চাঁদায়ও মুক্তি মেলে না

উৎসব এলেই ফুটপাতে ভিড় বাড়ে; রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ক্ষমতার জোরে গজিয়ে ওঠে নতুন নতুন দোকান। নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিয়ে দোকান বসানো হলেও মাস-সপ্তাহ-দিনভিত্তিক চাঁদা দিতে হয় ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের। তারপরও সর্বদা উচ্ছেদ আতঙ্ক। বিভিন্ন দল, গ্যাং, সংগঠন, পুলিশ-প্রশাসন ও অমুক ভাই-তমুক ভাই প্রতিদিন চাঁদা নিতে আসে; তবু স্বস্তি নেই। অনেকে আবার চাঁদা দিতে আগ্রহী, কারণ তাহলে নিরাপদে ব্যবসা করা যায়।

ঈদ বা যেকোনো উৎসবের আবহে ফুটপাত হয়ে ওঠে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও লাভজনক বাণিজ্যস্থল। ক্রেতারা ফুটপাতে গিয়ে অল্পদামে জিনিস কিনতে পারেন। আর বিক্রেতারা অল্প লাভে বেশি পণ্য বিক্রি করার সুযোগ পান। বিপুল পরিমাণ চাঁদার লেনদেনও হয় ফুটপাতেই। প্রতি দোকান থেকে প্রতিদিন ৫০, ১০০, ২০০ টাকা বা আরও বেশি চাঁদা ওঠানো হয়। চাঁদাবাজি ও ফুটপাতের দখল ঠেকানোই পুলিশের কাজ। তবে এ কাজ বাস্তবে কতটুকু হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা বলেন, টাকা দিয়ে দোকান বসালেও প্রতিদিনই চাঁদা দিতে হয়; প্রতিনিয়ত পুলিশের উচ্ছেদ অভিযানের কবলেও পড়তে হয় তাদের। তারা বলেন, চাঁদা দিয়ে কেন ফুটপাত ছাড়ব? তাই উচ্ছেদের পর আবার ফুটপাত দখল করেন ব্যবসায়ীরা। সম্প্রতি রাজধানীর বেশ কয়েকটি ফুটপাত মার্কেট ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কঠোর বলে জানান ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চাঁদাবাজির অভিযোগ পেলেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। চাঁদাবাজিতে জড়িত ব্যক্তির পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হয় না। দখল ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে পুলিশের জিরো টলারেন্স নীতি।’

গত ২ মার্চ পুলিশের নবনিযুক্ত মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের কড়া বার্তা দিয়েছেন।

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার ফুটপাতের দৈর্ঘ্য ৪৩০ কিলোমিটার। সেখানে অন্তত তিন লাখ হকার ব্যবসা করেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী চক্র হকারদের কাছ থেকে বছরে প্রায় ২ হাজার ১৬০ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এ অর্থ বিভিন্ন স্তরে ভাগ হয় এবং একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।

সূত্র জানিয়েছে, প্রভাবশালী চক্রের মাধ্যমে ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। দখল ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিরোধে সক্রিয় রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সড়কে চলাচলরতদের অভিযোগ, ফুটপাত এখন চলার পথ নয়, অস্থায়ী বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এ কারণে পথচারীরা ফুটপাত ছেড়ে সড়কে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছে, ফলে সড়কে তৈরি হচ্ছে ব্যাপক যানজট।

একাধিক ব্যবসায়ী বলেছেন, ফুটপাতে চাঁদাবাজির জন্য লাইনম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়। রাজনৈতিক দল বা বিভিন্ন নেতাদের নামে তারা টাকা তুলে ভাগ করে দেয়। লাইনম্যানদের কিছু বলা যায় না, তাদের পিছে রাঘব বোয়ালরা কাজ করে। তারা ‘চাকরি’ করে বলে কিছু বলার থাকে না।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার নজরুল ইসলাম বলেন, ‘চাঁদাবাজি নানা মোড়কে যুগে যুগে হয়ে আসছে; সরকারদলীয় লোকজনের ছত্রছায়ায় বা তাদের ব্যবহার করে। তবে যারা চাঁদা দেয় তাদের ভূমিকাটাই বড়।

তারা চাঁদা না দিয়ে আইনি প্রতিকার চাইলে তাদের সুরক্ষা দেওয়া হবে। চাঁদাবাজি বন্ধে ডিএমপি বদ্ধপরিকর।’

গত ৪ মার্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘সারা দেশে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের তালিকা করে আইনের আওতায় আনা হবে। ঢাকা মহানগর পুলিশকে এ ব্যাপারে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

ফুটপাত যেন বাণিজ্যস্থল : নিউ মার্কেটে সারা বছর রাস্তার দুই পাশে খাট বিছিয়ে ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করতে দেখা যায়। সেখানে প্রতিটি দোকান থেকে বিভিন্ন ধাপে চাঁদা দিতে হয় ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের। সেখানে ফুটপাত দখল করে ভাড়াও দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রায়ই অভিযানের কবলে পড়েন ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা।

রাজধানীর আইডিয়াল স্কুলের সামনে আরামবাগ থেকে পীরজঙ্গি মাজার পর্যন্ত বিস্তীর্ণ ফুটপাতে প্রতিদিন বিকেলে ৫০০-৬০০ দোকান বসে। শুক্রবার হলে দোকান বেড়ে দ্বিগুণ হয়। সেখানকার ভাসমান বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভিন্ন ধাপে প্রতিদিন দোকানপ্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়।

বায়তুল মোকাররমের উত্তর ও পশ্চিম পাশের ফুটপাত দখল করে ছোট-বড় জামাকাপড়ের দোকান রয়েছে। প্রতিদিন এখান থেকে দোকানপ্রতি ২০০-৩০০ টাকা চাঁদা তোলা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখানে রীতিমতো চাঁদা তোলার বাহিনী রয়েছে। রাস্তায় ফাঁকা স্থানে মোটরসাইকেল রাখলেও টাকা দিতে হয়।’

মিরপুর-১০ নম্বর গোল চত্বরের চারপাশের ফুটপাতে ব্যবসায়ীদের নৈরাজ্য চলে। ফুটপাত দখলে থাকায় রাস্তায় হাঁটতে হয় পথচারীদের। সেখানে রবিউল ইসলাম নামের এক বেসরকারি চাকরিজীবী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মিরপুর-১০ এলাকায় সাধারণ মানুষ হাঁটার রাস্তা পায় না। পুরো ফুটপাত দখল হয়ে আছে। সড়কের অর্ধেকও হকারদের দখলে। কিছু অসাধু মানুষ চাঁদা নিয়ে ফুটপাত বা রাস্তায় দোকান বসায়। এ চাঁদাবাজদের ধরলে ফুটপাতের ব্যবসা বন্ধ হবে, পথচারীদেরও স্বস্তি মিলবে।’

ফার্মগেট মোড় থেকে ইন্দিরা রোডের দিক যাওয়ার ফুটপাতটি হকারদের দখলে। সেখানকার কয়েকজন ফুটপাত ব্যবসায়ী বলেন, ‘এখানে সারা বছরই দোকান বসে। বেশ কয়েকজন চাঁদা দিতে হয় না বলে দাবি করলেও অনেকে বলছেন মাসিক হিসেবে কিছু টাকা দিতে হয়।’

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের ভ্যানে ফল বিক্রেতা মাসুম তালুকদার বলেন, ‘ব্যবসা করতে হলে তো টাকা দিতে হবেই। টাকা দিলে ব্যবসা ভালোভাবে করা যায়। কেউ ডিস্টার্ব করে না।’