যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি

সিপিডি মনে করে বড় রাজস্ব হারানোর ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় সরকারকে ব্যাংক খাতের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। ব্যয় নির্বাহ করার জন্য চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে ৫৯ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এই অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির ফলে বড় রাজস্ব হারানের ঝুঁকিতে পড়েছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে নির্দিষ্ট কিছু পণ্য কেনার শর্ত থাকায় সরকারের ব্যয়ও বাড়তে পারে।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে নিজ কার্যালয়ে এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)- এর গবেষকরা। জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য এই বেসরকারি গবেষণা সংস্থাটির সুপারিশ তুলে ধরার জন্য এই ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়েছে।

জাতীয় নির্বাচনের কয়েক দিন আগে গত ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রে সঙ্গে ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ বাণিজ্যচুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ। এই চুক্তির বিষয়ে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা প্রায় সাড়ে ৪ হাজার পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে হবে। আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে আরও ২ হাজার ২১০ ধরনের পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার কথা রয়েছে। ফলে এসব পণ্য থেকে সরকারের বছরে প্রায় ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার আমদানি শুল্ক রাজস্ব আসে। চুক্তি কার্যকর হলে সরকার এই রাজস্ব আয় হারাতে পারে। তিনি বলেন, চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে নির্দিষ্ট কিছু পণ্য কেনার শর্ত থাকায় সরকারের ব্যয়ও বাড়তে পারে। এ কারণে চুক্তিটির রাজস্ব আয় ও সরকারি ব্যয়ের ওপর প্রভাব সরকারকে পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে, যা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। তার দাবি, এই চুক্তির বিষয়বস্তু উন্মুক্ত করা প্রয়োজন, কারণ এতে বেশ কিছু আর্থিক ঝুঁকির বিষয় রয়েছে। তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক, কোথা থেকে পণ্য কেনা যাবে বা যাবে না এ ধরনের বিষয়ও এতে জড়িত, যা দেশের সার্বভৌমত্বেও প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার পর এ বিষয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ চাইলে চুক্তিটি পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে।

জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের সুযোগ আছে : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের মধ্যে তেল-গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ বিঘিœত হচ্ছে। তাতে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল একশ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। তবে দেশের জ্বালানি তেলের নিয়ন্ত্রণে সরকারের হাতে কিছু সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মুনাফার বাইরেও জ্বালানির ওপর দেশে প্রায় ২০-২৫ শতাংশ বিভিন্ন ধরনের কর রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে সরকার এই কর কমিয়ে দাম নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পায়।

বর্তমানে দেশে ডিজেল, অকটেন ও অন্যান্য জ্বালানির কয়েক সপ্তাহের মজুদ রয়েছে উল্লেখ করে সিপিডির ফেলো বলেন, বাংলাদেশের বড় সমস্যা হলো, জ্বালানি তেলের কোনো স্থায়ী স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ বা কৌশলগত মজুদ নেই, যা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় রয়েছে। এ ধরনের রিজার্ভ থাকলে সংকটের সময় বাজারে নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব হয়। তবে সরকার বর্তমানে জ্বালানি পরিস্থিতি সামাল দিতে স্পট বায়িং করছে। ভারতের সঙ্গে পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল আমদানির চুক্তিটি পুনরায় চালু করছে। এ ছাড়া প্রয়োজনে মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য বিকল্প উৎস থেকেও জ্বালানি আনার ব্যবস্থা রয়েছে।

সিপিডির এই সম্মানীয় ফেলো সর্তক করে বলেন, আবার বাড়তি দামে জ্বালানি কিনতে রিজার্ভের ওপর যেন চাপ না পড়ে, সেদিকেও সরকারকে নজর রাখতে হবে। সে ক্ষেত্রে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) থেকে ঋণ নেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি স্বল্পমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনার পাশাপাশি মধ্য মেয়াদে জ্বালানি তেলের একটি স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ গড়ে তোলা দরকার, যা বাজারকে নিশ্চয়তা দেবে।

রাজস্ব বড় চ্যালেঞ্জ : মিডিয়া ব্রিফিংয়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেন ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৯ শতাংশ, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থবছরের মধ্যে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ হারে রাজস্ব আদায় করতে হবে, যা বাস্তবে সম্ভব নয়।

তিনি জানান, রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় সরকারকে ব্যাংক খাতের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে ৫৯ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। বিপরীতে ব্যাংকবহির্ভূত ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার ফলে আর্থিক খাতে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহও কমে যাচ্ছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা দেখা দিলে মূল্যস্ফীতির ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে।

বাজেটে সরকারি ব্যয় কমানো : আগামী অর্থবছরে নতুন সরকারের প্রথম বাজেট পেশ করবে। এই বাজেট প্রণয়ণের সময় উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ থেকে সরে এসে বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি।

ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে চলতি অর্থবছরে এই অনুপাত প্রায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশে রয়েছে। ফলে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও সংস্কার প্রয়োজন। তাই অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমানো এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।