ঈদের আনন্দ মানেই ঘরে ফেরা, স্বজনদের সঙ্গে আনন্দ উপভোগ। কিন্তু সেই আনন্দ উপভোগে যাওয়া-আসা এবার অনেকের জন্য হয়েছে শেষযাত্রা। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়ার ঘাটে পদ্মার বুকে ডুবে যাওয়া একটি বাস যেন পুরো জাতিকে আবারও মনে করিয়ে দিল, আমাদের সড়ক ও নৌপথ এখনো কতটা অনিরাপদ, কতটা নির্মম। কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’- এর বাসটিতে অন্তত ৪৫ জন যাত্রী ছিলেন। ঈদের ছুটি শেষে তাদের রাজধানীতে ফেরার তাড়া, চোখে নতুন দিনের স্বপ্ন।
গত বুধবার বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে বাসটি পৌঁছায় দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ঘাটে। পদ্মা পার হতে ফেরিতে ওঠার অপেক্ষা, আর ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটে যায় বিভীষিকাময় ঘটনা। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি পন্টুন থেকে পড়ে যায় নদীতে। মুহূর্তেই ডুবে যায় ৪৫টি স্বপ্ন, ৪৫টি পরিবারের আশা-আকাক্সক্ষা। মুহূর্তেই শেষ কত স্বপ্ন, কত সম্ভাবনা! বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত শিশুসহ ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। যাদের কেউ আর ফিরবেন না ঘরে, না মায়ের কোলে, না সন্তানের কাছে, না প্রিয়জনের অপেক্ষায় থাকা দরজার সামনে। যে যাত্রা হওয়ার কথা ছিল জীবিকার, সেটাই পরিণত হলো মৃত্যুর মিছিলে।
এর আগে গ্রামে পরিবারের সঙ্গে ঈদ আনন্দ উপভোগ করতে যাওয়া হয়নি অনেকের। ঈদের আগেই ঈদ আনন্দ বিষাদের দানব হয়ে দেখা দিয়েছে বহু পরিবারে। মুহূর্তেই পরিণত হয় নিরানন্দে। অনেক পরিবারে নেমে আসে শোকের কালো ছায়া। ঈদের নতুন জামা, প্রিয়জনের কাছ থেকে ঈদের সালামি, ঈদের আগেই সব কষ্ট হয়ে দেখা দেয়। নতুন পোশাকে যাদের বাড়ি মাতিয়ে রাখার কথা, তাদের অনেকের জায়গা হয়েছে মর্গে, কাফন জড়িয়ে কবরে কিংবা শ্মশানে। আর বেঁচে ফেরাদের ঈদ কাটে হাসপাতালে কিংবা বাড়ির বিছানায় শুয়ে।
প্রতিবছরই ঈদযাত্রায় পঙ্গু হন, প্রাণ হারান বহু মানুষ। কেউ লঞ্চে, ট্রেনে, কেউ মোটরসাইকেলে, কেউ বাস-ট্রাক কিংবা অটোরিকশায় দুর্ঘটনার শিকার হন। এবার মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কিছুটা কমেছে। এর পেছনে একটি কারণ, জ্বালানি তেলের মূল্য ও সংকট। তেলের কারণে সড়কে মোটরসাইকেলের সংখ্যা কম থাকায় দুর্ঘটনাও কিছুটা কমেছে। কিন্তু তাতে সামগ্রিক চিত্র বদলায়নি। বরং অটোরিকশা বা ইজিবাইক দুর্ঘটনায় মৃত্যু বেড়ে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে। অন্য বারের তুলনায় এবার ২৫ মার্চ পর্যন্ত বেশি প্রাণ হারিয়েছেন অটোরিকশা দুর্ঘটনায়।
ঈদের আগের এবং পরের সাত দিন নিয়ে ১৫ দিনকে ঈদযাত্রা হিসেবে ধরা হয়। সেই হিসেবে এবার ১৪ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত ঈদযাত্রা। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঈদযাত্রায় ১৪ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত ১২ দিনে ২৭০টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২৮৫ জন, আহত ৭২৯ জন। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ৯ দিনে ৩৪২টি দুর্ঘটনায় ২৭৪ জন নিহত হয়েছেন। সরকারি হিসেবে ছুটির সাত দিনে নিহত হয়েছেন ১০০ জন। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) জানিয়েছে, ১৭-২৩ মার্চ পর্যন্ত ছুটিতে সারা দেশে ৯২টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ১০০ জন নিহত এবং ২১৭ জন আহত হয়েছেন। সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি সংখ্যা একটি পরিবার, একটি গল্প, একটি অপূরণীয় শূন্যতা।
