তৃষ্ণার্ত আত্মার প্রশান্তি লাভে রমজান

মসজিদে হারামের জুমার খুতবায় গত শুক্রবার শায়খ ড. আবদুর রহমান ইবনে আবদুল আজিজ আস-সুদাইস রমজানকে তাকওয়া অর্জনের মাস হিসেবে তুলে ধরে মহান আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা জানান। রমজানকে তিনি বরকত, কল্যাণ ও আধ্যাত্মিক জাগরণের মাস হিসেবেও আখ্যায়িত করেন, যা মুমিনের জীবনকে জিকির, তেলাওয়াত ও কিয়ামের মাধ্যমে আলোকিত করে। রোজাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষাকারী ঢাল উল্লেখ করে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে পাপ থেকে বিরত রাখলেই রোজার প্রকৃত সুফল অর্জিত হয় এবং এটি তৃষ্ণার্ত আত্মাকে প্রশান্তি এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রেরণা দেয়।

শায়খ বলেন, সেই মহান সত্তার প্রশংসা ও শুকরিয়া জানাই, যিনি আমাদের এমন মাস দান করেছেন, যাতে আমাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও অন্তরাত্মা আল্লাহর গুণগানে সিক্ত হয়। সেই মাবুদের প্রশংসা জানাই, যার অনুগ্রহ প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কেয়ামতের দিনে পুরস্কারপ্রাপ্তির আশায় সর্বক্ষণ তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

হে আল্লাহর বান্দারা! আপনারা আল্লাহকে ভয় করুন। সিয়ামের এই সুগন্ধিময় মাস এবং এর পবিত্র বাতাসের পরশ আপনাদের জন্য কল্যাণকর হোক। মূলত রোজার বিধান কেবল মহান আল্লাহর তাকওয়া অর্জনের জন্যই দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘হে মুমিনরা, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করতে পারো।’ (সুরা বাকারা ১৮৩)

হে মুসলিম সমাজ! আমরা এখন রমজান মাসের ছায়া, দান, সৌন্দর্য ও গাম্ভীর্যের মাঝে অবস্থান করছি। এটি এমন এক সুবাসিত মাস, যার শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ্য এবং যা কল্যাণে ভরপুর। এর বরকতে প্রভাতগুলো আলোকিত হয় এবং শহরগুলো এর পবিত্র সুবাসে আমোদিত হয়। এটি আমাদের তৃষ্ণার্ত আত্মাকে প্রশান্তি এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রেরণা দেয়।

আল্লাহু আকবার! রমজান হলো এক ঐশী পরশ, যা মুমিনের জীবনকে জিকির ও ইবাদতে পূর্ণ করে তোলে। এ সময়ে জবানগুলো তেলাওয়াতে মুখর হয় এবং রোজা ও কিয়ামের (রাতের নামাজ) আলোয় আত্মা উদ্ভাসিত হয়। এটি হৃদয়ে কল্যাণের ঝরনাধারা বইয়ে দিতে এবং পাপের পথ রুদ্ধ করতে এসেছে। এটি আমাদের অনুভূতিতে সওয়াব ও ইহসানের চেতনা জাগ্রত করে। এর ফলে কল্যাণ বিচ্যুত মানুষরা জীবনের সঠিক দিশা পায় পায় এবং বস্তুবাদী মোহ থেকে হালকা হয়। এই সময়ে কান থাকে মনোযোগী, চোখ থাকে অশ্রুসজল, আত্মা হয় বিনম্র এবং হৃদয় হয় আল্লাহভীতু। এটি কবুলিয়তের সুবাতাস, কল্যাণের প্রবাহ এবং শয়তানের পরাজয়ের মাস। কোরআন তেলাওয়াত, মহান আল্লাহর প্রশংসা ও তাসবিহের মাধ্যমে অর্জিত এ এক মহা কল্যাণ। দিনে রোজা আর রাতে তারাবিহ, এভাবেই মুমিনের জীবন আমলে নিবেদিত হয়।

