অস্কারেও সেরা ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’

সব কৌতূহল শেষ করে অনুষ্ঠিত হলো বিশ্ব চলচ্চিত্রের সবচেয়ে ঐতিহ্যশালী পুরস্কারের আসর অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডস তথা অস্কার অনুষ্ঠান। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের লস অ্যাঞ্জেলেসে হলিউডের ডলবি থিয়েটারে বাংলাদেশ সময় অনুসারে গতকাল সোমবার ভোরে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা ও পুরস্কার বিতরণ করা হয়। এবারের আসরে সেরা চলচ্চিত্রসহ সর্বাধিক ছয়টি পুরস্কার জিতেছে আমেরিকান সুপারস্টার লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও অভিনীত ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’। ডার্ক কমেডি ধাঁচের রাজনৈতিক থ্রিলারটি নির্মাণের জন্য সেরা পরিচালক হয়েছেন পল টমাস অ্যান্ডারসন। সেরা প্রযোজক এবং সেরা রূপান্তরিত চিত্রনাট্যকার পুরস্কার দুটিও উঠেছে ৫৫ বছর বয়সী এই আমেরিকান নির্মাতার হাতে। এ ছাড়া প্রথমবার সেরা অভিনেতা-অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়ে নতুন রেকর্ড গড়ার পাশাপাশি অস্কারের মঞ্চ যেন অনেকের কাছে হয়ে উঠেছিল অনুপ্রেরণার এক ঠিকানা। সব মিলিয়ে, এবারের অস্কারের রাত যেমন ছিল গ্ল্যামারে ভরা, তেমনই ছিল কিছু অপ্রত্যাশিত মুহূর্তেও চমকে দেওয়া। আবার বর্ষীয়ান অভিনেতা শন পেনের অনুপস্থিতিও ছিল রহস্যময়। 

গত বছরের মতো এবারও অস্কারের সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন কৌতুকশিল্পী কোনান ও ব্রায়ান। অনুষ্ঠানের শুরুতেই সঞ্চালক তথা কৌতুকশিল্পী কোনান ও ব্রায়েন রসিকতার সুরে বলেন, ‘এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমিই হয়তো অস্কারের শেষ সঞ্চালক যে মানুষ!’ হলিউডে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাড়তে থাকা প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের প্রসঙ্গ তুলেই এমন মন্তব্য করেন তিনি। কোনান আরও বলেন, এ বছরের অস্কারে ছয়টি মহাদেশের ৩১টি দেশের শিল্পীরা মনোনয়ন পেয়েছেন। তার কথায়, ‘আমরা উদ্যাপন করছি এই ভেবে নয় যে সবকিছু ঠিক আছে, বরং আমরা আরও ভালো কিছুর আশায় কাজ করে চলেছি।’ মূল আয়োজন শুরুর আগে লালগালিচায় জৌলুশ ছড়িয়েছেন তারকারা। অস্কারের সামাজিক মাধ্যম দূত ও রেড কার্পেট প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ব্রিটিশ কমেডিয়ান অ্যামেলিয়া ডিমোল্ডেনবার্গ। প্রয়াত অভিনেতা রবার্ট রেডফোর্ড ও পরিচালক রব রেইনার স্মরণে গান গেয়ে শুনিয়েছেন বারব্রা স্ট্রাইস্যান্ড। ওয়াল্ট ডিজনি কোম্পানির মালিকানাধীন এবিসি টেলিভিশন নেটওয়ার্ক বাংলাদেশসহ ২০০টিরও বেশি দেশে সরাসরি সম্প্রচার করেছে জমকালো এই আয়োজন। এ ছাড়া স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম হুলু’তে সরাসরি দেখানো হয়েছে অনুষ্ঠানটি।

৯৮তম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসে মোট ১৩টি মনোনয়ন পেয়েছে ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’। ছবিটিতে কর্র্তৃত্ববাদী মার্কিন শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা বিপ্লবীদের গল্প রয়েছে, যারা আত্মগোপনে থাকলেও অতীত শেষ পর্যন্ত তাড়া করে ফিরে আসে। একজন সাবেক বিপ্লবীর মেয়ে অপহরণের ঘটনায় সবাই আবার হাতে হাত মেলায়। ছবিটিতে দুর্নীতিগ্রস্ত সামরিক কর্মকর্তা কর্নেল স্টিভেন জে. লকজো চরিত্রের জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেতা হয়েছেন শন পেন। এটি তার তৃতীয় অস্কার।

অস্কারে নতুন চালু হওয়া সেরা কাস্টিং পুরস্কার পেয়েছে ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’। এ ছাড়া সেরা চলচ্চিত্র সম্পাদনা বিভাগের স্বীকৃতি এসেছে ছবিটির ঘরে।

