উপন্যাস-থ্রিলারে ঝোঁক

অমর একুশে বইমেলায় এবার কিশোর ও তরুণ পাঠকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে উপন্যাস ও থ্রিলারধর্মী বই। গল্পের বইয়ের পাশাপাশি রহস্য, রোমাঞ্চ ও অভিযানমূলক কাহিনিভিত্তিক উপন্যাস এবং থ্রিলারের বিক্রি চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। প্রকাশক ও বিক্রয়কর্মীরা জানান, কিশোর-তরুণরা এ ধরনের বইয়ের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে, যা মেলার সামগ্রিক বিক্রিতেও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।

গতকাল মঙ্গলবার মেলার ১৩তম দিনে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন প্রকাশনীর স্টলে থ্রিলারধর্মী বই নিয়ে পাঠকদের আগ্রহ ব্যাপক। বই হাতে নিয়ে পড়া, উল্টেপাল্টে দেখা অথবা লেখকের নাম খুঁজে বের করে কেনার দৃশ্য ছিল সর্বত্র। বিক্রয়কর্মীরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রেই থ্রিলার বইয়ের বিক্রি উপন্যাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে।

প্রকাশকদের মতে, মেলায় আগত দর্শনার্থীদের একটি বড় অংশই কিশোর ও তরুণ। তাদের মধ্যেই ক্রেতার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এই পাঠকরা সাধারণত গল্প, উপন্যাস ও থ্রিলারধর্মী বই কিনছেন। তবে অজানা রহস্য, রোমাঞ্চকর ঘটনা, দ্রুতগতির কাহিনি এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার উত্তেজনা থাকায় উপন্যাস ও থ্রিলারের প্রতি তাদের আকর্ষণ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। অনেকে বন্ধুদের পরামর্শে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা দেখে নির্দিষ্ট থ্রিলার বই কিনতে আসছেন বলে জানান বিক্রয়কর্মীরা।

তবে শুধু কিশোর-তরুণ নয়, মধ্যবয়সী ও অপেক্ষাকৃত বয়স্ক পাঠকদের মধ্যেও উপন্যাস ও থ্রিলারের পাঠক রয়েছে। অনেকে দীর্ঘদিনের অভ্যাসের ধারাবাহিকতায় নতুন উপন্যাস ও থ্রিলার সংগ্রহ করছেন। কেউ কেউ জনপ্রিয় লেখকদের নতুন বই খুঁজে নিচ্ছেন স্টল ঘুরে।

বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, মেলার ১৩তম দিনে নতুন বই এসেছে ১৪৬টি। মেলা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত নতুন প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১৪২টি। এর মধ্যে উপন্যাসের সংখ্যা ১৮০টি, যা নতুন প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

মেলায় অংশ নেওয়া বড় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেক স্টলেই উপন্যাস ও থ্রিলার বইয়ের চাহিদা বেশি। অন্বেষা, নালন্দা, মিজান পাবলিশার্স, প্রথমা, ঐতিহ্য, অন্যধারা, কাকলী, অনিন্দ্য, শোভা ও মাওলা ব্রাদার্সসহ বিভিন্ন প্রকাশনীর বিক্রয়কর্মীরা জানান, এবারের মেলায় বিক্রির তালিকায় থ্রিলার বইয়ের অবস্থান বেশ ভালো। তাছাড়া, বরাবরের মতো এবারও হুমায়ূন আহমেদ, জাফর ইকবাল, আনিসুল হক, ইমদাদুল হক মিলন ও সাদাত হোসাইনের বই বিক্রির তালিকায় এগিয়ে রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ বলেন, ‘উপন্যাস পড়তে আমার বেশি ভালো লাগে। উপন্যাসে বিভিন্ন ধরনের মানুষের জীবনগাথা, অনুভূতি ও সংগ্রামের গল্প থাকে। এসব গল্প অনেক সময় আমাকে নাড়া দেয়। তাই সুযোগ পেলেই উপন্যাস কিনে পড়ি। তাছাড়া, থ্রিলারও খুব ভালো লাগে।’

