ঘরমুখো মানুষের ভিড় বাড়ছে সদরঘাটে

প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ করতে রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছে মানুষ। গতকাল সোমবার রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে গিয়ে দেখা গেছে গত কয়েক দিনের তুলনায় ভিড় কিছুটা বেড়েছে। লঞ্চ মালিক ও চালকরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, ঈদ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে চাপ বাড়বে। এদিকে লঞ্চ মালিকদের দাবি, জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিলে লঞ্চ চলাচলে বিঘ্ন ঘটতে পারে। সময়মতো পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ না পেলে কিছু রুটে লঞ্চ চলাচল কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা। এতে ঈদযাত্রাকে ঘিরে যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়তে পারে বলে মনে করেন তারা।

নৌযান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থার পরিচালক ওয়াহিদুর রহমান লিটন দেশ রূপান্তরকে জানান, সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে  আমরা ১০ শতাংশ ছাড় দিয়ে যাত্রীসেবা দিচ্ছি। আমাদের পর্যাপ্ত লঞ্চও আছে। কিন্তু সংকট দেখা দিতে পারে জ্বালানি তেল নিয়ে।

তিনি বলেন, ‘আজ (গতকাল) আমাদের যেসব ট্যাংকার গ্যাসের ডিপোতে যেমন, পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা তেল নিতে গেছে, সেগুলো তাদের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ পাচ্ছে না। কোথাও ৪০ শতাংশ কোথাও ৩০, আবার কোথাও ৫০ শতাংশের বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না। আমার মোট চাহিদা প্রায় ৩ লাখ লিটার। এ অবস্থায় যদি সদরঘাটে আমি মাত্র ১ লাখ লিটার তেল পাই, তাহলে বাকি ২ লাখ লিটার কীভাবে সংগ্রহ করা হবে সেটি বড় প্রশ্ন। ফলে তেলের সংকট দেখা দিতে পারে, যাত্রী পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং এতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল।’

লঞ্চ মালিকদের শঙ্কার বিষয়ে নৌ, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন,  ‘গতকাল (রবিবার) রাত ১১টার দিকে নিশ্চিত করেছি যে, পাবলিক পরিবহন যেগুলো আছে, সবাই পর্যাপ্ত তেল পাবে। আমার বিশ্বাস, কোনো আশঙ্কা নেই এবং তেল সবাই পাচ্ছে। যদি তেল পেতে কোনো অসুবিধা হয়, সেটা আমাদের জানালে আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেব। তেল পর্যাপ্ত পাবে, চলাচলে তেলের কোনো ঘাটতি নেই।’

বিআইডব্লিউটিসির তথ্য অনুযায়ী, এবার ঈদে যাত্রী পরিবহনে শতাধিক লঞ্চ প্রস্তুত রয়েছে।  যাত্রী চাপের ওপর নির্ভর করে প্রয়োজনে লঞ্চ আরও বাড়ানো হবে। প্রতিটি নৌযানেই লাইফ জ্যাকেটসহ জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

ঢাকা নদী বন্দর, বন্দর ও পরিবহন বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মোবারক হোসেন মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পদ্মা সেতু হওয়ার পর যাত্রী চাপ কমতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি ভালো মানের লঞ্চ সার্ভিস দেওয়ায় লঞ্চ ভ্রমণের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। এ ছাড়া সড়কে দুর্ঘটনার হার বেড়েছে, যার কারণে মানুষ লঞ্চ ব্যবহার করতে বেশি উৎসাহী হচ্ছে। আমরা ইতিমধ্যেই পর্যাপ্ত লঞ্চের ব্যবস্থা করেছি, সব আধুনিক লঞ্চ রয়েছে, তাই এ পরিস্থিতিতে তেমন কোনো সমস্যা হবে বলে আমরা মনে করি না।’

