গোপন ড্রোনের নিশানায় অপরাধীরা

ঈদুল ফিতর সমাগত। আগামী সপ্তাহ থেকেই দেশে শুরু হচ্ছে বড় ছুটি। এই ছুটি এবং উৎসব উদযাপন কেন্দ্র করে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেশ জুড়ে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে। সাধারণ মানুষের যাতায়াত নির্বিঘœ করার পাশাপাশি যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে এবার অত্যাধুনিক প্রযুক্তিরও ব্যবহার হবে। আকাশ থেকে গোপন ড্রোনের নজরদারি থেকে শুরু করে আইপি ক্যামেরা সবই থাকবে। প্রয়োজনে হেলিকপ্টারও ব্যবহার করবে পুলিশ। কঠোর প্রয়োগ হবে ট্রাফিক আইনের। কোনো সমস্যা দেখলেই জিরো টলারেন্স নীতিতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গত ৮ মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বিশেষ বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ওই বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সিনিয়র সচিব, আইজিপিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

পুলিশসংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা, ঈদের আগে পোশাকশ্রমিকদের বেতন-ভাতাদি পরিশোধ, সড়ক ও মহাসড়ক নিরাপদ ও যানজটমুক্ত রাখাসহ আরও বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে রয়েছে ঈদ উদযাপন করতে সারা দেশে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা অব্যাহত রাখতে হবে। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকা- রোধে পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য মোতায়েন, বিশেষ বিশেষ রাস্তায় ও মোড়ে চেকপোস্ট স্থাপন, টাকা স্থানান্তরে মানি এসকর্ট প্রদান, জাল টাকার বিস্তার রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও নৌ-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ঈদের ছুটিতে কূটনৈতিকপাড়াসহ সব গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এবং অন্যান্য বড় বড় শহর ও বন্দরে পুলিশের টহল বাড়াতে হবে। চুরি-ডাকাতি রোধে বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় পুলিশের টহল দৃশ্যমান রাখতে হবে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঈদের ছুটি ছাড়াও অনান্য সময়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতি করতে বেশ কিছু পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ ও তাদের ধরতে বিশেষ অভিযান চলছে। তাছাড়া পুলিশের সবকটি ইউনিট অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করছে। ফলে অপরাধীরা কোনো অপরাধ করে পার পাবে না। ঈদের ছুটিতে সবাইকে আরও সতর্ক থাকতে হবে।

গোপন ড্রোন : এবারের নিরাপত্তা পরিকল্পনার সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো ‘গোপন ড্রোন’ বা ইনভিজিবল ড্রোন টেকনোলজি। জনাকীর্ণ এলাকা, বড় বড় বাস টার্মিনালে অপরাধী শনাক্ত করতে এ ড্রোনগুলো ব্যবহার করা হবে। সাধারণ ড্রোনের শব্দ বা উপস্থিতি অপরাধীদের সতর্ক করে দিতে পারে। এই বিশেষ ড্রোনগুলো অনেক উচ্চতা থেকে হাই-রেজলিউশন ছবি ও ভিডিও পাঠাতে সক্ষম, যা সরাসরি পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে মনিটর করা হয়। পকেটমার, ছিনতাইকারী বা নাশকতার পরিকল্পনা করা ব্যক্তিদের গতিবিধি ট্র্যাক করতে এটি ব্যবহৃত হবে। বিশেষ করে ভিড়ের মধ্যে সন্দেহভাজন কাউকে শনাক্ত করলে নিকটস্থ টহল পুলিশকে তাৎক্ষণিক বার্তা পৌঁছে দেওয়া হবে। গোপন ড্রোন ব্যবহার করে অপরাধীদের নিশানা ধ্বংস করে দিতে বলা হয়েছে পুলিশকে।

১৫৫টি হাই-ডেফিনিশন আইপি ক্যামেরা : সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের চিহ্নিত ১৫৫টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে যান চলাচল মনিটরিং করা হবে। এসব স্থানে ঈদের আগে ও পরে বিশেষ পর্যবেক্ষণ জোরদার করা হবে। যমুনা ও পদ্মা সেতুসহ যানজটপ্রবণ এলাকায় অতিরিক্ত রেকার প্রস্তুত রাখা হবে। কোনো গাড়ি বিকল হয়ে সড়কে পড়ে থাকলে দ্রুত সেটি সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। টোল প্লাজাগুলোতেও দ্রুত টোল আদায়ের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার জোরদারের কথা বলা হয়েছে। ক্যামেরা স্থাপনের ফলে অপরাধ করে পালিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে, কারণ প্রতিটি মোড়েই ডিজিটাল নথিপত্র সংরক্ষিত থাকছে পুলিশের কাছে।

