানবাহনের জন্য ভৈরব একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে সড়কের কটিয়াদি-ভৈরব অংশের কয়েকটি নির্দিষ্ট পয়েন্টে চেকপোস্ট বসিয়ে মাছ, দুই পাখি বা বটগাছ প্রতীকযুক্ত টোকেন দেওয়া হয়। যানবাহনভেদে মাসে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। টোকেন থাকলে গাড়ি আর আটকানো হয় না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক বলেন, ‘মাসে ৫০০ টাকা দিলে আর ঝামেলা নেই। না দিলে কাগজ ঠিক থাকলেও মামলা দেয়।’
চালকদের দাবি, কিশোরগঞ্জ থেকে ভৈরব পর্যন্ত ২০-২৫টি সিএনজিচালিত অটোরিকশার সব কাগজ হালনাগাদ। তারপরও চাঁদা না দিলে রেহাই মেলে না। মামলা হলে গাড়ি ছাড়াতে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ পড়ে।
আরেক চালক জানান, হাইওয়েতে গাড়ি আটকালে যার মাধ্যমে মাসিক চাঁদা দেওয়া হয়, তাকে ফোন করলে কিছুক্ষণ পর ছেড়ে দেওয়া হয়।
নিরাপদ সড়ক চাই কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি মো. ফিরোজ উদ্দীন ভূঁইয়া বলেন, টোকেন পদ্ধতিতে ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এতে সড়ক আরও অনিরাপদ হচ্ছে। জড়িতদের আইনের আওতায় আনা উচিত।
চালকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা এ সড়কে চলাচল করে। মাসে ৫০০ টাকা নিলে শুধু সিএনজি থেকেই প্রায় ২৫ লাখ টাকা আদায় হয়। এ ছাড়া দু-তিন হাজার পিকআপ ও অন্যান্য যানবাহন থেকে মাসে অন্তত ১ হাজার টাকা নিলে মোট পরিমাণ দাঁড়ায় অর্ধকোটি টাকার বেশি। কটিয়াদি ও ভৈরবদুই থানা মিলিয়ে এটি কোটি টাকা ছাড়াতে পারে।
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি কিশোরগঞ্জ জেলখানা মোড়সংলগ্ন এক চেকপোস্টে সরেজমিনে পরিদর্শক মারগুব তৌহিদের সঙ্গে পুলিশের পোশাক পরা এক তরুণকে দেখা যায়। নাম জানতে চাইলে প্রথমে তিনি নিজেকে আরিয়ান বলে পরিচয় দেন। পরে প্রশ্নের মুখে জানান, তার নাম নাঈম। পরিদর্শক মারগুব তৌহিদ তাকে নিজের ভাগ্নে বলে স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘বাড়িতে দীর্ঘদিন বেকার ছিল। তাই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি।’ তবে কোনো অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।
এক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ওসির ভাগ্নে ডেকে নিয়ে মারধর করেছে। আরেকজন বলেন, ‘নাঈম টাকা তুলে তার মামাকে দেয়। লাকড়ির গাড়ি ৫০০, গাছের গাড়ি ৮০০, বাঁশের গাড়ি ১ হাজার ৫০০ টাকা।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কিশোরগঞ্জ জেলা যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ফারুকুজ্জামান বলেন, পুলিশের পোশাক অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রতীক। কোনো বেসামরিক ব্যক্তিকে এ পোশাকে দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া শুধু আইনবিরোধী নয়, রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার জন্যও হুমকি।
হাইওয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের ডিআইজি (প্রশাসন) ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, পুলিশের যেকোনো অনিয়ম নজরে এলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভৈরব হাইওয়ে থানার ওসি শওকত হোসেন বলেন, নতুন যোগ দেওয়ায় টোকেন বা চাঁদা-বাণিজ্যের বিষয়ে তিনি অবগত নন। তবে কারও বিরুদ্ধে প্রমাণ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।