চট্টগ্রামে সংঘবদ্ধ চক্রের দায়ের করা মামলার ফাঁদে প্রায় এক যুগ ধরে জমির ক্ষতিপূরণের টাকা পাচ্ছেন না ভূমি মালিকরা। আদালতে মামলা ঠুকে দেওয়ার কারণে চট্টগ্রাম শহরে পৃথক পাঁচটি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা ১৩৯ একর জমির ক্ষতিপূরণের প্রায় ৬৫৭ কোটি টাকা আটকে রয়েছে সরকারি কোষাগারে। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় জমির মালিকদের হাতে ক্ষতিপূরণের চেক দিতে পারছে না জেলা প্রশাসন। জানা গেছে, ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি অধিগ্রহণ করার ক্ষেত্রে সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের জমির প্রকৃত মূল্যের চেয়ে ২০০ শতাংশ অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধ করে থাকে। কিন্তু এ টাকার ওপর নজর পড়েছে দালাল ও মামলাবাজ চক্রের। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন সূত্র বলছে, মামলার ফাঁদে আটকে দিয়ে পরে কমিশন বাণিজ্যে লিপ্ত চক্রটি যাদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা ঠুকে দিয়েছেন, তাদের অনেককেই প্রকৃত জমির মালিকরা চেনেন না।
অভিযোগ আছে, ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় ৮ ধারা (পূর্বের স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল অধ্যাদেশ, ১৯৮২-এর ৭ ধারা) নোটিস জারির পর মানুষকে হয়রানির উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে ‘মামলাবাজ’ একটি চক্র টাইটেল মোকদ্দমা দায়ের করে আসছে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এসব মামলার কারণে একদিকে ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অপরদিকে জমির প্রকৃত মালিকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আনিছুর রহমান খান বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের টাকা কখন ছাড় হবে সে সময়ের জন্য ওঁৎ পেতে থাকে একটি মামলাবাজ চক্র। একটি এলএ (ভূমি অধিগ্রহণ) কেইস ম্যাচিউর হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট জমির মালিককে টাকা গ্রহণের জন্য ৮ ধারার নোটিস দেওয়া হয়। এ সময় চক্রটি সক্রিয় হয়ে ওঠে। ৮ ধারার নোটিস জারির পর চক্রটি তথ্য নিয়ে জমির মালিকের খোঁজে মাঠে নামে। এরপর তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ক্ষতিপূরণের টাকা হাতিয়ে নিতে নানা ফন্দি করে।
এই প্রসঙ্গে ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা আনিছুর রহমান খান বলেন, ‘চট্টগ্রাম শহরের পতেঙ্গা ও হালিশহরে সরকারি পৃথক পাঁচটি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা মোট ১৩৮ দশমিক ৮৪৪১ একর জমির ক্ষতিপূরণ বাবদ ৬৫৬ কোটি ৬৬ লাখ ১২ হাজার ৪১৬ টাকা এক যুগ ধরে পড়ে আছে সরকারি কোষাগারে। আদালতে মামলা চলমান থাকায় ক্ষতিগ্রস্তরা এলএ অফিসের দ্বারে দ্বারে ঘুরলেও ক্ষতিপূরণের চেক দিতে পারছি না।’
উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর মধ্যে চিটাগাং সিটি আউটার রিং রোড নির্মাণ, চিটাগাং সিটি আউটার রিং রোডের ফিডার রোড-১ বন্দর সুবিধাদি সম্প্রসারণ এবং বানৌজা সম্প্রসারণ প্রকল্পের জমি নিয়ে হাইকোর্টে রিট মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে চারটি। চট্টগ্রামের তৃতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালত ও জেলা জজ তৃতীয় আদালতে অপর মামলা চলমান রয়েছে চারটি। এসব মামলার কারণে আটকে আছে ৬৭ কোটি ৯২ লাখ ৬৩ হাজার ৭৬০ টাকা।
একই প্রকল্পের পৃথক এলএ মামলার (০৮/২০১৩-২০১৪) কারণে আটকে আছে ৬৯ কোটি, ৯২ লাখ ৯ হাজার ২০৪ টাকা। এই প্রকল্পের জমি নিয়ে হাইকোর্টে চারটি রিট মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় ক্ষতিপূরণ বিতরণ কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
এলএ শাখা সূত্র জানায়, চিটাগাং সিটি আউটার রিং রোডে ফিডার রোড-১ নির্মাণ প্রকল্পে এলএ মামলা মূলে দক্ষিণ হালিশহর ও উত্তর পতেঙ্গা মৌজায় ৯ দশমিক ৮১১০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। হাইকোর্টে তিনটি রিট মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় ৬৮ কোটি ২৬ লাখ ৫০ হাজার ৪২৭ টাকা পড়ে আছে সরকারি কোষাগারে। বন্দর সুবিধাদি সম্প্রসারণ শীর্ষক প্রকল্পের জন্য এলএ মামলা মূলে দক্ষিণ, মধ্যম ও উত্তর হালিশহরের মোট তিন মৌজায় ৬৬ দশমিক ৮৫৩১ একর জমি অধিগ্রহণ করে সরকার। এই প্রকল্পে মোট ক্ষতিপূরণ ৩৬৪ কোটি, ৮২ লাখ ৯৪ হাজার ৫৮৭ টাকা। হাইকোর্টে রিট মামলা, যুগ্ম জেলা জজ আদালত/জেলা জজ আদালত ৩য় আদালতে অপর মামলা চলমান থাকায় ক্ষতিপূরণের পুরো টাকাই পড়ে আছে সরকারি কোষাগারে।
একইভাবে বানৌজা উল্কা সম্প্রসারণ প্রকল্পের জন্য এলএ মামলা (১৯/২০২৩-২০২৪) মূলে উত্তর পতেঙ্গা মৌজায় ১৪ দশমিক ২১৯০ একর জমি অধিগ্রহণ করে সরকার। উক্ত প্রকল্পে মোট ক্ষতিপূরণ ১৪৮ কোটি, ৬৪ লাখ ৭৪ হাজার ৪৩৮ টাকা। কিন্তু চট্টগ্রামের আদালতে মামলা চলমান থাকায় ক্ষতিপূরণের পুরো টাকা সরকারি কোষাগারে পড়ে আছে। তথ্যসূত্র বলছে, অসংখ্য ভুক্তভোগীকে মামলার ফাঁদে আটকে দিয়ে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ কমিশন বাণিজ্য করছে মামলাবাজ চক্রটি। যারা ২০ থেকে ৪০ শতাংশ টাকা কমিশন দিতে রাজি হচ্ছেন তাদের মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দিচ্ছে চক্রটি। পরে আদালতে হলফনামা জমা দিয়ে চক্রটি ভূমি অধিগ্রহণ শাখা থেকে তুলে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা।
সরকারি একটি সংস্থার তদন্ত অনুযায়ী, মামলার ফাঁদে ফেলে সংশ্লিষ্ট ‘বিবাদীদের’ দায় থেকে আদালতে এফিডেভিট দিয়ে অব্যাহতি দেওয়ার নামে কমিশন আদায়ের এ চক্রে আছে ভূমি অধিগ্রহণ শাখার কতিপয় কানুনগো, সার্ভেয়ার, রাজনৈতিক নেতা, দালাল, আইনজীবী ও সাংবাদিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি। এর চক্রে সবচেয়ে শীর্ষ ব্যক্তি হিসেবে যার নাম পাওয়া যায় তিনি হচ্ছেন ‘ব্রিটিশ আমলের জমিদারের বংশধর’ দাবি করা চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর এলাকার বাসিন্দা এম আহসান উল্লাহর ছেলে মো. রাকিবুল হাসান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মামলার ফাঁদ পাতা চক্রের মধ্যে রাকিবের সঙ্গে আরও রয়েছেন এলএ শাখা থেকে সদ্য ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বদলি হওয়া সার্ভেয়ার মো. আবু ইউছুপ ইফতেখার দিপু। গত কয়েক মাসে দিপু একাই বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ক্ষতিপূরণের অন্তত দেড়শ কোটি টাকা লেনদেন করেছেন। তার বিরুদ্ধে দুটি ফৌজদারি মামলা, সরকারি চাকরিবিধি লঙ্ঘনসহ নানা দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। দিপুর বিরুদ্ধে প্রথম মামলা (নম্বর ১৬) হয় কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় ২০২৪ সালের ৬ সেপ্টেম্বরে, এজাহারে ৪৮ নম্বর আসামি তিনি। দ্বিতীয় মামলা (নম্বর ২২) হয় ২০২৫ সালের ৭ জুলাইয়ে, এজাহারে ১৬ নম্বর আসামি। এসব মামলায় সার্ভেয়ার দিপু জামিন নেননি বলে জানিয়েছেন কুমিল্লা কোতোয়ালি থানার জিআরও উপপরিদর্শক জিল্লুর রহমান।
