ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ হরমুজ প্রণালিতেও ছড়িয়ে পড়েছে। এ প্রণালি বন্ধের ঘটনা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অস্থিরতার কারণ হয়ে তেলের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে তুলতে পারে। বিশ্বে ব্যবহৃত জ্বালানির এক-পঞ্চমাংশ জাহাজযোগে এ প্রণালি হয়ে যায়। এর পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ গ্যাসও এ জলপথ দিয়েই বিভিন্ন গন্তব্যে সরবরাহ করা হয়। ইরান এ অঞ্চলে তেলবাহী ট্যাংকারগুলোতে হামলা শুরু করায় এ পথে সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। গত সোমবার ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) এক কমান্ডার বলেছেন, প্রণালিটি ‘বন্ধ’ আর যদি কোনো জাহাজ এ জলপথ পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে সেটি জ্বালিয়ে দেওয়া হবে। ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী এ সংকীর্ণ জলপথে ইতিমধ্যে অন্তত পাঁচটি জ্বালানিবাহী ট্যাংকার হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ও দুজন নিহত হয়েছে। হরমুজ প্রণালির আশপাশে প্রায় ১৫০টি জাহাজ এখন আটকা পড়ে আছে।
আলজাজিরা জানিয়েছে, শুক্রবার ব্যারেলপ্রতি তেলের মূল্য ছিল ৭৩ ডলার। শনিবার ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ হামলা শুরু হওয়ার পর সোমবার তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৯ দশমিক ৪০ ডলারে দাঁড়ায়। সমুদ্রবাণিজ্য এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্ম ‘উইন্ডওয়ার্ডে’র জ্যেষ্ঠ সামুদ্রিক গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষক মিশেল বকম্যান আলজাজিরাকে বলেন, প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচল অন্তত ৮০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। তিনি আরও জানান, ওই অঞ্চলে পণ্যবাহী জাহাজের খরচ ‘অনেক বেড়ে যাচ্ছে’ আর এ নিয়ে ইতিমধ্যে জাহাজ শিল্প চাপে পড়েছে। মেরিটাইম ইন্টেলিজেন্স ও নিরাপত্তা পরিষেবা ‘কন্ট্রোল রিস্কসে’র পরিচালক করম্যাক ম্যাকগ্যারি জানান, শনিবার নাবিকরা ‘প্রণালিটি বন্ধ আছে’ বলে ইরানের কাছ থেকে একটি বার্তা পেয়েছে। ওই এলাকায় থাকা প্রতিটি জাহাজ এটি শুনে থাকবে আর অধিকাংশ জাহাজ থামিয়ে দেওয়ার জন্য এটিই যথেষ্ট, বলেন তিনি। জাহাজ চলাচল অনুসরণ করা পরিষেবা কেপলার দেখিয়েছে, রবিবার ওই প্রণালি দিয়ে সীমিতসংখ্যক জাহাজ চলাচল করছে আর যেগুলো চলেছে তার অধিকাংশই ইরান বা তাদের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার চীনের পতাকাবাহী। বকম্যান জানান, এটা সম্ভব যে কিছু জাহাজ শনাক্তকরণ এড়াতে সম্ভবত তাদের স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ সিস্টেমের সুইচ বন্ধ করে প্রণালিটি পার হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ করা অপরিশোধিত তেলের অধিকাংশই যায় এশিয়ার চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায়। এটি এই পথে সরবরাহ করা তেলের প্রায় ৭০ শতাংশ বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসন। তেলের পাশাপাশি এ জলপথে জেট ফুয়েল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসও (এলএনজি) সরবরাহ করা হয়। ইউরোপের প্রায় ৩০ শতাংশ জেট ফুয়েল আর বৈশ্বিক এলএনজি চাহিদার এক-পঞ্চমাংশ এ পথে সরবরাহ হয়। যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর আর নির্ভরশীল না হলেও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির চাপ কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তাদের ওপরও পড়তে শুরু করবে। ফলে এ অস্থিরতা থেকে তারাও রেহাই পাবে না। কোম্পানিগুলো ঘুরপথে জাহাজ চালাতে বাধ্য হলে সরবরাহের সময় বেশি লাগবে আর তাতে খরচও বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিবিদ ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক রেইচেল জিম্বা জানান, বেশি জ্বালানি উৎপাদন করায় দাম বাড়লে মার্কিন উৎপাদকরা লাভবান হবে কিন্তু ক্রেতারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, ভোক্তা খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে কিন্তু উৎপাদকরা লাভবান হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো কতদিন ধরে এটা চলবে?
