শিশুর লালন-পালন আপনার পদ্ধতি কোনটি

শিশু কেমন মানুষ হিসেবে তৈরি হবে তার অনেকখানি নির্ভর করে তাকে কোন পদ্ধতিতে লালন-পালন করা হচ্ছে তার ওপর। নগরে শিশুরা চার দেয়ালের ভেতর বন্দি থাকে। তারা বাইরে থেকে শেখার সুযোগ খুব কম পায় আর এ কারণেই পিতা-মাতার লালন-পালন পদ্ধতি শিশুর ওপর অনেক প্রভাব ফেলে। শিশুটি আত্মবিশ্বাসী ও সহযোগিতার মনোভাব সম্পন্ন হবে নাকি বিদ্রোহী অথবা প্যাসিভ হবে তা লালন-পালনের ওপর নির্ভর করে। শিশুকে শুধু বাবা-মা-ই লালন করেন না, পরিবারের সবাইও থাকেন। তাই পরিবারের সবাইকে শিখতে হবে শিশু  কোন পদ্ধতিতে লালন-পালন করতে হয়। বাবা-মাসহ পরিবারের সবাই একটি ভালো পদ্ধতি ব্যবহার করে শিশুকে লালন করতে হবে। জেনে নিই শিশু লালনের কী কী পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে এবং সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি কোনটি।

শিশু লালন-পালন পদ্ধতি : শিশু লালন-পালনের কয়েকটি পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে। এগুলো হলো অথোরেটারিয়ান, পারমিসিভ, ওভার প্রটেক্টিভ, আনইনভলভমেন্ট এবং অথোরেটেটিভ। এগুলোর বাংলা নাম দিলে সঠিক অর্থটি আসে না, তাই ইংরেজি শব্দই ব্যবহার করা হলো।

অথোরেটারিয়ান বা স্বৈরাচারী : এই পদ্ধতির বাবা-মায়েরা কড়া শাসনের মধ্যে ছেলেমেয়ে মানুষ করতে চান। আদেশ করা মাত্রই ছেলেমেয়েরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে, এমনটাই প্রত্যাশা করেন। কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই কড়া নিয়ম-কানুন মানতে হবে। ‘আমি বলছি তাই মানতে হবে’ এ জাতীয় মনোভাব থাকে। ছেলেমেয়েদের কোনো ধরনের স্বাধীনতা থাকে না। এই পদ্ধতিতে পালন করা সন্তানরা অনেক সময় মনে করে, বাবা-মা তাকে ভালোবাসে না। নিয়ম-কানুনগুলো পিতা-মাতারা বকাঝকা বা মারধরের মাধ্যমে শেখানোর চেষ্টা করেন। ছেলেমেয়েরাও মেনে চলে। তবে তারা নিয়মগুলো ভালো বা যুক্তিযুক্ত মনে করে না বরং বাবা-মায়ের বকা ও মার খেতে হবে এই ভয়ে মানেন। এর ফলে শিশুরা নিজের আচরণ নিজেই কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় শেখে না বরং তারা তুলনামূলকভাবে কম আত্ম-বিশ^াসী ও আত্ম-মর্যাদাপূর্ণ হতে পারে। তাদের স্বনির্ভরতার দিক থেকেও ঘাটতি থাকতে পারে। ফলে অনেকে কিশোর বয়সে এসে নানা রকমের ভুল করে ফেলে। যেমন : নেশার মধ্যে জড়িয়ে যায় এবং সবকিছু নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব যেহেতু বাবা-মায়ের ফলে তারা তাদের নেশা থেকে মুক্ত রাখার দায়িত্বও বাবা-মায়ের বলে মনে করে। বড় হওয়ার পর সম্পর্কগুলোর মধ্যেও প্রভাব পড়ে।

পারমিসিভ : এই পদ্ধতি আগের পদ্ধতির (অথোরেটারিয়ান/স্বৈরাচারী) চাইতে সম্পূর্ণ বিপরীত। এখানে তেমন কোনো নিয়ম-কানুন নেই। নিয়ম থাকলেও খুবই এলোমেলোভাবে থাকে। শিশুর সব চাহিদা বলা মাত্রই পূরণ করা হয়। শিশুটি বিপদের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর সম্ভাবনা না থাকলে শিশু যা করতে চায় তাতেই পিতা-মাতা অনুমতি দেন। সমাজ কীভাবে তাদের প্রত্যাশা করে তার কোনো ধারণ পিতা-মাতা দেন না। শিশু-কিশোররা পরবর্তী সময় হটকারী, অসংযত, আক্রমণাত্মক আচরণ করে ও অবিবেচক হয়। কারণ তারা শিখতেই পারে না তাদের আচরণের নেতিবাচক প্রভাব কী এবং কীভাবে নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। নিজেদের চাহিদার কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। এদের অনেকে অনেক সৃজনশীল হলেও ভালো কাজে লাগাতে পারে না।

