টানা দুই সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক বোমাবর্ষণ সত্ত্বেও ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনো যথেষ্ট সুসংগঠিত। দেশটির নেতৃত্ব শিগগিরই ভেঙে পড়ার বা পতনের কোনো সম্ভাবনা নেই বলে মনে করছে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। ইসরায়েলও বলছে, ইরানে ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার নিশ্চয়তা দেখছে না তারা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার ইঙ্গিত দিলেও তেল আবিব মনে করছে, এখনো এ যুদ্ধ বন্ধের নির্দেশ দেওয়ার কাছাকাছি পৌঁছায়নি ওয়াশিংটন। এদিকে যুদ্ধ বন্ধ করতে ভবিষ্যৎ আগ্রাসন বন্ধে আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ ও ইরানের বৈধ অধিকারগুলোর স্বীকৃতির শর্ত দিয়েছে ইরান। গতকাল বৃহস্পতিবার ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এ শর্তগুলো দেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ যুদ্ধ শুরু থেকেই পরিকল্পনামাফিক এগোয়নি। পরিকল্পনা ছিল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এবং ধর্মীয় ও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর যত বেশি সম্ভব শীর্ষ নেতাকে হত্যা করা, যাতে ইরানে ক্ষমতাসীনরা দুর্বল হয়ে পড়েন এবং তাদের ইসলামি শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। কিন্তু এ পরিকল্পনা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। এর সঙ্গে আছে যুদ্ধের বিপুল ব্যয় ও আন্তর্জাতিক চাপ। সব মিলিয়ে চলমান এ যুদ্ধের প্রায় দুই সপ্তাহ পর এসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একটি গোলকধাঁধায় পড়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধ শুরুর দিনই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ অভিযানে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে যেন ইরানের জনগণ নিজেদের ভাগ্য নিজেরা নির্ধারণ করতে পারে। তিনি বিশেষভাবে কুর্দি, বেলুচ ও আরব সংখ্যালঘুদের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তার এ বার্তা থেকে এটা স্পষ্ট যে, এসব গোষ্ঠীর সম্ভাব্য বিদ্রোহ বা সরকারবিরোধী আন্দোলনে সমর্থন দেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। কিন্তু বাস্তবে টানা ১১ দিন তীব্র হামলা সত্ত্বেও ইরানে এখনো বিদ্রোহ বা গণঅভ্যুত্থানের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
রয়টার্স জানায়, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রথম দিনই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ অনেক শীর্ষ সামরিক কমান্ডার নিহত হন। একই সঙ্গে দেশটিতে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে এবং ঘরবাড়ি ও সরকারি ভবন ধ্বংস হয়েছে, যা অনেক ইরানির মধ্যে ক্ষোভও বাড়িয়েছে।
ইরানের পুলিশ বলছে, তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে শত্রুর আহ্বানে কেউ রাস্তায় নামলে তাদের বিক্ষোভকারী নয়, শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এ কারণে খামেনির মৃত্যুর খবরে কিছু মানুষ প্রকাশ্যে উল্লাস করলেও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন চেয়ে কেউ বিক্ষোভ করেনি। ধারণা করা হচ্ছে, যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অনেক ইরানি রাস্তায় নামতে ভয় পাচ্ছেন।
তেহরানের ২৬ বছর বয়সী বাসিন্দা আলি রয়টার্সকে বলেন, ‘আমি এ শাসনব্যবস্থাকে ঘৃণা করি এবং চাই এর শেষ হোক। কিন্তু বোমাবর্ষণের মধ্যে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করার মতো পরিস্থিতি নেই।’
তেহরানের রাস্তাঘাট তুলনামূলক শান্ত থাকলেও ব্যাংক, পেট্রোল পাম্প ও দোকানপাট সীমিত সময়ের জন্য খোলা আছে এবং সরকারি অফিসও চালু আছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, ‘সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ থাকলেও এখন অনেকের মধ্যে জাতীয়তাবোধ বাড়ছে এবং রেজা পাহলভি, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে।’
এদিকে এ যুদ্ধের যৌথ লক্ষ্য কী ও কখন অভিযান শেষ হবে, তা নিয়ে এখনো প্রকাশ্যে একক কোনো অবস্থান জানায়নি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হওয়ার কথা বললেও ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সার যুদ্ধের সময়সীমা নির্ধারণে অস্বীকৃতি জানান। বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে গোপন বৈঠকে ইরানের সরকার টিকে যেতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইসরায়েলি সামরিক কৌশল বিশেষজ্ঞ ও ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের গবেষক আসাফ ওরিয়ন বলেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা যুদ্ধের একটি বাস্তব লক্ষ্য। তবে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের পরিবেশ তৈরি করাটা পরোক্ষ লক্ষ্য, তাই সেটি বোঝা কঠিন। তিনি আরও বলেন, ‘সামরিক অভিযান পরিকল্পিতভাবে হতে পারে, কিন্তু গণঅভ্যুত্থান ঘটতে মাস বা বছরও লেগে যেতে পারে।’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দরসহ বিভিন্ন বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। এ অবস্থায় ইরানের স্থবির অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তেহরানের এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক বলেন, ‘যুদ্ধ শেষ হলে অর্থনৈতিক সমস্যা ও ঘাটতির কারণে আবার বিক্ষোভ শুরু হতে পারে। তাই অনেক দিক থেকে ইরান হয়তো চায় যুদ্ধ কিছুটা দীর্ঘস্থায়ী হোক।’
ইরানে সরকার পতনের ঝুঁকি নেই বলে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্র গত বুধবার এ তথ্য জানিয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সূত্র জানায়, একাধিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ বলছে, ইরানি সরকার বর্তমানে কোনো বিপদে নেই এবং দেশটির জনগণের ওপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আছে। গত কয়েক দিনের পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে সর্বশেষ প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলো বলছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলার প্রথম দিনেই সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হলেও দেশটির ধর্মীয় নেতৃত্বের সংহতি নষ্ট হয়নি। খামেনির মৃত্যুর পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী নেতারা দেশটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। এরই মধ্যে খামেনির ছেলে মোজতবাকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করেছে জ্যেষ্ঠ শিয়া আলেমদের পর্ষদ ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’।
সংশ্লিষ্ট আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, ইসরায়েল বর্তমান সরকারের কোনো অংশকেই অবশিষ্ট রাখতে চায় না। তবে শুধু বিমান হামলা চালিয়ে কীভাবে সরকার পতন হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। সেজন্য হয়তো একটি স্থল অভিযানের প্রয়োজন হতে পারে, যাতে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করার সাহস পান। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে স্থল সেনা পাঠানোর বিষয়টিও উড়িয়ে দেয়নি। প্রতিবেশী দেশ ইরাকে অবস্থানরত ইরানি কুর্দি যোদ্ধারা ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করেছে। কুর্দি নেতা আবদুল্লাহ মোহতাদি দাবি করেছেন, তাদের হাজার হাজার তরুণ যোদ্ধা অস্ত্র তুলে নিতে প্রস্তুত এবং অনেক জায়গায় ইরানি বাহিনী ভয়ে ব্যারাক ছেড়ে পালিয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এ কুর্দি গোষ্ঠীর সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, ইরানি বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই চালানোর মতো পর্যাপ্ত অস্ত্র বা জনবল কুর্দিদের নেই। সম্প্রতি এ গোষ্ঠীগুলো ওয়াশিংটনের কাছে সাঁজোয়া যান ও ভারী অস্ত্রশস্ত্র চাইলেও ট্রাম্প গত শনিবার জানিয়েছেন, কুর্দিদের ইরানে পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা তার নেই।
এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ থামাতে ভবিষ্যৎ আগ্রাসন বন্ধে আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণসহ তিনটি শর্ত হাজির করেছে তেহরান। গতকাল ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এ শর্তগুলো দেন বলে জানিয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। কোনো চুক্তি হলে তার মধ্যে ইরানের সব বৈধ অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথাও থাকতে হবে, বলেছেন তিনি।
পেজেশকিয়ান তার পোস্টে এমনটাই লিখেছেন, রাশিয়া ও পাকিস্তানের নেতাদের সঙ্গে কথা বলার সময় আমি এই অঞ্চলে শান্তির প্রতি ইরানের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছি। জায়নবাদী শাসকগোষ্ঠী ও যুক্তরাষ্ট্রের শুরু করা এ যুদ্ধ বন্ধের একমাত্র পথ হচ্ছে ইরানের বৈধ অধিকারগুলোর স্বীকৃতি, ক্ষতিপূরণ এবং ভবিষ্যৎ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দৃঢ় আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, ইরানি প্রেসিডেন্টের এ প্রস্তাবের কিছুক্ষণ আগেই ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র আবুলফজল শেকারচি ইরানের রাষ্ট্র পরিচালিত আইআরআইবি টিভিকে বলেছেন, ওয়াশিংটন যদি ইরানের বন্দরগুলোকে নিশানা বানায় তাহলে পারস্য উপসাগরে এমন কোনো বন্দর, অর্থনৈতিক কেন্দ্র বা স্থান নেই, যা ইরানের নাগালের বাইরে থাকবে।
তিনি বলেন, ‘যদি আমাদের বন্দর বা ঘাটগুলো হুমকির সম্মুখীন হয়, তাহলে এই অঞ্চলের সব বন্দর ও ঘাট আমাদের বৈধ নিশানায় পরিণত হবে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এতদিন যা করেছে, তার চেয়েও বড়সড় হামলা চালাবে।
এদিকে প্রথম বক্তৃতায় যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের নতুন নেতা মোজতবা খামেনি। আলজাজিরা বলছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম বিবৃতি তিনি বলেন, এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সব ঘাঁটি অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। তা না হলে হামলা করা হবে।
মোজতবা খামেনি বলেন, ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে বিশ্বাস করে। কিন্তু এ দেশগুলোতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাবে তেহরান।
ব্র্যাডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি অধ্যয়ন বিভাগের ইমিরেটাস প্রফেসর পল রজার্স বলছেন, ইরানি শাসনব্যবস্থার নতুন নেতা মজুদ রয়েছে এবং সম্ভবত মোজতবা খামেনি যদি নিহতও হন, সে ক্ষেত্রেও দায়িত্ব নেওয়ার জন্য এক বা একাধিক নেতা আগে থেকেই তৈরি আছেন।
তার ভাষ্য, ট্রাম্প যে দাবি করছেন যুদ্ধ প্রায় জিতে গেছেন, তা হয়তো শুধু তার কল্পনা। তবে এমন কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, ইসরায়েলের ভেতরে কেউ কেউ দ্বিতীয়বার ভাবতে শুরু করেছেন এবং এই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন। ওয়াশিংটনেও এমন ভিন্নমত হয়তো ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে। এটি হয়তো খুবই সতর্ক আশাবাদ। তবু তা বর্তমান পরিস্থিতির চেয়ে ভালো, যেখানে সামনে রয়েছে এই ভয়াবহ ও ক্রমবর্ধমান যুদ্ধের আরও বহু সপ্তাহ ও মাস।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইরানেরই নিন্দা : পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ একটি প্রস্তাব পাস করেছে। তবে এ প্রস্তাবে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলি হামলার কোনো উল্লেখ নেই। তেহরানের রাষ্ট্রদূত নিরাপত্তা পরিষদের এমন পক্ষপাতদুষ্ট প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করেছেন। মিডল ইস্ট আইয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছে ইরানের প্রতিবেশী দেশ বাহরাইন। এতে ভারতসহ বিশ্বের ১৩৫টি দেশ সমর্থন দিয়েছে।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ১ হাজার ১০০-এর বেশি শিশু হতাহত হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা (ইউনিসেফ)। সংস্থাটি এক বিবৃতিতে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে তীব্রতর হতে থাকা সংঘাত মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে লাখ লাখ শিশুর জন্য এক ‘বিপর্যয়কর’ পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু সংঘাতের কবলে পড়ে ১ হাজার ১০০-এর বেশি শিশু আহত বা নিহত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ইরানে ২০০, লেবাননে ৯১, ইসরায়েলে ৪ এবং কুয়েতে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে।
তারা সতর্ক করে বলেছে, সহিংসতা আরও তীব্র হলে এবং ছড়িয়ে পড়লে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এই সংকটের কারণে লাখ লাখ শিশুর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে এবং অবিরাম বোমাবর্ষণের ফলে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
ইউনিসেফ বলেছে, শিশুদের হত্যা ও পঙ্গু করা কিংবা তাদের জীবনধারণের জন্য অত্যাবশ্যকীয় সেবাগুলো ধ্বংস করার পেছনে কোনো যুক্তিই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এ অঞ্চলের ২০ কোটি শিশু দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বিশ্ববাসীর দিকে তাকিয়ে আছে।
এদিকে নিরাপত্তা পরিষদে তোলা প্রস্তাবে বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডানের ওপর ইরানের সব ধরনের হামলা অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল বন্ধ বা বাধাগ্রস্ত করার যেকোনো ইরানি হুমকি বা পদক্ষেপের নিন্দা জানানো হয়েছে।
প্রস্তাবটি ১৩-০ ভোটে পাস হয়। রাশিয়া ও চীন ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিল। অন্যদিকে, সব পক্ষকে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে রাশিয়ার তোলা একটি বিকল্প প্রস্তাব নাকচ করে দেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘে বাহরাইনের দূত জামাল ফারিস আলরোয়াই বলেন, এই ভোট বিশ্ব অর্থনীতিতে উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রতিফলন। তিনি বলেন, এ অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু একটি আঞ্চলিক বিষয় নয়, এটি আন্তর্জাতিক দায়িত্ব, যা বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বাালানি নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
তবে জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাইদ ইরাভানি এ প্রস্তাব গ্রহণকে নিরাপত্তা পরিষদের ইতিহাসে একটি ‘স্থায়ী কলঙ্ক’ বলে উল্লেখ করেছেন। এটিকে তিনি নিরাপত্তা পরিষদের ‘চরম অপব্যবহার’ বলে অভিহিত করেন।
ইরাভানি বলেন, ‘পরিষ্কার করে বলি, এই প্রস্তাব আমার দেশের প্রতি এক প্রকাশ্য অবিচার, অথচ আমার দেশই আগ্রাসনের প্রধান শিকার।’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান জুড়ে আগ্রাসন চালালে এ যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। সেই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি, বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাসহ অনেক বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। জবাবে ইরান ইসরায়েলসহ পারস্য উপসাগরের প্রতিটি দেশে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়ালৎস বলেন, অরাজকতা সৃষ্টি এবং প্রতিবেশীদের জিম্মি করার যে কৌশল ইরান নিয়েছিল, তা যে হিতে বিপরীত হয়েছে, আজকের এই ভোটে সেটা প্রমাণিত হয়েছে।
চীনের প্রতিনিধি ফু কং উপসাগরীয় দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান জানানোর ওপর জোর দিলেও বলেন, এই প্রস্তাবের লেখায় ‘দ্বন্দ্বের মূল কারণ এবং সামগ্রিক চিত্রটি ভারসাম্যপূর্ণভাবে ফুটে ওঠেনি’।
রাশিয়ার প্রতিনিধি ভাসিলি নেবেনজিয়া এ প্রস্তাবকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট ও একতরফা’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘যারা যুদ্ধ শুরু করেছে, এ প্রস্তাব সেই কুচক্রী দেশগুলোকে ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করতে পারে।’
এরপর নেবেনজিয়া আলাদা একটি খসড়া প্রস্তাব পেশ করেন, যেটিকে তিনি পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য একটি ‘নিরপেক্ষ দলিল’ হিসেবে বর্ণনা করেন। সেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো দেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে রাশিয়ার এ প্রস্তাব প্রয়োজনীয় ভোট না পাওয়ায় বাতিল হয়ে যায়।
প্রস্তাবটির পক্ষে চীন, পাকিস্তান, রাশিয়া ও সোমালিয়া ভোট দিলেও যুক্তরাষ্ট্র ও লাটভিয়া বিপক্ষে ভোট দেয়। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ ৯টি দেশ ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকে।
অবশ্য গত বুধবার জাতিসংঘের মানবিক সহায়তাবিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া সংঘাত বিশ্ব জুড়ে মানবিক ত্রাণ কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে। এ যুদ্ধের ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং বিভিন্ন সংকটাপন্ন অঞ্চলে ত্রাণ পৌঁছানোর গতি ধীর হয়ে গেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে ফ্লেচার বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল এবং আমি মনে করি গোটা বিশ্বেই আমরা এক গুরুতর বিপজ্জনক মুহূর্তে রয়েছি।’
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ লেবানন ও উপসাগরীয় দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে আকাশপথ ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্থবির হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। ফ্লেচার জানান, যুদ্ধের ফলে গাজা ও সাব-সাহারা আফ্রিকার দেশগুলোতে ত্রাণ সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কারণ, মানবিক সাহায্য পরিবহন করতে হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে, কিংবা উপসাগরীয় অঞ্চলের আকাশপথ দিয়ে।
যুদ্ধের কারণে দুই পথই কার্যত বন্ধ হয়ে আছে। ত্রাণ সরবরাহে বিঘেœর কারণে বিশেষ করে খরাকবলিত সোমালিয়া ও যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদান চরম সংকটের মুখে পড়েছে। তিনি বলেন, এ পরিস্থিতি শুধু ত্রাণ সরবরাহ কমাবে না, বরং পুরো অঞ্চলে জ্বাালানি ও খাদ্যের দামও বাড়িয়ে দেবে। বর্তমান অবস্থাকে তিনি একটি ‘ভয়াবহ পরিস্থিতি’ হিসেবে বর্ণনা করেন।