হে ইমানদাররা! আপনাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে বুদ্ধি ও বিবেকের লাগাম দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করুন এবং তাকওয়া ও পরহেজগারির মাধ্যমে রোজাকে ত্রুটিমুক্ত রাখুন। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, রোজা হলো ঢাল স্বরূপ, যার মাধ্যমে বান্দা জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা পায়। (মুসনাদে আহমাদ) তবে এটি তখনই সম্ভব হবে যখন অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে পাপাচার থেকে মুক্ত রাখা হবে, জিহ্বাকে অহেতুক কথা থেকে বিরত রাখা হবে, দৃষ্টিকে হারাম থেকে বাঁচানো হবে এবং হাত-পা মন্দ কাজ থেকে দূরে রাখা হবে। এছাড়া মহান আল্লাহর কাছে পবিত্র ও একাগ্র হৃদয়ে খাঁটি তওবা ও ইখলাসের সঙ্গে প্রার্থনা করতে হবে। জান্নাতুন নাঈমের উচ্চ মকাম ছাড়া এর কোনো প্রতিদান হতে পারে না। তাই সেসব রোজাদার ও নামাজিদের জন্য সুসংবাদ!

হে মুসলিমরা! আমাদের এই মহান শরিয়ত মুসলিমদের পবিত্র করা এবং তাদের উচ্চ মর্যাদায় আসীন করার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে। কল্যাণকর কাজে প্রতিযোগিতা এবং শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্য এই বরকতময় মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ সময় আর কী হতে পারে? রমজান হতে পারে অনুপ্রেরণা ও স্থায়ী প্রভাব তৈরির এক উৎস।

এটি কেবল আত্মশুদ্ধিই নয়, বরং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে একজন মুসলিমের ইতিবাচক ভূমিকা নিশ্চিত করে। রোজার আধ্যাত্মিক শিক্ষাকে একটি স্থায়ী কর্মপদ্ধতিতে রূপান্তর করতে হবে, যা মানুষের মূল্যবোধকে সুদৃঢ় করবে। এটি জ্ঞান, কর্ম, ইবাদত ও আচরণের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করে এবং মধ্যপন্থা অনুসরণের শিক্ষা দেয়। অনুপ্রেরণা হলো একটি নিয়ত ও সংকল্প, আর স্থায়িত্ব হলো সেই জারি থাকা কল্যাণ, যা পরকালের পাথেয়। উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, মহান আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল কোনটি? তিনি বলেন, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা অল্প হয়। (সহিহ মুসলিম)

হে মুসলিম উম্মাহ! রমজান কেবল নির্দিষ্ট সময়ের ইবাদতের মাস নয়, বরং এটি সারা বছরের জন্য একটি স্থায়ী অনুপ্রেরণার উৎস। এটি সবার জীবনে শৃঙ্খলা আনে। এটি বড়দের জন্য নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলার এবং সুন্দর আদর্শ স্থাপনের পদ্ধতি। এটি শিশুদের জন্য রোজার মর্মার্থ বোঝার এবং ইবাদতকে ইতিবাচক অভ্যাসে পরিণত করার মাধ্যম। এটি তরুণদের জন্য স্বেচ্ছাসেবী কাজে অংশগ্রহণের এবং নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়ার সুযোগ। এটি মুসলিম নারীদের জন্য ঘরের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার এক পাঠশালা। এভাবেই এই বরকতময় মাসটি একটি সামগ্রিক জীবনপদ্ধতি ও শিক্ষামূলক সিলেবাসে পরিণত হয়। এটি পরিবর্তনের মাস, যা জীবনকে আরও উন্নত করে।

হে ইমানদার ভাইয়েরা! এই মাসকে নেক আমল, ক্ষমা, উদারতা, হিংসা-বিদ্বেষ ত্যাগ এবং হৃদয়ের পরিচ্ছন্নতার এক সূচনাবিন্দু বানান। আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা, তরুণদের সুশিক্ষা এবং উম্মাহর ঐক্য নিশ্চিত করতে সচেষ্ট হোন। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়া ও আধুনিক প্রযুক্তিকে দ্বীন ও নৈতিকতার সেবায় ব্যবহার করুন। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন যে আল্লাহ আপনাকে এই মাস পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছেন। আমাদের কত পরিচিত মানুষ গত রমজানে আমাদের সঙ্গে ছিল, কিন্তু আজ তারা বিদায় নিয়েছে। আমরা তাদের জন্য জান্নাত কামনা করি।

