জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নানা উদ্যোগ

বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে দেশে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। যার একটি হলো ভারত থেকে অতিরিক্ত ডিজেল আমদানি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে খোলা বাজার থেকে তিন কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

এদিকে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিভাগীয় শহরগুলোর ফিলিং স্টেশনগুলোতে পেট্রোল ও অকটেন সরবরাহ বাড়িয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। তবে দেশ জুড়ে পেট্রোলপাম্পগুলোতে সৃষ্টি হওয়া অস্থির পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা এবং সরবরাহ আরও বাড়ানোসহ আট দফা দাবি জানিয়েছেন পাম্প মালিকরা। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে পাম্প পরিচালনা বন্ধের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হওয়ারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।

দেশের বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অতিরিক্ত জ্বালানি সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ সরকার। বর্তমানে চুক্তি অনুযায়ী প্রতি মাসে যে ১৫ হাজার টন ডিজেল সরবরাহ করা হয়, তার বাইরে অতিরিক্ত জ্বালানি দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে ভারত সরকারকে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

আপদকালীন পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকট সামাল দিতে ভারতের কাছে অতিরিক্ত জ্বালানি সহায়তা চাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।

গতকাল বুধবার সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

এ বিষয়ে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মা জানান, বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো চিঠি গ্রহণ করা হয়েছে এবং বিষয়টি ভারতের সরকারের কাছে তুলে ধরা হবে।

বাংলাদেশে ভারত থেকে জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো মৈত্রী পাইপলাইন। ভারতের শিলিগুড়ি মার্কেটিং টার্মিনাল থেকে দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপো পর্যন্ত বিস্তৃত এই পাইপলাইনের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩১ কিলোমিটার। এই আন্তঃদেশীয় পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি বাংলাদেশে ডিজেল পরিবহন করা হয়।

২০২৩ সালের মার্চ মাসে তৎকালীন সরকারের সময় এই আন্তঃদেশীয় পাইপলাইনটির উদ্বোধন করা হয়। বছরে প্রায় ২ লাখ টন ডিজেল পরিবহনের সক্ষমতা থাকলেও বিদ্যমান চুক্তি অনুযায়ী চলতি বছরে এই পাইপলাইন ব্যবহার করে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল সরবরাহ করার কথা রয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা ও সরবরাহ সংকটের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে দেশে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় চাপ বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রতিবেশী দেশের কাছ থেকে অতিরিক্ত সরবরাহ পাওয়া গেলে সংকট সামাল দেওয়া কিছুটা সহজ হবে।

তেল সরবরাহ বাড়ানোসহ আট দফা দাবি : জ্বালানি তেল সরবরাহে রেশনিং ব্যবস্থা চালুর পর পেট্রোলপাম্পগুলোতে সৃষ্টি হওয়া অস্থির পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা ও সরবরাহ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন ফিলিং স্টেশনের মালিকরা। তাদের অভিযোগ, সরকার একদিকে দেশে পর্যাপ্ত তেলের মজুদ থাকার কথা বলছে, অন্যদিকে রেশনিং করে তেল সরবরাহের নির্দেশ দিচ্ছে, এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এর ফলে পাম্পগুলোতে দীর্ঘ সারি, বিশৃঙ্খলা ও হামলার ঘটনাও ঘটছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে পাম্প পরিচালনা বন্ধের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হওয়ারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।

গতকাল বুধবার দুপুরে রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী সার্কুলার রোডের একটি হোটেলে আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বাংলাদেশ পেট্রোলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতার কারণে সরকার জ্বালানি তেল বিক্রিতে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছে। পাম্প মালিকরা সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী তা বাস্তবায়ন করছেন। তবে একদিকে সরকার পর্যাপ্ত মজুদের কথা বলছে, অন্যদিকে সীমা নির্ধারণ করে তেল দেওয়ার নির্দেশনা দিচ্ছে এই দ্বৈত অবস্থানের কারণে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো এবং ‘তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে’ এ ধরনের প্রচারের কারণে মানুষ পাম্পে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। অনেকেই গাড়ির ট্যাংক পূর্ণ করে রাখার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। এতে স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাম্পে তেল সরবরাহ কমে যাওয়ায় উত্তেজনা বাড়ছে। কোথাও কোথাও হামলার ঘটনাও ঘটেছে। সম্প্রতি সুনামগঞ্জে এক পাম্প কর্মচারীকে ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করা হয়।

পাম্প মালিকদের অভিযোগ, অনেক এলাকায় নিয়মিত তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না। আবার অনেক ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের বিক্রির তুলনায় ১০ শতাংশ কম সরবরাহ দেওয়ার নির্দেশ থাকলেও বাস্তবে তার চেয়েও বেশি কম দেওয়া হচ্ছে। অথচ এ সময়ে যানবাহনের সংখ্যা ও তেলের ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। ফলে বাস্তবে ঘাটতি আরও প্রকট হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে রাইড শেয়ার মোটরসাইকেলের জন্য নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে ৫ লিটার অকটেন দেওয়ার সরকারি নির্দেশনার সমালোচনা করা হয়। পাম্প মালিকদের মতে, কাগজপত্র যাচাই করতে সময় লাগবে, এতে লাইনে দাঁড়ানো অন্য গ্রাহকদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হবে এবং বিশৃঙ্খলা বাড়তে পারে।