এবারের আসরে রেকর্ডসংখ্যক ১৬টি মনোনয়ন পাওয়া ভ্যাম্পায়ার হরর ‘সিনার্স’ চারটি পুরস্কার জিতেছে। এর মধ্যে টিমোতি শালামেকে পেছনে ফেলে সেরা অভিনেতার অস্কার জিতেছেন মাইকেল বি. জর্ডান। ব্লুজ সংগীত ও কৃষ্ণাঙ্গ সংস্কৃতির মিশ্রণ ঘটানো ছবিটিতে দুই যমজ ভাইয়ের চরিত্রে নৈপুণ্য দেখিয়েছেন তিনি। সিনেমায় অতিপ্রাকৃত ভৌতিক আবহকে বিভাজন ও বর্ণবাদের রূপক হিসেবে দেখিয়েছেন পরিচালক রায়ান কুগলার। তিনি সেরা মৌলিক চিত্রনাট্যকারের অস্কার জিতেছেন। এ ছাড়া সেরা সেরা চিত্রগ্রহণ ও সেরা মৌলিক আবহ সংগীত বিভাগে পুরস্কৃত হয়েছে ‘সিনার্স’। এর মধ্যে অস্কারের সেরা চিত্রগ্রহণ শাখায় পুরস্কৃত প্রথম নারী হিসেবে রেকর্ড বুকে স্থান করে নিয়েছেন অটাম ডুরাল্ড আরকাপো।

হ্যামনেট সিনেমায় অভিনয় করে সেরা অভিনেত্রী বিভাগে প্রত্যাশিতভাবে জিতেছেন জেসি বাকলি। সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী বিভাগে জিতেছেন ৭৫ বছর বয়সী অ্যামি ম্যাডিগ্যান। ভৌতিক ধাঁচের ‘ওয়েপন্স’ ছবিতে আমেরিকার একটি শহরে আসা এক অদ্ভুত খেয়ালি চাচির চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। ১৯৮৫ সালে ‘টোয়াইস ইন অ্যা লাইফটাইম’ ছবির জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী বিভাগে প্রথমবার অস্কারে মনোনয়ন পান ম্যাডিগান। ৪০ বছর পর দ্বিতীয়বার মনোনীত হয়ে সোনালি ট্রফি উঠল তার হাতে। সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী বিভাগ ছাড়া আর কোথাও নেই তার অভিনীত ‘ওয়েপন্স’। কোনো ছবির একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে মনোনয়ন তালিকায় স্থান পাওয়া মাত্র পাঁচজন অস্কার জিতেছেন। তারা হলেন জুলিয়ান মুর (স্টিল অ্যালিস), শার্লিজ থেরন (মনস্টার), ফরেস্ট হুইটেকার (দ্য লাস্ট কিং অব স্কটল্যান্ড), ক্রিস্টোফার প্লামার (বিগিনার্স) ও পেনেলোপি ক্রুজ (ভিকি ক্রিস্টিনা বার্সেলোনা)। তাদের পাশে যুক্ত হলো ম্যাডিগানের নাম। সেরা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বিভাগে ব্রাজিলের ‘দ্য সিক্রেট এজেন্ট’কে হটিয়ে অস্কার জিতেছে নরওয়ের ইয়োয়াকিম ত্রিয়ের পরিচালিত ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’।

সেরা অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্রের স্বীকৃতি পেয়েছে নেটফ্লিক্সের ‘কেপপ ডিমন হান্টার্স’। হান্টার/এক্স নামের একটি ব্যান্ডের তিন কে-পপ আইডলকে কেন্দ্র করে ছবিটির গল্প। মঞ্চে নেচে-গেয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করার পাশাপাশি অশুভ শক্তির হাত থেকে বিশ্বকে বাঁচাতে গান-বাজনাকে ব্যবহার করে তারা। ছবিটিতে মূল চরিত্র রুমি হিসেবে কণ্ঠ দিয়েছেন কোরিয়ান-আমেরিকান অভিনেত্রী আর্ডেন চো। ‘কেপপ ডিমন হান্টার্স’ মুক্তির মাত্র দুই মাসের মধ্যেই নেটফ্লিক্সের সর্বকালের সবচেয়ে বেশি দেখা অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্রে পরিণত হয়েছে। ছবিটি পরিচালনা করেছেন দক্ষিণ কোরিয়ান-কানাডিয়ান নির্মাতা ম্যাগি ক্যাং ও আমেরিকান নির্মাতা ক্রিস অ্যাপেলহান্স।

‘কেপপ ডিমন হান্টার্স’-এর ‘গোল্ডেন’ সেরা মৌলিক গান বিভাগে অস্কার জিতেছে। অনুষ্ঠানে এটি পরিবেশন করেন দক্ষিণ কোরিয়ান-আমেরিকান গায়িকা ইজেই, রেই আমি এবং আমেরিকান র‌্যাপার অড্রে নুনা। ‘গোল্ডেন’ গানটির কথা লিখেছেন ও সুর করেছেন ইজেই, মার্ক সনেনব্লিক, জুং জিউ কোয়াক, ইয়ু হান লি, হি ডং নাম, জিয়ং হুন সিও এবং টেডি পার্ক।

অস্কারের ইতিহাসে এই দুটি বিভাগে এর আগে পুরস্কার জিতেছে ‘টয় স্টোরি থ্রি’ (২০১০) ও ‘ফ্রোজেন’ (২০১৩)। তালিকায় নতুন সংযোজন হলো ‘কেপপ ডিমন হান্টার্স’। সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে যৌথভাবে অস্কার জিতেছে ‘দ্য সিঙ্গারস’ এবং ‘টু পিপল এক্সচেঞ্জিং স্যালাইভা’। অস্কারের প্রায় শত বছরের ইতিহাসে এ নিয়ে ষষ্ঠবার সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে এমন ঘটনা ঘটল।