অনন্যা প্রকাশনীর এক বিক্রয়কর্মী জানান, অন্যান্য অনেক বইয়ের তুলনায় উপন্যাস ও গল্পের বই বেশি বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের চাহিদা এখনো সবচেয়ে বেশি। পাঠকরা পুরনো জনপ্রিয় বইয়ের পাশাপাশি নতুন সংস্করণও কিনছেন।

এর মধ্যে মেলায় এসেছে কথাপ্রকাশ থেকে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ‘বক্তৃতাসমগ্র’,  বাতিঘর থেকে তানজিনা হোসেনের ‘সময় এক আশ্চর্য ভবঘুরে’, প্রথমা থেকে মাসউদ আহমাদের ‘লাবণ্যর মুখ’সহ বেশ কিছু বই।

অনিন্দ্য প্রকাশ স্টলের বিক্রয়কর্মীরা জানান, তাদের স্টলে মোশতাক আহমেদের প্যারাসাইকোলোজি থ্রিলার ‘হারানো জোছনার সুর’ ও ‘রুপার সিন্দুকের’ বই দুটি পাঠকদের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছে। পাশাপাশি খান মুহাম্মদ রুমেলের ‘আমাদের চোখে মাকড়সা জাল বোনে’ এবং ‘চোখের পল্লবে ঘুম নামে’ বইও ভালো বিক্রি হচ্ছে।

প্রকাশকরা বলছেন, নতুন প্রজন্মের পাঠকদের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ এখনো শক্ত ভাবে টিকে আছে। বিশেষ করে রহস্য ও রোমাঞ্চধর্মী বইয়ের প্রতি তাদের আকর্ষণ মেলার সামগ্রিক বিক্রিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাই আগামী দিনগুলোতে মানসম্মত উপন্যাস ও থ্রিলারধর্মী বইয়ের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে তারা মনে করছেন।

এদিকে মেলার ১৩তম দিনে বিকেল ৩টায় মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘স্মরণ: সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম’ শীর্ষক আলোচনা। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আহমাদ মোস্তফা কামাল। আলোচনায় অংশ নেন হরিশংকর জলদাস। সভাপতিত্ব করেন খালিকুজ্জামান ইলিয়াস।

আহমাদ মোস্তফা কামাল বলেন, সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের পঠন-পাঠন ও জ্ঞানের পরিধি ছিল অত্যন্ত ব্যাপক। তার লেখার ভঙ্গি ছিল খুব অন্তরঙ্গ, যা প্রাবন্ধিক হিসেবে পাঠকপ্রিয়তা এনে দিয়েছে। প্রবন্ধের প্রচলিত কাঠামো ভেঙে তিনি নতুন এক গদ্যভঙ্গি তৈরি করেছিলেন। সমালোচনা-সাহিত্য ও প্রবন্ধ-সাহিত্যকে তিনি সবসময় উঁচু মর্যাদার আসনে রেখেছেন। তার গল্প ছিল বৈচিত্র্যময়, অভিনব এবং কখনো কখনো অকল্পনীয়। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ছিলেন একই সঙ্গে শিল্পী ও ব্যক্তি মানুষ হিসেবে দরদি। শিক্ষক হিসেবেও তিনি সবার প্রতি সমান মনোযোগ ও ভালোবাসা দেখিয়েছেন। লেখক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও ব্যক্তি মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন অনেক উচ্চস্থানীয়। ‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে নিজের বই নিয়ে আলোচনা করেন গবেষক ইসরাইল খান এবং কবি মুহাম্মদ আবদুল বাতেন।

বিকেল ৪টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন কবি মজিদ মাহমুদ, মঈনুল হাসান, স্নিগ্ধা বাউল ও ড. নাঈমা খানম। আবৃত্তি পরিবেশন করেন সুষ্মিতা জাফর ও তাসনোভা তুশিন। ছিল আলী আশরাফ আখন্দের পরিচালনায় জিয়া সাংস্কৃতিক জোটের পরিবেশনা।

আজকের সময়সূচি:

আজ ১১ মার্চ বুধবার মেলা শুরু হবে দুপুর ২টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৩টায় মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘স্মরণ : এম শমসের আলী’ শীর্ষক আলোচনা। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। আলোচনায় অংশ নেবেন ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী। সভাপতিত্ব করবেন আরশাদ মোমেন। বিকেল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।