আফগানিস্তানের বড় শহরগুলোতে গত বৃহস্পতিবার রাতভর বোমা হামলা চালিয়েছে পাকিস্তানি বাহিনী। আফগানিস্তান পাকিস্তানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় দুপক্ষের দাবি অনুযায়ী, তিন শতাধিক সামরিক-বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। তবে নিহতের সংখ্যা নিয়ে দুই দেশই পরস্পরবিরোধী তথ্য দিয়েছে, যা রয়টার্স স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করতে পারেনি।
এদিকে গতকাল শুক্রবার দুপুরে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ ঘোষণা করেছেন, আফগানিস্তানের তালেবান প্রশাসনের বিরুদ্ধে তারা ‘প্রকাশ্য যুদ্ধ’ চালিয়ে যাচ্ছেন। অবশ্য দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার উত্তেজনা কমাতে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ আহ্বান জানিয়েছে।
পাকিস্তানের নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানিয়েছে, সীমান্ত জুড়ে একাধিক সেক্টরে তালেবানদের বিভিন্ন পোস্ট, সদর দপ্তর এবং গোলাবারুদ ডিপো লক্ষ্য করে আকাশপথ ও স্থলপথে এ হামলা চালানো হয়েছে। তালেবান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ জানিয়েছেন, পাকিস্তানি বাহিনী কাবুল, কান্দাহার এবং পাকতিয়া প্রদেশের বিভিন্ন অংশে বিমান হামলা চালিয়েছে।
পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগানিস্তান তাদের ভূখণ্ডে জঙ্গিদের আশ্রয় দিচ্ছে, যারা পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে। অন্যদিকে তালেবানরা এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, পাকিস্তানের নিরাপত্তা তাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। দীর্ঘদিনের এ বিরোধের জেরে ২৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত জুড়ে এখন দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের শেয়ার করা ভিডিওতে দেখা গেছে, সীমান্ত জুড়ে গোলাগুলির ফলে রাতের আকাশে আলোর ঝলকানি এবং ভারী কামানের শব্দ। কাবুলে হামলার একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, রাজধানীর দুটি স্থান থেকে ঘন কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে এবং একটি বড় অংশে আগুন জ্বলছে। অন্য একটি ভিডিওতে একটি ভবনে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে, যাকে কর্মকর্তারা পাকতিয়া প্রদেশে তালেবানদের একটি সদর দপ্তর বলে দাবি করেছেন।
পাকিস্তানের সরকারি মুখপাত্র মোশাররফ জাইদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে বলেছেন, আফগানিস্তানের লক্ষ্যবস্তুতে পাকিস্তানের পাল্টা হামলা অব্যাহত রয়েছে। আফগানদের ‘বিনা উসকানিতে চালানো হামলার’ প্রতিক্রিয়া হিসেবে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে তিনি বর্ণনা করেন। কাবুলে অবস্থানরত রয়টার্সের প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, প্রচণ্ড বিস্ফোরণ এবং যুদ্ধবিমানের শব্দের পর অনেক অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন শোনা গেছে। জাইদি দাবি করেছেন, এ হামলায় ১৩৩ জন আফগান তালেবান যোদ্ধা নিহত এবং ২০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছে। এ ছাড়া ২৭টি পোস্ট ধ্বংস এবং ৯টি দখল করা হয়েছে।
অন্যদিকে তালেবান মুখপাত্র মুজাহিদ দাবি করেছেন, তাদের হামলায় ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত এবং ১৯টি পোস্ট দখল করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, নানগারহার প্রদেশে ৮ জন তালেবান যোদ্ধা নিহত ও ১১ জন আহত এবং ১৩ জন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) এবং আইএস (ইসলামিক স্টেট) জঙ্গিদের ক্যাম্পে পাকিস্তান বিমান হামলা চালানোর পর থেকেই দেশটিতে উচ্চ সতর্কাবস্থা জারি রয়েছে। কাবুল জানিয়েছিল, ওই হামলায় ১৩ জন বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে। তালেবানরা তখন কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিল যে, তারা এর কড়া জবাব দেবে।
আফগানিস্তানের নানগারহার প্রদেশের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বাখতার নিউজ এজেন্সি একটি ছবি প্রকাশ করেছে, যা তাদের দাবি অনুযায়ী আত্মঘাতী হামলাকারীদের একটি ব্যাটালিয়ন। একটি আফগান নিরাপত্তা সূত্রকে উদ্ধৃত করে সংবাদ সংস্থাটি জানিয়েছে, এ আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীরা বিস্ফোরকভর্তি ভেস্ট এবং কারবোমা নিয়ে বড় ধরনের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
এদিকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের পাল্টাপাল্টি হামলার পরিস্থিতিতে উভয় দেশকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। সংঘাত থামাতে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার পাশাপাশি মধ্যস্থতারও প্রস্তাব এসেছে তাদের পক্ষ থেকে।
জাতিসংঘ : আলজাজিরা লিখেছে, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। সহিংসতা বৃদ্ধি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিকের এক বিবৃতিতে গুতেরেস উভয় দেশকেই আন্তর্জাতিক আইন কঠোরভাবে মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। সংঘাত চলাকালে উভয়পক্ষকেই বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি।
ইরান : সংলাপ ও প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের মাধ্যমে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে তৈরি হওয়া দূরত্ব ঘোচানোর আহ্বান জানিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সংঘাত নিরসনে দুই দেশকে রোজার মাসে আত্মসংযম ও ইসলামি সংহতির কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন।
গতকাল এক্স পোস্টে তিনি বলেন, গঠনমূলক সংলাপ, পারস্পরিক বোঝাপড়া গভীর করা ও কাবুল-ইসলামাবাদের সহযোগিতা উন্নয়নে কোনো সহযোগিতা লাগলে তা দিতে ইরান প্রস্তুত।
রাশিয়া : সীমান্তে জরুরি ভিত্তিতে হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে রাশিয়া। কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় দুই দেশের দূরত্ব ঘোচানো ও সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে দেশটি। পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সম্মত হলে সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতারও প্রস্তাব দিয়েছে ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধরত রাশিয়া।
ভারত : আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বিমান হামলার কঠোর নিন্দা জানিয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এক্সে বলেন, এ হামলা রোজার মাসে চালানো হয়েছে। এটি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা ভিন্ন খাতে চালানোর আরেকটি চেষ্টা।
সম্প্রতি তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেছে ভারত। ইসলামাবাদের অভিযোগ, পাকিস্তানের নিরাপত্তা বিঘিœত করতে আফগানিস্তান ও খোদ পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন গোষ্ঠীকে অর্থায়ন করছে ভারত। যদিও ভারত এ অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে।
তুরস্ক : আলজাজিরা লিখেছে, বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তুরস্কের একটি কূটনৈতিক সূত্র বলেছে, তুরস্কের শীর্ষ কূটনীতিক হাকান ফিদান পাকিস্তান, আফগানিস্তান, কাতার ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে ফোনালাপে চলমান সংঘাত নিয়ে আলোচনা করেছেন।
কাতার : কাতারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুুলআজিজ আল-খুলাইফি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইসহাক দারের সঙ্গে আফগানিস্তানের সঙ্গে সংঘাত নিয়ে ফোনালাপ করেছেন।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলেছে, উভয়পক্ষ উত্তেজনা প্রশমনের উপায় নিয়ে আলোচনা করেছে, যাতে ওই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পায়।
চীন : চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুক্রবার পাকিস্তান-আফগানিস্তাননের সংঘাত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং সংবাদ সম্মেলনে বলেন, চীন নিজস্ব চ্যানেলের মাধ্যমে সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতা করছে। পরিস্থিতি শান্ত করতে চীন গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে আগ্রহী।
যুক্তরাজ্য : ব্রিটেনের পররাষ্ট্র সচিব ইভেট কুপার এক্সে এক পোস্টে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা উভয়পক্ষকে উত্তেজনা প্রশমনে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিতে, বেসামরিক নাগরিকদের আরও ক্ষতি এড়াতে এবং মধ্যস্থতার মাধ্যমে পুনরায় আলোচনায় বসার আহ্বান জানাই।’