রমজান মাসে জেদ্দা শহর এক ভিন্ন রূপ ধারণ করে। এখানকার প্রতিটি মহল্লার রাস্তার ধারে অস্থায়ী দোকান বসে, যা ঐতিহ্যবাহী বাজারের আকর্ষণ এবং হিজাজি সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়। পুরো শহরে ছড়িয়ে থাকা এই দোকানগুলো একটি প্রাণবন্ত, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি করে, যা এই জনপদের পরিচয় এবং ঐতিহ্যের গভীরতাকে প্রতিফলিত করে।
তবে এবারের রমজান মৌসুমে ‘বাস্তা’-এর ক্ষেত্রে সৃজনশীলতার এক নতুন জোয়ার দেখা গেছে। ‘বাস্তা’ বলতে মূলত রমজান মাসে রাস্তার ধারে বা মহল্লার প্রবেশপথে বসানো সাময়িক খাবার ও সামগ্রী বিক্রির ছোট স্টলকে বোঝায়। এই দোকানগুলো এখন আর কেবল জেদ্দার ঐতিহাসিক এলাকা বা সাধারণ নাশতা বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি এখন অনেক উচ্চাকাক্সক্ষী উদ্যোক্তার কাছে একটি চমৎকার ব্যবসায়িক ধারণায় পরিণত হয়েছে।
এ বছর বাতারজি মেডিকেল কলেজের সামনের দোকানগুলোতে জেদ্দার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রচুর মানুষের সমাগম লক্ষ্য করা গেছে। এশার নামাজের পর থেকে শুরু হয়ে রাত ৩টা পর্যন্ত এই ভিড় বহাল থাকে। আল-জাহরা জেলাতেও বেশ কিছু সুসজ্জিত ও পরিপাটি দোকানের সমাগম দেখা গেছে। দর্শনার্থীরা এখানে এসে বালিলা (মসলাযুক্ত ছোলা), ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, কলিজার স্যান্ডউইচ, কুকিজসহ নানা ধরনের খাবারের স্বাদ নিতে পারেন।
এই দোকানগুলো আল-বালাদ এলাকার মহল্লাগুলোকে নতুন করে প্রাণবন্ত করে তুলেছে এবং বিভিন্ন প্রান্তের দর্শনার্থীদের কাছে প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। এর মাধ্যমে তরুণ-তরুণীদের জন্য মৌসুমি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যা স্থানীয় উদ্যোক্তা হওয়ার ক্রমবর্ধমান স্পৃহারই প্রতিফলন।
দিনা আল-বাকরি নামে একজন দর্শনার্থী আরব নিউজকে জানান, এই অভিজ্ঞতা বিক্রেতাদের মধ্যেও আত্মবিশ্বাস ও স্বাধীনতার বোধ জাগিয়ে তোলে। দর্শকদের সরাসরি প্রশংসা তাদের নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি গর্ববোধ বাড়িয়ে দেয়।
জেদ্দার কিং আবদুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত আহমেদ আল-জোহানি এখানে টাটো নামে একটি দোকান চালান। এটি তার দ্বিতীয় বছরের অংশগ্রহণ। তিনি জানান, বাতারজি মেডিকেল কলেজের পাশের বিশাল জায়গাটি এর মালিক রমজানের সময় দাতব্য উদ্দেশ্যে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন, যাতে স্থানীয়রা ব্যবসা করে আয় করতে পারে।
জেদ্দা পৌরসভা থেকে মাত্র ২০০ রিয়ালে খুব সহজেই এর অনুমতি পাওয়া যায়। আল-জোহানি এখানে নিজের বিশেষ রেসিপির ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, কলিজার স্যান্ডউইচ এবং জুস বিক্রি করেন। তিনি জানান, জায়গার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার ব্যাপারে তারা খুবই সজাগ, কারণ এটিই তাদের আয়ের উৎস এবং দর্শনার্থীদের আস্থার জায়গা।
এখানে ৮ বছর বয়সী সামা আল-মাগরিবি লিটল স্টার লেমনেড নামে একটি দোকান পরিচালনা করছে। তার মা দালিয়া জানান, সামা অনেকদিন ধরেই নিজের একটি ছোট প্রজেক্ট করতে চেয়েছিল। ঘরের টুকটাক কাজ করে টাকা জমানোর চেয়ে সামাকে সৃজনশীল কিছু করার অনুপ্রেরণা দেন তার মা। সামা এখন লেমনেড এবং রাইস ক্রিস্পি বার বিক্রি করছে। মলের কাছাকাছি এই জায়গাটি সামার নিজের পছন্দ করা।
চমৎকার আবহাওয়া এবারের রমজানে দর্শনার্থীদের সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছে। নুহা বাতৌবারা নামে এক দর্শনার্থী বলেন, প্রতি রমজানেই জেদ্দার এই আয়োজন আমাদের অবাক করে দেয়। বাইরে দাঁড়িয়ে দোকান থেকে খাবার কেনা এবং লাইনে অপেক্ষা করার মধ্যে যে আনন্দ রয়েছে, তা এই অভিজ্ঞতাকে আরও উপভোগ্য করে তোলে।
আরব নিউজ অবলম্বনে