সব কাজে খাঁটি নিয়ত জরুরি

মসজিদে নববির জুমার খুতবায় গত শুক্রবার শায়খ ড. আবদুল্লাহ আল-বুয়াইজান রমজানকে আত্মশুদ্ধি ও তওবার সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে আখ্যায়িত করে এ মাসকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান। রমজান ইবাদত, কোরআন তেলাওয়াত, দান সদকা ও নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মাস, এ মাসে জান্নাতের দরজা খোলা হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ থাকে এবং শয়তানদের শৃঙ্খলিত করা হয় বলে তিনি হাদিস উদ্ধৃত করেন। তিনি রোজাদারদের প্রতি ফরজ, সুন্নত ও নফল ইবাদতে যতœবান হওয়ার এবং সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর তাগিদ দেন। আমল কবুল হওয়ার জন্য একনিষ্ঠতা ও সুন্নাহর অনুসরণের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি সতর্ক করেন যে, অনেক আমলই কবুল না হয়ে প্রত্যাখ্যাত হয় এবং আল্লাহ বান্দার চেহারা নয়, বরং অন্তর ও আমলের দিকে তাকান, তাই প্রতিটি কাজে খাঁটি নিয়ত থাকা জরুরি।

শায়খ বুয়াইজান বলেন, হে আল্লাহর বান্দারা! আপনাদের আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বনের উপদেশ দিচ্ছি। কারণ এটিই ছিল পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সবার জন্য আল্লাহর নির্দেশ। আল্লাহর আনুগত্যই হলো সর্বোত্তম প্রাপ্তি ও অর্জন এবং তার সন্তুষ্টিই হলো শ্রেষ্ঠ লাভ ও লক্ষ্য। জান্নাতকে কষ্টসাধ্য কাজ দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। আর জাহান্নামকে ঘিরে রাখা হয়েছে প্রবৃত্তি দিয়ে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘কেয়ামতের দিন তোমাদের পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে। যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সেই সফল হবে।’ (সুরা আলে ইমরান ১৮৫)

হে মুসলমানগণ! আল্লাহ আপনাদের এই বরকতময় মাস পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে সম্মানিত করেছেন। এটি নিজেকে সংশোধন এবং আয়ু ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই তওবা করার এক সুবর্ণ সুযোগ। তাই রমজানের বিষয়ে মহান আল্লাহকে ভয় করুন। রমজানকে যথাযথভাবে সম্মান করুন, সঠিকভাবে রোজা রাখুন এবং একে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করুন, যা সওয়াব কমিয়ে দেয়। এর প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগান।

হে আল্লাহর বান্দারা! রমজান এক সম্মানিত মাস এবং মহান মৌসুম, যা বরকত ও দানে ভরপুর এবং কল্যাণ ও উদারতায় আচ্ছাদিত। এই মাসে মানুষ নেক কাজে প্রতিযোগিতা করে এবং ইবাদতের দিকে ছুটে যায়। এতে রহমতের দরজাগুলো উন্মুক্ত থাকে এবং সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়।

রমজান হলো ইবাদত ও তওবার মাস, নৈকট্য লাভের মাস, পরিশ্রম ও সাধনার মাস এবং নফসের বিরুদ্ধে জিহাদের মাস। এটি বিনয়, রুকু ও সেজদার মাস। এটি রোজা, কিয়াম (তারাবি-তাহাজ্জুদ), দান-সদকা ও কোরআন তেলাওয়াতের মাস। নবীজি (সা.) তার সাহাবিদের এই মাসের আগমনে সুসংবাদ দিতেন এবং বলতেন, তোমাদের কাছে রমজান এসেছে, যা এক বরকতময় মাস, আল্লাহ তোমাদের ওপর এর রোজা ফরজ করেছেন। এতে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং অবাধ্য শয়তানদের শিকলবদ্ধ করা হয়। এতে এমন একটি রাত রয়েছে, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। যে ব্যক্তি এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো, সে মূলত প্রকৃত কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হলো। (নাসায়ি)