নগরের মধ্যম হালিশহরে গ্যাসলাইন উন্নয়ন প্রকল্পের (এলএ মামলা নং-৭) জন্য অধিগ্রহণ করা জমির ক্ষতিপূরণ বাবদ ১ কোটি টাকার চেক আনতে গত মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) এলএ শাখায় যান এক ব্যক্তি। এ সময় মামলার অজুহাত দেখিয়ে ওই ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ প্রদানে আপত্তি জানান মামলাবাজ চক্রের প্রধান রাকিবুল হাসান। এ সময় ক্ষুব্ধ হয়ে রাকিবুলকে এলএ অফিসের বারান্দায় মারধর করেন মোশারফ নামে এক আইনজীবী, হেলাল উদ্দিন নামে এক বিএনপি নেতাসহ ১০-১২জন।
জানতে চাইলে রাকিবুল হাসান বুধবার বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সেদিন তেমন কিছু হয়নি। ক্ষতিপূরণের ১০ কোটি টাকা প্রদান করতে এলএ শাখায় আপত্তি দিয়েছিলাম। আমাকে নোটিস দিয়ে ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা আনিছুর রহমান খান তার দপ্তরে শুনানির জন্য ডেকেছিলেন। বিবাদীকেও ডাকা হয়েছিল। কিন্তু এ সময় হঠাৎ করে আইনজীবী মোশারফ আমাকে হেনস্তা করেছেন।’ মামলার ফাঁদে আটকে কমিশন আদায়ের বিষয়টি স্বীকার করে রাকিবুল হাসান বলেন, ‘আমি কিছু লোককে মামলা থেকে অব্যাহতি দিচ্ছি। তাদের সঙ্গে নেগোসিয়েশন হয়েছে। যাদের কাগজ আছে, ক্ষতিপূরণের টাকা থেকে ২০-২২ শতাংশ আমাকে দেওয়া হবে এমন চুক্তির মাধ্যমে মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দিচ্ছি।’
ভুক্তভোগী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘রাকিবুল হাসান একজন চিহ্নিত প্রতারক। উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হলেই তৎপর হয়ে ওঠে তার নেতৃত্বে একটি চক্র। চিটাগাং সিটি আউটার রিং রোড প্রকল্পে আমাদের পৈতৃক ৫ শতক জমি অধিগ্রহণ করা হয়। প্রকৃত মালিক হয়েও আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমিশন দাবি করছে রাকিবুল চক্র। ওই চক্রে এলএ শাখার কিছু সার্ভেয়ারও জড়িত। কারণ তারা জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরুর আগেই রাকিবুল চক্রকে তথ্য দিয়েছেন। ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে এক যুগ এলএ অফিসের দ্বারে দ্বারে ঘুরছি। মামলার ফাঁদে আটকা পড়ে এখন কোনো কূল পাচ্ছি না।’
জাহেদুল ইসলাম নামে আরেক ভুক্তভোগী বলেন, ‘বন্দর সুবিধাদি সম্প্রসারণ প্রকল্পের জন্য ২০১৭ সালে আমার বাবার মালিকানাধীন ৩ শতক জায়গা অধিগ্রহণ করে সরকার। কিন্তু মামলাবাজ চক্র ক্ষতিপূরণের টাকা আটকে দিয়েছে। প্রায় ৮ বছর এলএ অফিসে ঘুরছি। ক্ষতিপূরণের ১ কোটি ২২ লাখ টাকা পাচ্ছি না।’
আহমদ আলী নামে আরেক ভুক্তভোগী বলেন, ‘বছরের পর বছর ঘুরে যখন আপনি ক্ষতিপূরণের টাকা পাবেন না, তখন আপনাকে ‘আশার আলো’ দেখাবে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ ঘুষ বা কমিশন। আর তাতে রাজি হলেই মিলবে ক্ষতিপূরণের সেই টাকা।’