ওভার প্রটেকটিভ : এ ধরনের পিতা-মাতা সন্তানকে পৃথিবীর সব রকম অনিষ্ট থেকে এতটাই দূরে রাখেন যে, শিশুরা বাস্তবতা বুঝতে শেখে না। পিতা-মাতা তাদের কোনো কষ্ট পেতে দেন না, সুনির্দিষ্ট বন্ধু ছাড়া অন্য বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে মিশতে দেন না, ব্যথা পাওয়ার ভয়ে খেলতে পাঠান না, দুর্ঘটনার ভয়ে সাইকেল চালাতে দেন না, প্রেমে পড়বে তাই ছেলেমেয়েকে বিয়ে বাড়িতে যেতে দেন না। তাদের সব কাজই বাবা-মা করে দেন। অনেকে এভাবে মানুষ করাকে ‘তোলা’ করে মানুষ করা বলেন। এক্ষেত্রে পরবর্তী জীবনে বাস্তবতা না বুঝে ক্ষতির মুখে পড়ার সম্ভাবনা থাকে, সামাজিকতা শিখতে পারে না, কষ্ট বা মানসিক চাপ মোকাবিলা করতে শিখে না, অল্পতেই কাতর হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। শিশু আত্মনির্ভরশীল হয় না ও একাকী কোনো কাজে আত্মবিশ^াস পায় না। আনইনভলভমেন্ট (সম্পূর্ণ ছেড়ে দেওয়া) পারমিসিভ ও ওভার প্রটেকটিভ স্টাইলের সম্পূর্ণ বিপরীত হলো আনইনভলভমেন্ট স্টাইল। এক্ষেত্রে বাবা-মা সন্তানের কোনো খোঁজ রাখেন না। সন্তানরা যা খুশি তাই করার সুযোগ পায়। সন্তান ভালো করলেও খোঁজ রাখেন না ও প্রশংসা করেন না। ক্ষতিকর কোনো কাজ করলেও বাবা-মা তা জানার চেষ্টা করেন না। আর্থিক সংগতি থাকলে বাবা-মায়ের একমাত্র দায়িত্ব হয় তাদের টাকাপয়সা যা লাগবে দেওয়া। কোনো ধরনের গাইড লাইন দেন না। কোন যতœও শিশু পায় না। শিশু হয়তো রাতে জ¦রে ভুগছে কেউ জানতেও পারেনি । কোনো ক্ষেত্রে জানলেও বাবা-মায়ের সুযোগ হয়নি যতœ নেওয়ার। শিশু তখন অনুভব করে তাকে কেউ ভালোবাসে না। সে একাকিত্বে ভোগে, দুশ্চিন্তা ও হীনম্মন্যতায় ভুগে, এমনকি বড় হয়েও তার সম্পর্কগুলোর মধ্যে সমস্যা সৃষ্টি হয়।

অথোরেটেটিভ : বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু লালনের সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হলো অথোরেটেটিভ। এই পদ্ধতিতে শিশুর জন্য পরিষ্কার ও সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন ও একটি সুনির্দিষ্ট সীমারেখা থাকে। শিশু এই সীমারেখার মধ্যে স্বাধীনতা ভোগ করে। আলোচনার মাধ্যমে নিয়মকানুনগুলো কখনো সামান্য শিথিলও করা হয়। শিশুরা বুঝতে পারে এই নিয়মগুলো ন্যায্য ও ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তন হয় না। তারা এটাও জানে, কোনো সমস্যা হলে বাবা-মায়ের সঙ্গে নির্ভয়ে আলোচনা করা যাবে এবং সব সমস্যারই ভালো সমাধান বের করা যাবে। বাবা-মা প্রথমেই বকা দেবেন না বা শুধু শুধু তাদের দোষারোপ করবেন না। এই পদ্ধতিতে বাবা-মা নিয়ম তৈরি করে দেন, কিন্তু তার বাস্তবায়নের দায়িত্বের অনেকাংশ সন্তানদের হাতে তুলে দেন। সন্তান কোনো ভুল করে ফেললে বাবা-মা তাকে উচ্চৈঃস্বরে তিরস্কার না করে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করেন ও ঠান্ডা মাথায় কথা বলেন। নিজের প্রত্যাশার কথা শান্ত অথচ দৃঢ়ভাবে জানিয়ে দেন এবং ভবিষ্যতে কীভাবে এই ভুল থেকে মুক্ত থাকা যায় আলোচনা করেন। ফলে শিশুরা আত্মবিশ্বাসী, আত্মমর্যাদাপূর্ণ ও ভালো আচরণ নিয়ে বেড়ে উঠে এবং তারা শিখে যায় কীভাবে আত্মনিয়ন্ত্রণ করতে হয়।  প্রতিটি বাবা-মা নিজস্ব জ্ঞান, পরিস্থিতি ও বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী শিশুকে লালন-পালন করেন। কোন বাবা-মা-ই পারফেক্ট নয়। তাই পারফেক্ট না হতে পারার যন্ত্রণাও পাওয়ার দরকার নেই। যেটা করতে হবে : নিজেকে মূল্যায়ন করে দেখুন আপনি কোন পদ্ধতিতে সন্তান লালন করছেন এবং কীভাবে করলে আপনার ও আপনার সন্তানের জন্য ভালো হবে।