সরেজমিনে দেখা গেছে, বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ সদরঘাটে বিশেষ প্রস্তুতি নিয়েছে। বিপুলসংখ্যক পুলিশ, র‌্যাব, আনসার, বিএনসিসি, ভ্রাম্যমাণ আদালতের দল ও মেডিকেল টিমের সদস্যদের ঘাট এলাকায় দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের জন্য হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ভোলার চরফ্যাশনের যাত্রী ইতি রহমান বলেন, ‘এবার টার্মিনালে এসে একটু বেশি অবাক হয়েছি। আমার বাবা অসুস্থ। সিএনজি থেকে নামতেই দেখলাম কয়েকজন হুইলচেয়ার নিয়ে এসেছেন। একদম লঞ্চ পর্যন্ত তারা পৌঁছে দিয়ে গেছে।’

এম ভি ফারহান-৭ লঞ্চের আরেক যাত্রী কবির খান বলেন, ‘আমার স্ত্রীর পায়ের অপারেশন হয়েছে। ঘাটে আসার পর একজন এগিয়ে এসে বললেন, কোনো সহযোগিতা লাগবে কি না? পরে দুজন লঞ্চ পর্যন্ত হুইলচেয়ারে করে নিয়ে এসেছেন। এটা খুবই প্রশংসনীয় উদ্যোগ।’

এম ভি পূবালী লঞ্চের যাত্রী আবু হায়দার বলেন, আগের ভাড়াই নেওয়া হচ্ছে। আমরা দুটো সিঙ্গেল কেবিন নিয়েছি। নন এসি ১ হাজার টাকা, এসি ১ হাজার ২০০ টাকা। বাড়তি কোনো ভাড়া নেওয়া হয়নি।

বন্দরের যুগ্ম পরিচালক মোবারক হোসেন মজুমদার বলেন, ‘আমরা এখানে প্রায় ৫০টি ট্রলি এবং প্রায় ৩০টি হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করেছি। এ ছাড়া ২০০ জন কুলি নিয়োজিত করা হয়েছে। ৭০ জন ক্যাডেট পর্যায়ক্রমে ডিউটি করছেন, যাতে যাত্রীদের জন্য হুইলচেয়ার সার্ভিস সুষ্ঠুভাবে প্রদান করা যায়।’

এদিকে কুলি সার্ভিস ফ্রি করা হলেও যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে দেখা গেছে তাদের। বোরহানউদ্দিনগামী গাজী সালাউদ্দিন লঞ্চের যাত্রী আরাফাত বলেন, ‘আমি ট্রলিতে করে নিজের মালামাল নিজে নিয়ে এসেছি। লঞ্চের সামনে আসার পর কয়েকজন কুলি না জিজ্ঞেস করে বড় ব্যাগগুলো মাথায় তুলে নেন। পরে বকশিসের নামে ২০০ টাকা নেন। তাহলে ফ্রি সার্ভিসটা কোথায়?’

একই লঞ্চের আরেক যাত্রী শফিকুল বলেন, পন্টুন থেকে একটা বস্তা লঞ্চের সামনে তুলে দিয়ে ১০০ টাকা নিয়েছেন। টাকা না দিলে কুলিরা সহযোগিতা করেন না।

নৌ-পরিবহন, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এসব বিষয়ে বলেন, ‘ঈদ উপলক্ষে ইতিমধ্যে সাত দিনের জন্য ইজারা চার্জও মওকুফ করে দেওয়া হয়েছে। যারা ঘাটে ইজারা নিয়ে সার্ভিস দেন, আমরা তাদের মন্ত্রণালয় থেকে বলেছি, তাদের এই সাত দিনের ব্যয় আমরা (মন্ত্রণালয়) বহন করব। ঢাকায় আসার সময় যাত্রীদের বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যাতে কোনো সমস্যা না হয়, সে ব্যবস্থা আমরা নিয়েছি। কোনো হয়রানির ঘটনা ঘটলে বা  যারা হয়রানি করবে, তাদের শাস্তির আওতায় আনা হবে।’