‘হামার মাইয়া (মেয়ে) ক্লাস এইটে পড়ছিল। ট্যাকার অভাবে লেখাপড়া চালাইতে পারি নাই। কষ্ট করে ঢাকায় গিছিলো। চার বছর ধরে পোশাক কারখানায় চাকরি করছে। টাকা উপার্জন করছে। প্রতি মাসে হামাক টাকা দিত। সেই টাকা দিয়া হামি কোনোমতে সংসার চালাতাম। হামার মেয়ের বিয়েও হয় নাই। আশা ছিল, কিছুদিন পর মেয়েকে বিয়ে দেব। সব আশা মাটি হইয়া গেল...’। গতকাল শনিবার সকালে স্থানীয় ভাষায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবে কথাগুলো বলছিলেন টাঙ্গাইলে ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত গাইবান্ধার নিজপাড়া গ্রামের রিপা আক্তারের বাবা আবদুর রশিদ। এ সময় রিপার মা বিলকিস বেগম চেয়ারে বসে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন। আত্মীয়স্বজনরা পাশে দাঁড়িয়ে তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন।
গত শুক্রবার রাতে টাঙ্গাইলে ট্রেনে কাটা পড়ে গাইবান্ধার নিজপাড়া গ্রামের পাঁচজন নিহত হন। গতকাল শনিবার সকাল ৮টায় পাঁচটি মরদেহ নিজপাড়া গ্রামে পৌঁছালে শুরু হয় শোকের মাতম। নিহতদের বাড়িতে আত্মীয়স্বজনদের আহাজারি চলছিল।
গাইবান্ধা জেলা শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে সাদুল্লাপুর উপজেলার ধাপেরহাট ইউনিয়নের অন্তর্গত নিজপাড়া গ্রাম। গতকাল সকালে ওই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রাম জুড়ে চলছে শোকের মাতম। নিহতদের বাড়িতে কান্না ও আত্মীয়স্বজনদের আহাজারি চলছে। আশপাশের লোকজন নিহতদের স্বজনদের সান্ত্বনা দিচ্ছেন।
রিপার পারিবারিক সূত্র জানায়, চার বছর ধরে ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন তিনি। অষ্টম শ্রেণি পাস করে চাকরিতে যোগ দেন রিপা। তার বড় বোনের বিয়ে হয়েছে। বড় ভাই বিদ্যুৎ একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন।
রিপার মা বলেন, ‘মেয়েটা নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিমু। প্রতি মাসে নিজের জন্য কিছু টাকা জমা রাখত, আর কিছু টাকা আমাদের দিত। আমার স্বামী কৃষক মানুষ। অভাবের সংসার। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাতে পারি নাই। মেয়েটা কেবল উপার্জন শুরু করল, অথচ তাকে হারাইয়া ফেললাম।’
এদিকে একই গ্রামের রাজমিস্ত্রি হামিদুজ্জামান ছেলে ও স্ত্রীর জানাজায় অংশ নিতে প্রতিবেশীদের কাঁধে ভর করে যাচ্ছিলেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি নিজের ভাষায় বলছিলেন, ‘ঢাকাত যাওয়ার সময় হামার ব্যাটা বারবার কয়, আব্বা তোমার ঢাকায় যাওয়ার দরকার নাই। হামি আর মা একসাথে যাচ্ছি। চাকরি করা ট্যাকা দিমু, তুমি বাড়িত থাইকা সংসার দেখবা। সেই স্বপ্ন হামার কী হইলো রে। ব্যাটাই দিবে হামাক মাটি, আজকে হামাক দেওয়া নাকি ব্যাটাক মাটি।’
তিনি আরও বলেন, ‘হামার বউ ছেলে সবাই গেল। পাঁচ দিন আগে ব্যাটার বিয়া করাইছি। ব্যাটার শাশুড়িও মরি গেল। একসাথে সবাই মইলো। কালকের রাতে ওইখান (ঘটনাস্থল) থেকে মোবাইলে হামার এক বন্ধু কয়, তোর ব্যাটা আর বউ নাইরে।’