এবার ঈদের বড় দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি বগুড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের চারজনের মৃত্যুর ঘটনা। ওই দুঘটনায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় দেড় বছরের শিশু। এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গভীর শোক প্রকাশ করেন। তিনি ওই শিশুর চিকিৎসার দায়িত্ব নেন। ঈদুল ফিতরের দিন ভোরে কুমিল্লায় বাস-ট্রেন সংঘর্ষে ১২ জনের মৃত্যু হয়। ঈদের আগে সদরঘাটে লঞ্চের ধাক্কায় দুই জন নিহত হন। এই ঈদে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে ২৫ মার্চ দৌলতদিয়া ফেরিঘাট থেকে বাস নদীতে পড়ে। গতকাল বিকেলে সন্ধ্যা পর্যন্ত ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। এসব ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিক খোঁজ নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সেই সঙ্গে তিনি গভীর শোক প্রকাশ করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, এই ঈদে ইজিবাইক দুর্ঘটনায় মৃত্যু বেশি হয়েছে। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা এবার কম। এর কারণ হিসেবে তিনি তেলের ইস্যুটি সামনে আনেন। বলেন, তেলের কারণে মোটরসাইকেল রাস্তায় কম চলেছে, এ জন্য মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কিছুটা কম হয়েছে। ১৭ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত ৩৪২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ২৭৪ জন নিহত হয়েছেন। এখন পর্যন্ত অটোরিকশা দুর্ঘটনায় মৃত্যু বেশি হয়েছে। কতজন মারা গেছে অটোরিকশায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এখনো প্রস্তুত হয়নি। প্রস্তুত হলে নিশ্চিত করে জানানো যাবে। তবে গত বছরের তুলনায় দুর্ঘটনার মাত্রা একটু বেশি।
দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে ‘ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা’ উল্লেখ করে সাইদুর রহমান বলেন, ‘আমাদের এখানে সড়ক পরিবহনে কোনো ব্যবস্থাপনা নেই। সেই ব্যবস্থাপনার মধ্যে ড্রাইভের দক্ষতা উন্নয়ন, দক্ষ চালক তৈরি করা, তাদের পেশাগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা, ফিটনেস যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা। সবই নির্ভর করে ব্যবস্থাপনার ওপর। কিন্তু আমাদের এখানে কোনো ব্যবস্থাপনা নেই। যার ফলে দুর্ঘটনা এভাবে ঘটছে।’
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, একেকটি বড় দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি হয়, কিছুদিন হইচই হয়, এই তদন্ত কমিটির রিপোর্টগুলো ধামাচাপা পড়ে যায়, এগুলো কখনো আলোর মুখ দেখে না। যে সুপারিশ করা হয়, সেগুলো বাস্তবায়ন হয় না। অন্যদিকে আবার নতুন দুর্ঘটনা ঘটতে থাকে। দেশে প্রতিদিন বহু সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। যেগুলোর কারণ চিহ্নিত, কিন্তু সমাধান হচ্ছে না। বিগত সরকার নানাভাবে মালিকদের বেপরোয়া হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। বর্তমান সরকারও দেখছি নানাভাবে মালিকদের পক্ষ নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করছে। এর মধ্য দিয়ে মালিকরা বেপরোয়া হয়, বিষয়টি সরকারের মাথায় রাখা উচিত।
২০২৫ সালে ঈদযাত্রায় ১৫ দিনে ৩১৫টি দুর্ঘটনায় ৩২২ জন নিহত হন। যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, ২০২৪ সালের ঈদুল ফিতরে সড়কে ৩৯৯টি দুর্ঘটনায় ৪০৭ জন নিহত এবং ১ হাজার ৩৯৮ জন আহত হয়। ২০২৩ সালে ৩০৪টি দুর্ঘটনায় ৩২৮ জন নিহত এবং আহত হয়েছিলেন ৫৬৫ জন।
এবার দুর্ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমাধানের জন্য বিভিন্ন জনে বিভিন্ন দাবি তুলে পোস্ট দিচ্ছেন। তারা বলছেন, প্রতিবছরই একই গল্প, শুধু সংখ্যা বদলায়, কিন্তু কান্না বদলায় না। এই মৃত্যু থামবে কবে? যেখানে নিরাপত্তার চেয়ে অব্যবস্থাপনা বড়, জীবনের চেয়ে অবহেলা ভারী। ঈদ মানে আনন্দ, কিন্তু সেই আনন্দ যদি বারবার রক্তে রঞ্জিত হয়, তবে প্রশ্ন থেকেই যায়: এই মৃত্যুর মিছিল থামবে কবে? কবে নিরাপদ হবে ফেরার পথ?