নেপালের নতুন শেরপা ‘বালেন শাহ’

তরুণদের আন্দোলনে সরকার পতনের ছয় মাস পর গত বৃহস্পতিবার নেপালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। পরিবর্তনের দাবিতে তরুণ প্রজন্ম পুরনো রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতৃত্বকে এই নির্বাচনে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে এবং ঘটেছেও তাই। নেপালে প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোকে হটিয়ে ক্ষমতায় যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি), প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন র‌্যাপার থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া সাবেক মেয়র বালেন্দ্র শাহ। দেশটির এই সাধারণ নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত নাম বালেন্দ্র শাহ। নিজের আসনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলিকে হারিয়েছেন তরুণ এই নেতা। দুই দশকের বেশি সময় ধরে নেপালে মূলত তিনটি বড় দল ঘুরেফিরে জোট সরকার গঠন করে ক্ষমতায় ছিল। সাম্প্রতিক নির্বাচনে প্রশ্ন ছিল, তরুণ বা জেনারেশন-জেড ভোটাররা কি নতুন নেতৃত্বকে সামনে আনতে পারবে, নাকি দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারাই আবার ক্ষমতায় থাকবে। বালেন্দ্র শাহের দল আরএসপি এখন সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পথে থাকায় সে প্রশ্নের উত্তরও পাওয়া গিয়েছে। যদিও এই ফলাফল আগে থেকেই অনেকটা আঁচ করা যাচ্ছিল। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সরাসরি ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট পদ্ধতিতে ১৬৫টি এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে ১১০টি আসনের চূড়ান্ত ফল আগামী সপ্তাহের মধ্যে ঘোষণা হওয়ার কথা।

৩৫ বছর বয়সী এই ব্যক্তি ‘বালেন’ নামেই সবার কাছে বেশি পরিচিত। তিনি পড়াশোনা করেছেন স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে। পেশায় তিনি একজন প্রকৌশলী। এ ছাড়া তিনি অনেক বছর নেপালের হিপহপ বা র‌্যাপ গান জগতের সঙ্গে যুক্ত। নেপালি হিপহপ জগৎকে সংক্ষেপে ‘নেফপ’ বলা হয়। তিনি বেশ কয়েকটি গান প্রকাশ করেছেন, যেগুলোতে সামাজিক সচেতনতামূলক বিষয় ফুটে উঠেছে। তার সবচেয়ে পরিচিত গানগুলোর একটি হলো ‘বলিদান’, যা ইউটিউবে কোটিবারের বেশি দেখা হয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে আন্দোলনের সময় দেশটির তরুণদের মধ্যে বালেনের জনপ্রিয়তা বাড়ে। ওই আন্দোলন সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করার কারণে শুরু হলেও মূলত দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে এটি দানা বেঁধেছিল। সেই আন্দোলনে ৭৭ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারানো বিক্ষোভকারী। তৎকালীন নেপালি নেতা কে পি শর্মা অলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

রাজধানী কাঠমান্ডুর মেয়র থাকাকালে রাস্তাঘাট পরিষ্কার রাখা এবং লাইসেন্সবিহীন ব্যবসার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সময় হকার এবং ভূমিহীনদের ওপর পুলিশি পদক্ষেপের জন্য মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো তার সমালোচনা করেছিল। সাধারণত মিডিয়া এড়িয়ে চলা এই র‌্যাপার নির্বাচনী প্রচারের সময় বলেছিলেন যে তিনি ‘পুরো নেপালের প্রার্থী’ হতে চান। কিন্তু নির্বাচনের দিন তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। নিজের সিগনেচার কালো চশমা পরে সাংবাদিকদের ভিড় ঠেলে দ্রুত চলে যান তিনি। নেপালের সংবাদমাধ্যমগুলো মনে করছে, তিনি ক্ষমতায় গেলে এই ধারা অব্যাহত থাকতে পারে। তা সত্ত্বেও, বিবিসির সঙ্গে কথা বলা অনেক তরুণ ভোটার বিশ্বাস করেন, তার তারুণ্য এবং শক্তিই এখন দেশের প্রয়োজন এবং তিনি নেপালের ভবিষ্যতের এক নতুন অধ্যায়ের প্রতিনিধিত্ব করছেন। গত ফেব্রুয়ারিতে বালেন্দ্রের দল আরএসপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করে, যেখানে ১২ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাধ্য হয়ে দেশত্যাগের সংখ্যা কমানোর অঙ্গীকার করা হয়েছে। মূলত বেকারত্ব ও স্বল্প মজুরি নিয়ে সৃষ্ট জনক্ষোভ, যা লাখ লাখ নেপালিকে বিদেশে পাড়ি জমাতে বাধ্য করেছে, সেটিকেই কাজে লাগানোর লক্ষ্য নেয় দলটি।

আগামী পাঁচ বছরে নেপালের মাথাপিছু আয় ৩ হাজার ডলারে উন্নীত করা এবং দেশের অর্থনীতিকে দ্বিগুণ করে ১০০ বিলিয়ন ডলারে নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে দলটি। পাশাপাশি জনগণের জন্য স্বাস্থ্যবীমাসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা বলয় নিশ্চিত করারও জোরালো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তাদের ইশতেহারে। গত বৃহস্পতিবার দেশের পরবর্তী নেতা নির্বাচনের পাশাপাশি নাগরিকরা সংসদের ২৭৫ জন সদস্য নির্বাচনের জন্যও ভোট দেন। নেপালের নির্বাচন পদ্ধতি ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ (সরাসরি নির্বাচন) এবং ‘আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব’ পদ্ধতির সংমিশ্রণ। মোট ১৬৫ জন সংসদ সদস্য সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন। এর অর্থ যে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি ভোট পান তিনিই আসনটি জেতেন। বাকি ১১০ জন সংসদ সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে জাতীয়ভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর পাওয়া ভোটের অনুপাত বিবেচনা করা হয়।