মহানগরে প্রবেশ ও বাহিরের সময় নজরদারি : ফেরি, লঞ্চ, বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশনে পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করতে হবে। মহানগরগুলো প্রবেশ ও বের হওয়ায় সড়ক বা স্থানগুলোতে যাতে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড সংঘটিত হতে না পারে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে বলা হয়েছে। পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্রে নিরাপত্তা বাড়াতে হবে। শপিং মলগুলোতে সাদা পোশাকাধারী পুলিশ মোতায়েন থাকবে। র‌্যাবের দৃশ্যমান টহল বৃদ্ধি করতে হবে। রেল, বাস ও লঞ্চ টার্মিমালে পুলিশ ও র‌্যাবের অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন হবে। নিজ নিজ এলাকার কমিউনিটি পুুলিশকে কাজে লাগাতে হবে। ফেরিঘাটে অনিয়ম ও অবৈধ সিরিয়াল নিতে না পারে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম-টাঈাইল, সিরাজগঞ্জসহ সব মহাসড়কে খানা-খন্দক দ্রুত মেরামত করতে হবে।

নসিমন-করিমন চললে পুলিশের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা : জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে নসিমন, করিমন, ভটভটি, ইজিবাইক, মাহিন্দ্র চলাচল করতে পারবে না। এর বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত সক্রিয় থাকবে। নির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া রাস্তায় কোনো যানবাহন থামানো যাবে না। কোনো যানবাহন নির্দিষ্ট স্টপেজ ছাড়া যেখানে সেখানে দাঁড়ালে সঙ্গে সঙ্গে মামলা করে দিতে হবে। লঞ্চ ও বাসে অতিরিক্ত যাত্রী নিলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঈদের ছুটির আগে গার্মেন্টসগুলোতে বেতন ও বোনাস পরিশোধ হয়েছে কি না, তা মনিটরিং করতে হবে। প্রয়োজনে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং শিল্প-পুলিশকে সমাধান করতে হবে। আর যেসব প্রতিষ্ঠান বেতন-বোনাস দিতে সমস্যা করলে তাদের তালিকা করে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশের এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ঈদের আগে কোনো শ্রমিক ছাঁটাই করা যাবে না। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনে হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে হবে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার নিরাপত্তার বিষয়টি ভিন্নভাবে নেওয়া হয়েছে।

স্টপজের বাইরে গাড়ি থামালেই মামলা : যানজটের প্রধান কারণ হলো যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করা। এ সমস্যা সমাধানে ট্রাফিক পুলিশ এবার কঠোর অবস্থানে গিয়েছে। নির্দিষ্ট বাস স্টপেজ বা টার্মিনাল ছাড়া রাস্তার মাঝখানে বা মোড়ে কোনো গণপরিবহন দাঁড়ালে সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল মামলা দিতে বলা হয়েছে। ড্রোন এবং আইপি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে ট্রাফিক সার্জেন্টরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকলেও গাড়ির নম্বরের ভিত্তিতে মামলা পাঠিয়ে দেবে। তাছাড়া মহাসড়কে গাড়ির গতিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখা এবং যাত্রীসাধারণের জীবনের ঝুঁকি কমাতেও নানা উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ।

বিশেষ কারণ ছাড়া পুলিশের ছুটি বাতিল : জননিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ বাহিনীর সব সদস্যের ছুটি সীমিত করা হয়েছে। বিশেষ জরুরি প্রয়োজন বা মানবিক কারণ ছাড়া কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বা কনস্টেবল ছুটিতে যেতে পারবেন না। ৩০ শতাংশ অতিরিক্ত জনবল রাস্তায় মোতায়েন থাকবে। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিটি জোনে পুলিশের বিশেষ ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ইউনিফর্মধারী পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা শাখার সদস্যরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে ছদ্মবেশে বাস টার্মিনাল ও ট্রেন স্টেশনে অবস্থান করবেন।