হে রোজাদাররা! আপনারা অত্যন্ত মহিমান্বিত ও শ্রেষ্ঠ সময়ের মধ্যে আছেন, তাই একে নষ্ট করবেন না। বরং একে আল্লাহর নৈকট্য লাভের কাজে ব্যয় করুন। একে ফরজ, সুন্নত ও নফল কাজে ব্যয় করুন। নামাজ, রোজা ও কোরআন তেলাওয়াতে মশগুল থাকুন। জিকির, তাসবিহ, তাহলিল এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর দরুদ ও সালাম পাঠে নিমগ্ন হোন। তওবা, ইস্তিগফার এবং পরাক্রমশালী আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি ও দোয়ায় একে কাজে লাগান। সদকা করা, মিসকিনদের খাওয়ানো, রোজাদারদের ইফতার করানো, আত্মীয়দের খোঁজ-খবর রাখা এবং নেক কাজে একে ব্যয় করুন।

হে আল্লাহর বান্দারা! কল্যাণের পথ অনেক এবং এর দরজাগুলো উন্মুক্ত। তাই প্রতিটি ইবাদত থেকে নিজের অংশ গ্রহণ করুন। এই মাসের মর্যাদা বুঝুন এবং আল্লাহ যেভাবে একে সম্মানিত করেছেন আপনারাও সেভাবে সম্মান করুন। সাবধান! এই মাসের কোনো সময় যেন এমনভাবে না কাটে, যাতে আপনার জন্য কোনো সওয়াব লেখা হলো না।

গাফিলতি বা উদাসীনতা থেকে বেঁচে থাকুন, কারণ এটি এমন এক বিপদ, যা মানুষের কল্যাণ লাভের সুযোগ নষ্ট করে দেয়, আয়ু বৃথা যায় এবং অন্তরকে মৃত করে ফেলে। ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কেয়ামতের দিন কোনো বান্দার পা এক কদমও নড়বে না, যতক্ষণ না তাকে তার জীবন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে যে, সে তা কোন কাজে কাটিয়েছে এবং তার যৌবন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে যে, সে তা কোন কাজে ক্ষয় করেছে। (তিরমিজি)

হে আল্লাহর বান্দারা! নেক কাজের দিকে দ্রুত ধাবিত হোন এবং আমলের সুযোগ ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই কল্যাণের প্রতিযোগিতা করুন। কেউ জানে না, আগামী রমজান সে পাবে কি না বা তার হায়াত কতটুকু। তাই আমলের মাধ্যমে অগ্রসর হোন এবং আপনার অবস্থার ভাষা যেন হয়, হে আমার রব, আমি আপনার দিকে দ্রুত আসলাম যাতে আপনি সন্তুষ্ট হন।

যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর দিকে এক বিঘত অগ্রসর হয়, মহান আল্লাহ তার দিকে এক হাত অগ্রসর হন। আর যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর দিকে হেঁটে আসে, মহান আল্লাহ তার দিকে দৌড়ে আসেন। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘তোমরা তোমাদের রবের ক্ষমা এবং সেই জান্নাতের দিকে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হও, যার প্রশস্ততা আসমান ও জমিনের মতো, যা প্রস্তুত করা হয়েছে মুত্তাকিদের জন্য।’ (সুরা আলে ইমরান ১৩৩) এটি আল্লাহর অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা তিনি তা দান করেন। আর আল্লাহ মহা অনুগ্রহের অধিকারী। আল্লাহ আমাদের জন্য কোরআনকে বরকতময় করুন এবং এর আয়াত ও হেকমত দ্বারা আমাদের উপকৃত করুন।

সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমাদের ইমানের পথে পরিচালিত করেছেন, তার অনুগ্রহে রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছেন এবং তার আনুগত্য ও জিকিরের মাধ্যমে অন্তরের একাকিত্ব দূর করেছেন। তিনি কিছু সময় ও কালকে অন্য সময়ের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং সেগুলোকে বিশেষ ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করেছেন।

