কেয়ামতে জান্নাতের সুপারিশ করবে রোজা

রোজা ইসলামের ৫ স্তম্ভের অন্যতম। কোরআন ও হাদিসে রোজার বহু ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। রোজা কেয়ামতের দিন বান্দার জন্য জান্নাতের সুপারিশ করবে। এই সুসংবাদ প্রত্যেক মুমিনের জন্য আশার আলো।

রোজার বিধান ও উদ্দেশ্য : মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা বাকারা ১৮৩) এই আয়াত প্রমাণ করে, রোজার মূল উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন। রোজা মানুষকে সংযম, ধৈর্য, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আল্লাহর স্মরণে অভ্যস্ত করে তোলে। ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করার মাধ্যমে বান্দা উপলব্ধি করে মহান আল্লাহর নেয়ামতের মূল্য এবং গরিব-দুখীর কষ্ট।

রোজা ও কোরআনের সুপারিশ : হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রোজা ও কোরআন কেয়ামতের দিন বান্দার জন্য জান্নাতের সুপারিশ করবে। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘রোজা ও কোরআন কেয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে, হে আমার রব! আমি তাকে দিনে খাবার ও প্রবৃত্তি থেকে বিরত রেখেছিলাম, সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আর কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছিলাম, সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। অতঃপর তাদের উভয়ের সুপারিশ কবুল করা হবে।’ (মুসনাদ আহমাদ) এই হাদিসে রোজাকে একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা কেয়ামতের কঠিন দিনে বান্দার পক্ষে সাক্ষ্য ও সুপারিশ করবে। এটি রোজার মর্যাদা ও গুরুত্বের এক উজ্জ্বল প্রমাণ।

রোজা বিশেষ ইবাদত : একটি হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘রোজা আমার জন্য, আর আমিই এর প্রতিদান দেব।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, রোজা এমন একটি ইবাদত, যার প্রতিদান সরাসরি আল্লাহ নিজে প্রদান করবেন। অন্যান্য আমলের সওয়াব নির্দিষ্ট হারে বর্ণিত হলেও রোজার সওয়াব অসীম। কারণ রোজা সম্পূর্ণরূপে আন্তরিকতার ওপর নির্ভরশীল। কেউ চাইলে গোপনে খেতে পারে, কিন্তু সে আল্লাহর ভয়ে তা থেকে বিরত থাকে। এই বিশেষ মর্যাদার কারণেই রোজা কেয়ামতের দিন সুপারিশের অধিকার লাভ করবে।

রোজা ঢালস্বরূপ : নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘রোজা হলো ঢালস্বরূপ।’ (সহিহ বুখারি) ঢাল যেমন শত্রুর আঘাত থেকে রক্ষা করে, তেমনি রোজা মানুষকে গুনাহ ও জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করে। দুনিয়াতে রোজা পাপ থেকে বিরত রাখে, আর আখেরাতে তা জাহান্নাম থেকে বাঁচার মাধ্যম হয়। এই সুরক্ষাই পরবর্তী সময় সুপারিশের রূপ ধারণ করে।

রোজাদারদের সম্মান : রোজাদারদের জন্য জান্নাতে একটি বিশেষ দরজা থাকবে, যার নাম রাইয়ান। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘জান্নাতে রাইয়ান নামক একটি দরজা আছে। কেয়ামতের দিন রোজাদাররা সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। তাদের ছাড়া আর কেউ সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম) এই বিশেষ সম্মান প্রমাণ করে, রোজা মহান আল্লাহর কাছে কত প্রিয় ইবাদত। কেয়ামতের ভয়াবহ দিনে যখন মানুষ দিশেহারা থাকবে, তখন রোজাদারদের জন্য থাকবে সম্মানিত প্রবেশদ্বার।

গুনাহ মাফ : রোজা শুধু সুপারিশই করবে না, বরং গুনাহ মাফের কারণও হবে। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখে, তার পূর্বের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ (সহিহ বুখারি) এখানে শর্ত হলো, ইমান ও ইখলাস। অর্থাৎ রোজা হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। এমন রোজা বান্দাকে পাপমুক্ত করে এবং কেয়ামতের দিন তার পক্ষে সাক্ষ্য দেয়।

রোজার নৈতিক প্রভাব : রোজা কেবল না খেয়ে থাকার নাম নয়। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মন্দ কাজ পরিত্যাগ করে না, তার পানাহার ত্যাগ করার কোনো প্রয়োজন আল্লাহর নেই।’ (সহিহ বুখারি) অর্থাৎ রোজার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো আত্মশুদ্ধি। যদি কেউ রোজা রেখে গিবত, মিথ্যা, অন্যায় ও পাপ থেকে বিরত না থাকে, তবে সে রোজার প্রকৃত সুফল থেকে বঞ্চিত হবে। আর যে ব্যক্তি রোজার মাধ্যমে চরিত্র সংশোধন করে, তার রোজাই কেয়ামতের দিন সুপারিশের যোগ্য হবে।

কেয়ামতের প্রেক্ষাপট : কেয়ামতের দিন হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘সেদিন মানুষ তার ভাই, মা, বাবা, স্ত্রী ও সন্তানদের থেকেও পালাবে।’ (সুরা আবাসা ৩৪-৩৬) এমন কঠিন দিনে মানুষ সাহায্য ও সুপারিশের প্রত্যাশা করবে। নবীগণ, ফেরেশতাগণ ও সৎকর্মসমূহ আল্লাহর অনুমতিতে সুপারিশ করবে। রোজাও তখন বান্দার পক্ষে দাঁড়াবে, এটি মুমিনের জন্য অপরিসীম আশার সংবাদ।

রোজা মুক্তির পথ সুগম করে : রোজা এমন একটি ইবাদত, যা দুনিয়াতে আত্মসংযম শেখায় এবং আখেরাতে মুক্তির পথ সুগম করে। কোরআন ও হাদিসের আলোকে স্পষ্ট যে, রোজা কেয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। তবে সেই রোজা হতে হবে ইখলাসপূর্ণ, তাকওয়াভিত্তিক ও গুনাহমুক্ত।

অতএব, আমাদের উচিত রোজাকে কেবল আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে না দেখে তা হৃদয়ের গভীরতা থেকে পালন করা। ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করার পাশাপাশি চোখ, কান, জিহ্বা ও অন্তরকে পাপ থেকে সংযত রাখা। তাহলেই আমাদের রোজা কেয়ামতের কঠিন দিনে আমাদের জন্য আলোর উৎস ও সুপারিশকারী হয়ে উঠবে। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে এমন রোজা রাখার তৌফিক দান করুন, যা কেয়ামতের দিন আমাদের জন্য নাজাতের মাধ্যম হবে। আমিন।

লেখক : মুহতামিম, জহিরুল উলুম মহিলা মাদ্রাসা, গাজীপুর