ঈদে ৮৭ শতাংশ বাস-মিনিবাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য গত ২০ বছরের রেকর্ড ভঙ্গ করতে চলেছে বলে অভিযোগ করেছে সংগঠনটি। গতকাল বুধবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী ঈদযাত্রা ঘিরে ভাড়া বৃদ্ধির বিশৃঙ্খলা ও যাত্রী হয়রানির অভিযোগ তুলে ধরেন।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সরকারের কড়া হুঁশিয়ারির পরও বিভিন্ন শ্রেণির বাস ও মিনিবাসে ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার ঘটনা চলছে। গত বুধবার থেকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরের সিটিবাসেও অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার নৈতিক অব্যবস্থার পরিচয় মিলেছে। নৌপথের বেশিরভাগ রুটেও এমন পরিস্থিতি লক্ষ করা গেছে। তবে সরকার এ অভিযোগ সবসময়ই অস্বীকার করছে এবং মালিকদের নির্দেশনা অনুযায়ী গণমাধ্যমে বক্তব্য প্রকাশ করছে।
যাত্রীকল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে অনুযায়ী, এবারের ঈদে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আন্তঃজেলা এবং দূরপাল্লার বাস-মিনিবাসে প্রায় ৪০ লাখ ট্রিপ যাত্রী যাতায়াত করতে পারে। এ ছাড়া রাজধানীসহ দেশের শহরকেন্দ্রিক সিটি সার্ভিসের বাসে আরও প্রায় ৬০ লাখ ট্রিপ যাত্রী যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৪ থেকে ১৮ মার্চের মধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মানুষের যাতায়াত, ঈদে টিকিটসংক্রান্ত ব্যবস্থাপনা, সরকারি নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এবারের ঈদে ৮৭ শতাংশ বাস-মিনিবাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য দেখা দিয়েছে। ঢাকা থেকে পাবনা বাসের ভাড়া সাধারণত ৫৫০-৬০০ টাকা হলেও ঈদে ১২০০, নাটোর ৫৫০-৫৮০ থেকে ১২০০, রংপুর ৫০০ থেকে ১৫০০, নোয়াখালী ৫০০ থেকে ৮০০, লক্ষ্মীপুর ৫০০ থেকে ৭০০, রামগঞ্জ ৩৫০ থেকে ৮০০, ময়মনসিংহ লোকাল বাস ২৫০ থেকে ৬০০, খুলনা ৫০০ থেকে ৮০০, চট্টগ্রাম থেকে লক্ষ্মীপুর ৪০০ থেকে ৮০০, ভোলা ৪৫০ থেকে ৯০০ এবং ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ ট্রাক-পিকআপে যাত্রীর জন্য ৫০০ টাকা ভাড়া আদায় করা হয়েছে। এ ছাড়া ঈদের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ভাড়া প্রতিদিনই বাড়ছে।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ৫২ আসনের বাসও ৪০ আসনের বাসের ভাড়ার সঙ্গে মিলিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে অসাধু পরিবহন মালিকরা। সিএনজি ও ডিজেলচালিত বাসের ভাড়ার পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ঈদযাত্রায় সব বাসে সমান হারে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। কিছু পরিচিত কোম্পানির বাসে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের নির্দিষ্ট গন্তব্যের টিকিট নেই বলে যাত্রীকে সাতকানিয়া, চকরিয়া বা বান্দরবানের টিকিট কাটতে বাধ্য করা হচ্ছে। একইভাবে উত্তরবঙ্গের বগুড়া রুটে রংপুর বা নওগাঁ পর্যন্ত টিকিট নিতে হচ্ছে। অন্যান্য রুটেও যাত্রীদের তাদের কাক্সিক্ষত গন্তব্য থেকে দূরের টিকিট কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে।
যাত্রীকল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে জানা গেছে, সরকার বাস, লঞ্চ ও অন্যান্য গণপরিবহনের ভাড়া নির্ধারণকালে চালক-সহকারী ও ভাড়া আদায়কারীর বেতন-ভাতা ও দুই ঈদ বোনাস ধার্য রাখলেও মালিকরা তা পরিশোধ করছেন না। সংগঠনটি বলেছে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ঈদকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি, কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত খরচ জোগান এবং মালিকদের অতিরিক্ত মুনাফা লুফের কারণে গণপরিবহন ও প্রাইভেট পরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় চলছে। সড়ক ও নৌপথে অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ন্ত্রণের জন্য মনিটরিং টিমে যাত্রী সংগঠন না থাকার কারণে এ নৈরাজ্য রোধে কেউ নেই।
যাত্রীকল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এবারের ঈদে ঢাকা থেকে দূরপাল্লার বাস-মিনিবাসে ৪০ লাখ ট্রিপ যাত্রী যাতায়াতে ৮৭ শতাংশে গড়ে প্রতি টিকিটে ৩৫০ টাকা অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হচ্ছে। এর ফলে দূরপাল্লার যাত্রীদের মোট ১২১.৮ কোটি টাকা অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হবে। ঢাকাসহ শহরের সিটি সার্ভিসে ৬০ লাখ ট্রিপ যাত্রী ৮৭ শতাংশে প্রতি টিকিটে গড়ে ৫০ টাকা অতিরিক্ত দিলে ২৬.১ কোটি টাকা ভাড়া গুনতে হবে। ফলে এবারের ঈদে বাস-মিনিবাসে মোট প্রায় ১৪৮ কোটি টাকা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় হবে।
এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য যাত্রীকল্যাণ সমিতি দাবি করেছে, গণপরিবহনে ডিজিটাল লেনদেন চালু করা, নগদ লেনদেন বন্ধ রাখা, সড়ক-মহাসড়কে সিসি ক্যামেরা দ্বারা মনিটরিং চালু করা এবং আইনের সুশাসন নিশ্চিত করা।