হে মুসলমানগণ! নেক আমলই আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম, তাই আমল করার মতো তা কবুল হওয়ার বিষয়েও যতœশীল হোন। কারণ কত আমলই তো বৃথা যায় এবং কত পরিশ্রমই ধুলোয় মিশে যায়। আল্লাহ কেবল মুত্তাকিদের আমল কবুল করেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সুরা মুমিনুনের এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘যারা তাদের দানের বস্তু দান করে আর তাদের অন্তর ভীত শঙ্কিত থাকে’, তারা কি সেই লোক, যারা মদ পান করে ও চুরি করে? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, না, হে সিদ্দিকের কন্যা! বরং তারা হলো সেই লোক, যারা নামাজ পড়ে, রোজা রাখে, সদকা দেয় এবং এই ভয় পায় যে, সম্ভবত তাদের আমল কবুল হবে না। (তিরমিজি) আমল কবুল হওয়ার শর্ত হলো তা সুচারুভাবে সম্পন্ন করা এবং সুন্নাহর অনুসরণ করা।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি এমন কোনো আমল করল যাতে আমাদের এই দ্বীনের নির্দেশনা নেই, তা প্রত্যাখ্যাত। (সহিহ মুসলিম) তাই আপনাদের আমলে মহান আল্লাহর ভয় রাখুন। মহান আল্লাহ আপনাদের চেহারা বা শরীরের দিকে তাকান না, বরং তিনি আপনাদের অন্তর ও আমলের দিকে তাকান। এমন অনেক রোজাদার আছে, যাদের রোজার অর্জন কেবল ক্ষুধা ও তৃষ্ণা। আর এমন অনেক নামাজি আছে, যাদের নামাজে কেবল বিনিদ্র রজনী ও ক্লান্তিই জোটে।

হে আল্লাহর বান্দারা! আমল কবুল হওয়ার অন্যতম নিদর্শন হলো, অবস্থার উন্নতি হওয়া এবং নেক আমলের ওপর অটল থাকা। তাই মহান আল্লাহর নিজেদের পক্ষ থেকে কল্যাণকর কাজ করুন এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ (কর্জে হাসানা) দান করুন। আপনারা যা কিছু অগ্রিম পাঠাবেন, তা মহান আল্লাহর কাছে আরও উত্তম ও মহত্তর প্রতিদান হিসেবে পাবেন। মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান, নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।

হে আল্লাহ! আপনি যা পছন্দ করেন, যাতে সন্তুষ্ট হন আমাদের সেই তৌফিক দান করুন এবং আমাদের আমল কবুল করুন। আমাদেরকে আপনার আনুগত্যে নিয়োজিত রাখুন এবং আপনার ইবাদতে সময় কাটানোর তৌফিক দিন।

হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাই আমাদের ক্ষমা করে দিন। হে আল্লাহ! আমাদের গুনাহ ও ভুলগুলো ক্ষমা করুন, আমাদের দোষগুলো ঢেকে রাখুন, আমাদের চিন্তা ও বিপদ দূর করে দিন এবং আপনার হেফাজতে আমাদের রাখুন।

হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরে ইমানকে প্রিয় করে দিন এবং একে সৌন্দর্যমণ্ডিত করুন, কুফরি ও অবাধ্যতাকে আমাদের কাছে অপছন্দনীয় করে দিন। হে অন্তর পরিবর্তনকারী! আমাদের অন্তরকে আপনার দ্বীনের ওপর অটল রাখুন।

হে আমাদের রব! পথ প্রদর্শনের পর আমাদের অন্তরকে বিচ্যুত করবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান করুন। হে আল্লাহ! আমাদেরকে, আমাদের বাবা-মাকে এবং সব মুমিনকে ক্ষমা করুন। হে আল্লাহ! আমাদের অসুস্থদের শেফা দান করুন এবং মৃতদের ওপর রহম করুন। হে আল্লাহ! ইসলাম ও মুসলিমদের মর্যাদা দান করুন এবং তাওহিদপন্থিদের সাহায্য করুন। সব মুসলিম দেশকে নিরাপদ ও শান্তিময় রাখুন।

হে আল্লাহ! ফিলিস্তিনের মুসলিমদের সাহায্য করুন এবং মসজিদুল আকসাকে জালেমদের হাত থেকে রক্ষা করুন। হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণ দান করুন এবং জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন। আমাদের নবী মুহাম্মদ (সা.) এবং তার পরিবার ও সাহাবিদের ওপর দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক।

২৭ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার, মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন মুফতি আতিকুর রহমান