নবীজি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সময়ে তৎকালীন বিশ্বে প্রভাব বিস্তারকারী দুটি বড় শক্তি ছিল রোমান ও পারসিক (বর্তমান ইরানের অধিবাসী)। এই দুই সাম্রাজ্যের লড়াই সেই সময়ের ভূ-রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল। বিশেষ করে মক্কার কাফের-মুশরেক ও মুসলিমদের মধ্যেও তাদের যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হতো।
প্রাচীন পারস্য বা আজকের ইরানের ইতিহাস বেশ পুরনো। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে কাইরাস, দারিয়ুস ও জেরোকসিসের মতো রাজারা সেখানে বিশাল এক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। ইতিহাসে যা একিমেনিড রাজবংশ নামে পরিচিত। ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত বিশ্ব ইরানকে পারস্য নামেই চিনত। এই পারসিকরা দীর্ঘ সময় ধরে গ্রিক ও রোমানদের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। তারা মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল এক অংশ নিয়ন্ত্রণ করত।
নবীজি (সা.) যখন মক্কায় ইসলাম প্রচার করছেন, তখন রোমানরা পারসিকদের কাছে একের পর এক যুদ্ধে হারতে শুরু করে। ৬১৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে পারসিকরা দামেস্ক জয় করে জেরুজালেম পর্যন্ত দখল করে নেয়। এই ঘটনায় মক্কার মুশরিকরা খুব খুশি হয়েছিল। কারণ পারসিকরা ছিল তাদের মতোই মূর্তিপূজারি। অন্যদিকে রোমানরা ছিল আহলে কিতাব বা আসমানি কিতাবে বিশ্বাসী, যার ফলে মুসলিমরা রোমানদের সমর্থন করত। রোমানদের এই পরাজয় মুসলিমদের মনে কষ্ট দেয়।
ঠিক এই সময়ে কোরআনের সুরা রুমের প্রথম কয়েকটি আয়াত নাজিল হয়। সেখানে আল্লাহ বলেন, ‘রোমানরা পরাজিত হয়েছে নিকটবর্তী এলাকায় এবং তারা তাদের পরাজয়ের পর শিগগিরই জয়লাভ করবে, কয়েক বছরের মধ্যেই। আগের ও পরের সিদ্ধান্ত আল্লাহরই। আর সেদিন মুমিনরা আনন্দিত হবে (সুরা রুম ২-৪)
কোরআনের এই স্পষ্ট ঘোষণা শুনে আবু বকর (রা.) মক্কার কাফেরদের মাঝে প্রচার শুরু করেন যে রোমানরা অচিরেই জয়ী হবে।
এই ঘোষণা শুনে উবাই ইবনে খলফের মতো কাফেররা ঠাট্টা করে এবং আবু বকর (রা.)-এর সঙ্গে বাজি ধরে। তখন পর্যন্ত ইসলামে বাজি ধরা হারাম হয়নি। প্রথমে ৩ বছরের জন্য ১০টি উটের বাজি হলেও পরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশে সময়কাল ৯ বছর এবং উটের সংখ্যা ১০০ করা হয়। কারণ কোরআনে উল্লিখিত ‘বিদউন’ শব্দের অর্থ তিন থেকে নয় বছর।
ভবিষ্যদ্বাণীটি শেষ পর্যন্ত অক্ষরে অক্ষরে ফলে যায়। হিজরতের কয়েক বছর পর ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে যখন মুসলিমরা বদর যুদ্ধে জয়লাভ করে, ঠিক তখনই খবর আসে যে, রোমানরা পারসিকদের চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেছে। এমনকি তারা পারসিকদের প্রধান অগ্নিকুণ্ডটিও ধ্বংস করে দেয়।
কোরআনের এই আগাম বার্তা সত্য প্রমাণিত হওয়ায় মক্কার মুশরিকরা লজ্জিত হয় এবং মুমিনরা দ্বিগুণ আনন্দিত হয়। আবু বকর (রা.) বাজিতে জেতা ১০০ উট গরিবদের মাঝে দান করে দেন।
লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও প্রবন্ধকার