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতে জ্বালানি সংকটে ভারত
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের জেরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে ভারত। বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত বর্ধনশীল তেলের বাজারগুলোর মধ্যে অপর্যাপ্ত মজুদ ব্যবস্থার কারণে ভারতই সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়তে পারে। তুরস্কের সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড এ খবর জানিয়েছে। এশিয়ার দুই শীর্ষ জ্বালানি আমদানিকারক দেশ চীন ও ভারত তাদের মোট চাহিদার প্রায় অর্ধেক তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। তবে মজুদের দিক থেকে প্রতিবেশী চীনের তুলনায় ভারত অনেক পিছিয়ে। পণ্য গবেষণা সংস্থা আইসিআইএসের জ্বালানি ও রিফাইনিং বিভাগের পরিচালক অজয় পারমার বলেন, চীনের হাতে অন্তত ছয় মাসের অপরিশোধিত তেল মজুদ রয়েছে। সে তুলনায় ভারতের মজুদ অনেক কম, যা দেশটিকে বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার ফলে আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্বের মোট তেলের পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই পথ দিয়ে সরবরাহ করা হয়। এ ঘটনার প্রভাবে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম মঙ্গলবার প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এ দামকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত জানুয়ারি মাসের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের মোট তেল আমদানির ৫৫ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, যার পরিমাণ দৈনিক প্রায় ২৭ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল। ওয়াশিংটনের চাপে রুশ তেল আমদানি কমিয়ে দেওয়ার পর ২০২২ সালের শেষভাগ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর ভারতের এ নির্ভরতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
গত মাসে ভারতের তেলমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি আইনপ্রণেতাদের জানিয়েছিলেন, ভারতের হাতে ৭৪ দিনের জ্বালানি মজুদ রাখার সক্ষমতা রয়েছে। তবে রিফাইনিং সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো রয়টার্সকে জানিয়েছিল, বর্তমানে ভারতের কাছে যে পরিমাণ মজুদ আছে, তা দিয়ে মাত্র ২০ থেকে ২৫ দিন চলা সম্ভব। সম্ভাব্য এ সংকট মোকাবিলায় ভারত বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহের চেষ্টা করতে পারে। সোমবার দেশটির কেন্দ্রীয় তেল মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে জানিয়েছে, সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় রুশ তেল আমদানিতে আরোপিত ২৫ শতাংশ ট্যারিফ ছাড় দেবে কি না, সে বিষয়ে হোয়াইট হাউজ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, তেলের ক্রমবর্ধমান দাম নিয়ন্ত্রণে গতকাল মঙ্গলবার ট্রেজারি ও জ্বালানি বিভাগ থেকে নতুন পদক্ষেপ ঘোষণা করা হবে।
এশিয়ার দেশগুলো মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া তাদের চাহিদার যথাক্রমে ৯৫ ও ৭০ শতাংশ তেল এ অঞ্চল থেকে নিলেও তাদের মজুদ ব্যবস্থা ভারতের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। জাপানের হাতে ২৫৪ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার হাতে ২০৮ দিনের মজুদ রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের তেলের বড় ক্রেতা না হলেও হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার নেতিবাচক প্রভাব তারা এড়াতে পারবে না। বিশেষ করে ইউরোপ বিমান চলাচলের জ্বালানি বা জেট ফুয়েল সংকটে পড়তে পারে, কারণ তাদের মোট আমদানির ৪৫ শতাংশই আসে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে।