ছুটির দিনেও খোলা থাকবে বিপিসির তেল ডিপো

দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকারি ছুটির দিনেও প্রধান স্থাপনা ও ডিপো খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। নতুন এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এখন থেকে শুক্র ও শনিবারও বিপিসির অধীন বিপণন কোম্পানিগুলোর প্রধান স্থাপনা ও ডিপো থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হবে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিপিসির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে জ্বালানি তেলের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী বিপণন কোম্পানিগুলোর প্রধান স্থাপনা খোলা রেখে নিয়মিত তেল সরবরাহ অব্যাহত রাখা হবে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বিদেশ থেকে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী নিয়মিতভাবে জ্বালানি তেল আমদানি করা হচ্ছে। আমদানিকৃত তেল প্রধান স্থাপনা থেকে রেলওয়ে ওয়াগন ও ট্যাংকারের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন ডিপোতে পাঠানো হচ্ছে। পরে সেখান থেকে ফিলিং স্টেশনসহ গ্রাহকপর্যায়ে সরবরাহ করা হয়।

বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, ছুটির দিনেও ডিপো খোলা রাখার সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে জ্বালানি তেল পরিবহন ও সরবরাহ কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে। এতে ফিলিং স্টেশনগুলোয় চাপ কমবে এবং সামগ্রিক সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করবে।

পেট্রোল-অকটেনের রেশনিং দ্রুত প্রত্যাহারের দাবি : দেশের জ্বাালানি পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানম-ির একটি রেস্তোরাঁয় সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটার্স, এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। সেখানে পেট্রোল ও অকটেনের ওপর আরোপ করা রেশনিং দ্রুত তুলে নেওয়ার দাবি জানান তেল ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিযোগ, সরকারের ভুল হিসাব-নিকাশের কারণে জ্বালানিসরবরাহ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

সংগঠনটির আওতায় দেশের পেট্রোল পাম্প মালিক, বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেল ব্যবসায়ী এবং ট্যাংক লরি মালিকরা যুক্ত রয়েছেন।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে ঘিরে দেশে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার পর গত কয়েক দিনে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। ঢাকায় তেল বিক্রি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এ অবস্থায় গত ৬ মার্চ ভোক্তাপর্যায়ে জ্বালানি তেল বিক্রির সীমা নির্ধারণ করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মোটরসাইকেলে দিনে সর্বোচ্চ ২ লিটার, ব্যক্তিগত গাড়িতে ১০ লিটার এবং এসইউভি, জিপ ও মাইক্রোবাসে ২০ থেকে ২৫ লিটার পর্যন্ত পেট্রোল বা অকটেন বিক্রি করা হচ্ছে। ডিজেলচালিত পিকআপ ও লোকাল বাসে ৭০ থেকে ৮০ লিটার এবং দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও কনটেইনারবাহী যানবাহনে ২০০ থেকে ২২০ লিটার পর্যন্ত সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। অনিয়ম, অবৈধ মজুদ ও বেশি দামে বিক্রি ঠেকাতে জেলা প্রশাসকদের মোবাইল কোর্ট পরিচালনার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল বলেন, দেশে পেট্রোল ও অকটেনের প্রকৃত কোনো ঘাটতি নেই। সিলেট গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদিত কনডেনসেট পরিশোধনের মাধ্যমে দেশের চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ সিলেটেই উৎপাদিত হয়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বা আন্তর্জাতিক অস্থিরতার সঙ্গে এই উৎপাদনের কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই।

তিনি বলেন, সিলেট গ্যাসক্ষেত্র ও দেশের বেসরকারি শোধনাগারগুলোয় উৎপাদিত পেট্রোল ও অকটেন পুরোপুরি বিপিসির মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ করা হয়। ফলে এই দুই জ্বালানির ওপর রেশনিং আরোপ করা যৌক্তিক নয়।

লিখিত বক্তব্যে সংগঠনটি জানায়, গুজবের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় হঠাৎ অতিরিক্ত জ্বালানি কেনার প্রবণতা দেখা দেয়। এতে বাজারে চাপ তৈরি হয়। কিন্তু পরবর্তীতে বিপিসি সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা না করেই তড়িঘড়ি করে রেশনিং নীতিমালা চালু করায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।

সংগঠনের দাবি, বিপিসি পাম্পগুলোর আগের গড় উত্তোলনের ভিত্তিতে সরবরাহ ২৫ শতাংশ কমিয়েছে। কিন্তু হিসাব নির্ধারণে ভুল সময়কাল ধরা হয়েছে। মার্চ থেকে জুনের গড় উত্তোলন ধরে কোটা নির্ধারণ করায় বাস্তবে সরবরাহ আরও কমে গেছে। তাদের মতে, হিসাবগত ত্রুটির কারণে কাগজে ২৫ শতাংশ কম দেখালেও বাস্তবে বাজারে প্রায় ৪৫ শতাংশ জ্বালানি কম আসছে।

তেল ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অনেক পাম্পের বরাদ্দ এত কমে গেছে যে ৫ থেকে ৯ হাজার লিটার ধারণক্ষম ট্যাংকলরি পূর্ণ লোডে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে আংশিক লোডে তেল উত্তোলন করতে গিয়ে পরিবহন ব্যয় কমিশনের চেয়েও বেশি হয়ে পড়ছে, যা ব্যবসাকে অলাভজনক করে তুলছে।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে তারা দৈনিক কোটার পরিবর্তে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে কোটা নির্ধারণ এবং চাহিদার ওঠানামা অনুযায়ী সরবরাহ সমন্বয়ের দাবি জানিয়েছেন।

ওয়েবসাইটে জানা যাবে তেলের খোঁজ : সরকারের পক্ষ থেকে জ্বাালানি তেলের মজুদ থাকার আশ্বাস দেওয়া হলেও এ নিয়ে যানবাহন চালকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। ফলে ফিলিং স্টেশনগুলোয় দীর্ঘলাইন এখন নিত্যদিনের দৃশ্য। কোথাও কোথাও তেলের সংকটও দেখা দিচ্ছে।

এমন এক অস্থির সময়ে স্বস্তি দিতে হাজির হয়েছে নতুন একটি ডিজিটাল সমাধান। দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে তেলের মজুদের সর্বশেষ তথ্য জানাতে চালু হয়েছে ‘তেল কই’ নামের ওয়েবসাইট।

এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের কারিগর সজিব খান ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞানের স্নাতক। বর্তমানে তিনি পাঠাও কুরিয়ারে ডেটা অ্যানালিটিকস এবং এআই অটোমেশন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করছেন। এর আগে তিনি ইন্টারঅ্যাকটিভ কেয়ারসে লিড ডেটা ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে তিন হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।

এটি মূলত কমিউনিটিনির্ভর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিচালনা করা হচ্ছে। অর্থাৎ পাম্পে তেল আছে কি না, সেই তথ্য দেন সাধারণ ব্যবহারকারীরা। ওয়েবসাইটটিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শত শত পাম্পের তালিকা রয়েছে। কোনো স্টেশনের নাম তালিকায় না থাকলে ব্যবহারকারীরা তা যুক্ত করতে পারেন।

লাইভ আপডেট এই ওয়েবসাইটের সবচেয়ে বড় শক্তি। ব্যবহারকারীরা সরাসরি পাম্প থেকে সর্বশেষ অবস্থা জানাতে পারেন। তথ্যের নির্ভুলতা যাচাইয়ে এখানে একটি চমৎকার ভোটব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কেউ যদি কোনো স্টেশনে তেলের মজুদ নিয়ে রিপোর্ট করেন, অন্য ব্যবহারকারীরা হ্যাঁ বা না ভোটের মাধ্যমে তার সত্যতা নিশ্চিত বা বাতিল করতে পারেন। যত বেশি মানুষ তথ্য দেন, ডেটা তত বেশি নিখুঁত হয়।

ওয়েবসাইটটিতে প্রবেশ করলেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাম্পের তালিকা দেখা যায়। নির্দিষ্ট পাম্পে পেট্রোল, অকটেন বা ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা জানার পাশাপাশি লিটারপ্রতি তেলের বর্তমান দামও দেখা যায়। পাম্পে গ্রাহকদের ভিড় কেমন বা দীর্ঘ লাইন আছে কি না, সেই তথ্যও ব্যবহারকারীদের বিভিন্ন মন্তব্য থেকে বোঝা সম্ভব।

গত ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়েবসাইটটি সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়। চালুর পর থেকেই এটি ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এখন পর্যন্ত ২৬ লাখ বারের বেশিবার ওয়েবসাইটটি দেখা হয়েছে। ১০ ফেব্রুয়ারি এক দিনেই ১০ লাখের বেশি মানুষ সাইটটি দেখেছেন। বর্তমানে প্রতি মিনিটে গড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ জন ব্যবহারকারী ওয়েবসাইটটি ব্যবহার করছেন। একজন চালক বা সাধারণ ব্যবহারকারী খুব সহজেই ওয়েবসাইটটিতে প্রবেশ করে বিভিন্ন পাম্পের সর্বশেষ অবস্থা জানতে পারেন। শুধু তথ্য জানাই নয়, ব্যবহারকারীরা সেখানে নিজেদের অভিজ্ঞতাও শেয়ার করতে পারছেন। কোনো পাম্পে তেল শেষ হয়ে গেলে বা দীর্ঘলাইন থাকলে সেটি অন্যকে দ্রুত জানানোর সুযোগ রয়েছে।