পাম্প মালিকদের অভিযোগ, মনিটরিংয়ের নামে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সময় পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে অভিযান চালানো হলে তাদের সামাজিকভাবে হেয় করা হচ্ছে। তাদের মতে, কোম্পানি থেকে সরবরাহ করা তেলের পরিমাণ পাম্পের ভূগর্ভস্থ ট্যাংক ও ডিসপেনসারের মিটার রিডিং যাচাই করলেই অনিয়ম আছে কি না, বোঝা সম্ভব।

পাম্প মালিকরা জানান, শহরের বহুতল ভবনের জেনারেটর ও গ্রামাঞ্চলের সেচ পাম্পের জন্য আলাদা কোনো নির্দেশনা না থাকায় পাম্পগুলোতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। অনেক কৃষক সেচ পাম্প চালানোর জন্য তেল পাচ্ছেন না বলেও তারা দাবি করেন।

পেট্রোল-অকটেন সরবরাহ বাড়িয়েছে বিপিসি : সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিভাগীয় শহরগুলোর ফিলিং স্টেশনগুলোতে পেট্রোল ও অকটেন সরবরাহ বাড়িয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।

গতকাল বুধবার এমন তথ্য জানিয়ে বিপিসির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আগে যেখানে ফিলিং স্টেশনগুলোতে বরাদ্দ কমিয়ে ২৫ শতাংশ হারে সরবরাহ করা হচ্ছিল, সেখানে এখন তা কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি ফিলিং স্টেশনের নির্ধারিত বরাদ্দ চার্ট অনুযায়ী গড় বিক্রয়ের তুলনায় ১৫ শতাংশ কম জ্বালানি সরবরাহ করা হবে। আগে ২৫ শতাংশ কম সরবরাহ করা হচ্ছিল। গতকাল থেকেই এই ১০ শতাংশ বেশি তেল সরবরাহ শুরু হয়েছে।

বিপিসি জানায়, চলমান বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও জনসাধারণের চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

নতুন বরাদ্দ চার্ট অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিপণন কোম্পানিগুলোর ডিপো সুপারভাইজার, বিক্রয় কর্মকর্তা এবং ডিলারদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সংস্থাটি আশা করছে, এ ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে পেট্রোল ও অকটেনের সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।

এদিকে নিবন্ধিত গ্রাহকদের সরাসরি জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতের নির্দেশ দিয়েছে বিপিসি। পৃথক এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিপিসি জানায়, তাদের অধীন বিপণন কোম্পানিগুলোর নিবন্ধিত গ্রাহকদের সরাসরি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনার আলোকে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো ইতিমধ্যে সরবরাহ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিদেশ থেকে আমদানি কার্যক্রম আগেই নির্ধারিত হয়েছে এবং সেই অনুযায়ী নিয়মিতভাবে জাহাজে করে তেলের চালান দেশে আনা হচ্ছে। আমদানি করা জ্বালানি তেল প্রধান স্থাপনা থেকে বিভিন্ন ডিপোতে পাঠানো হচ্ছে এবং সেখান থেকে বিপণন কোম্পানির মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছে সরবরাহ করা হচ্ছে।

বিপিসি জানিয়েছে, নিবন্ধিত সরাসরি গ্রাহকদের জ্বালানি সরবরাহে যেন কোনো বিঘ্ন না ঘটে, সেজন্য বিপণন কোম্পানিগুলোকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে বলে আশা করছে সংস্থাটি।

গ্যাস সরবরাহে চাপ : বিশ্ববাজারে জ্বালানির অস্থিরতার মধ্যে স্পট মার্কেট থেকে আরও তিন কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনার অনুমোদন দিয়েছে সরকার। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০২৫-এর বিধি ১০৫(৩)(ক) অনুসরণ করে আন্তর্জাতিক কোটেশন সংগ্রহের মাধ্যমে এসব এলএনজি কেনা হবে।

গতকাল ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। তিনটি কার্গোর ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা।

তবে বিশ্ব জুড়ে অস্থিরতার কারণে এই এলএনজি সময়মতো আমদানি করা নিয়ে কিছুটা সংশয় দেখা দিয়েছে।

জ্বালানি বিভাগ জানায়, একটি এলএনজি জাহাজ বিলম্বিত হলেই প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি দেখা দেয়। এ পরিস্থিতিতে আগাম সতর্কতা হিসেবে সরকার বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানায় সীমিত আকারে গ্যাস রেশনিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে প্রতিদিন প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সাশ্রয় হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

দেশে বর্তমানে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হয়। এলএনজি থেকে যোগ হয় আরও ৯০ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট। প্রতিটি এলএনজি কার্গোতে সাধারণত প্রায় ৩০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস থাকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে দেশের জ্বালানি ব্যয় আরও বাড়তে পারে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ তৈরি হতে পারে।