রাজমিস্ত্রি মো. হামিদুজ্জামান টাঙ্গাইলে ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত গাইবান্ধার নিজপাড়া গ্রামের নার্গিস বেগমের স্বামী। এ ঘটনায় তার স্ত্রী নার্গিস বেগম (৩৫), ১১ বছরের শিশু ছেলে নীরব মিয়া এবং বড় ছেলের শাশুড়ি দোলা বেগম (৩৫) মারা যান। এ সময় তার আত্মীয়স্বজনরা পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
হামিদুজ্জামানের পারিবারিক সূত্র জানায়, তিনি রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। স্ত্রী নার্গিস বেগম পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। এই দম্পতির বড় ছেলে নাঈম মিয়ার সঙ্গে গত পাঁচ দিন আগে বিয়ে হয় পোশাক শ্রমিক নিহত দোলা বেগমের মেয়ে জুঁই মনির। নতুন দম্পতিকে এলাকায় রেখে দুই বেয়ান নার্গিস বেগম ও দোলা বেগম পোশাক কারখানায় কাজে যোগ দিতে একসঙ্গে বাসযোগে ঢাকা রওনা হন। কিন্তু তাদের এই আনন্দযাত্রা পরিণত হয় বিষাদময় ঘটনায়।
ওই গ্রামের বাসিন্দা ধাপেরহাট ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আমিনুর রহমান মিলন বলেন, ‘এ ঘটনার পর ঈদ ও বিয়ের আনন্দময় গ্রামটিতে নেমে আসে শোকের ছায়া।’
নিজপাড়া গ্রামের আরেক নিহত সুলতান মিয়ার বাড়িতেও চলছিল আহাজারি। তার বাবা আজিজুর রহমান ও মা শাহানা বেগম পাশাপাশি বসে কান্নাকাটি করছিলেন। মা শাহানা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি ছেলেটাকে বলেছিলাম এলাকায় কাজ কর, চাকরি করতে মানা করেছিলাম। চাকরি করতে না গেলে আমার ছেলেটা আজ মরত না।’
ঘরের পাশের আঙিনায় মুখে কাপড় দিয়ে কান্নাকাটি করছিলেন নিহত সুলতানের স্ত্রী শামসুন্নাহার। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘হামার স্বামীটা কেমন করে মরল, তোমরা হামার স্বামীক আনি দাও।’
সুলতানের বাবা আজিজুর রহমান বলেন, ‘আমার ছেলেটা চাকরি করে প্রতি মাসে টাকা পাঠাত। সেই টাকায় আমাদের সংসার চলত। এখন কে টাকা পাঠাবে?’
নিহত সুলতানের তিন বছরের মেয়ে নাজিফা শুধু বাবাকে খুঁজছে, এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘সকালে লাশ বাড়িতে আনা হয়। জোহরের নামাজের পর জানাজা পড়ে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এর আগে এই গ্রামে একসঙ্গে এতগুলো মানুষের কবর দিতে হয় নাই।’
গত শুক্রবার রাত ৮টার দিকে ঢাকাগামী একটি যাত্রীবাহী বাস টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার ধলাটেংগর এলাকায় পৌঁছালে বাসটির তেল ফুরিয়ে যায়। বাসটি মহাসড়কের পাশে থেমে যায়। এ সময় বাসের কয়েকজন যাত্রী নিচে নেমে পাশের রেললাইনে বসেছিলেন। ঠিক তখনই উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকাগামী সিরাজগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেন তাদের ধাক্কা দেয়। এতে ট্রেনে কাটা পড়ে একই পরিবারের মা-ছেলেসহ পাঁচজন নিহত হন।
নিহতরা হলেন গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার ধাপেরহাট ইউনিয়নের নিজপাড়া গ্রামের রাজমিস্ত্রি মো. হামিদুজ্জামান ওরফে হাম্বুর স্ত্রী নার্গিস বেগম (৩৫), তার ছেলে নীরব মিয়া (১১), আজিজুর রহমানের ছেলে সুলতান মিয়া (৩০), আবদুর রশিদের মেয়ে রিপা খাতুন (২০) এবং পার্শ্ববর্তী ছত্রগাছা গ্রামের জাকির হোসেনের স্ত্রী ও হামিদুজ্জামানের ছেলের শাশুড়ি (বেয়ান) দোলা বেগম (৩৫)। নিহতদের মধ্যে শিশুটি বাদে সবাই পোশাক শ্রমিক ছিলেন।