এই মাসের কৃতজ্ঞতা হলো, বেশি বেশি দান-সদকা করা এবং অভাবীদের পাশে দাঁড়ানো। নবীজি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দানশীল। আর রমজানে তিনি প্রবহমান বাতাসের চেয়েও বেশি দান করতেন। (সহিহ বুখারি)

তাই কল্যাণের পথে প্রতিযোগিতা করুন এবং দোয়ায় মগ্ন হোন। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘যখন আমার বান্দারা তোমার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, আমি তো তাদের কাছেই আছি। আমি আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিই যখন সে আমাকে ডাকে।’ (সুরা বাকারা ১৮৬)

আমরা এখন দান ও সামাজিক সংহতির মাসে আছি। মানুষ চলে যায় কিন্তু তার কাজ রয়ে যায়। তাই নিজের জন্য এমন কাজ বেছে নিন, যা পরকালে আপনার জন্য স্থায়ীভাবে কাজে লাগবে। মহান আল্লাহ আমাদের সওয়াব থেকে বঞ্চিত না করুন। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, কঠিন করতে চান না।’ (সুরা বাকারা ১৮৫)

হে আল্লাহর বান্দারা! আল্লাহকে ভয় করুন। হে মুমিনরা! রোজার মূল লক্ষ্য হলো তাকওয়া অর্জন। এছাড়া এটি ইবাদত, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির ও ইতিকাফের মাধ্যমে দ্বীন রক্ষার প্রশিক্ষণ দেয়। এটি কুপ্রবৃত্তি দমনের মাধ্যমে আত্মরক্ষা, শয়তানের পথ রুদ্ধ করার মাধ্যমে জ্ঞান রক্ষা এবং গিবত-অপবাদ ত্যাগের মাধ্যমে সম্মান রক্ষার শিক্ষা দেয়। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মন্দ কাজ ত্যাগ করল না, তার পানাহার ত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। (সহিহ বুখারি)

এটি সম্পদ রক্ষারও শিক্ষা দেয় অপচয় রোধ ও দান-সদকার মাধ্যমে। জাকাত প্রদানের মাধ্যমে নিজের সম্পদকে পবিত্র ও বৃদ্ধি করুন। রোজা হলো সহমর্মিতা ও ইহসানের নাম। মুসলিম উম্মাহর উচিত, এই মাস থেকে শিক্ষা নিয়ে সারা বছর তা কাজে লাগানো। বিশেষ করে যখন রমজানের প্রথম এক-তৃতীয়াংশ অতিক্রান্ত হয়ে গেছে, তখন বাকি সময়টুকু তওবা ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে কাজে লাগান।

আপনারা সেই মহান নবীর ওপর দরুদ ও সালাম পাঠ করুন, যার নির্দেশ আল্লাহ স্বয়ং দিয়েছেন। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ নবীর জন্য অনুগ্রহ করেন, তার ফেরেশতারা নবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করেন (দরুদ পাঠ করেন)। হে মুমিনরা! তোমরাও তার ওপর দরুদ ও সালাম পাঠ করো।’ (সুরা আহজাব ৫৬)

হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মদ (সা.) ও তার পরিবারের ওপর রহমত ও বরকত নাজিল করুন। হে আল্লাহ! ইসলাম ও মুসলিমদের মর্যাদা দান করুন, সব মুসলিম দেশকে নিরাপদ রাখুন। হে আল্লাহ! ফিলিস্তিন ও মসজিদুল আকসাকে জালেমদের হাত থেকে রক্ষা করুন। হে আল্লাহ! আমাদের রোজা ও নামাজ কবুল করুন এবং আমাদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিন। হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাই আমাদের ক্ষমা করে দিন। আমাদের ও আমাদের বাবা-মাকে ক্ষমা করুন। হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণ দান করুন এবং আগুনের আজাব থেকে রক্ষা করুন।

২৭ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার, মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন

মুফতি আতিকুর রহমান