বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাতিল করারর পর বাণিজ্য অংশীদারের বিরুদ্ধে অন্যায্য বাণিজ্যচর্চার অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে দেশটি। এ সময় বাণিজ্যের আড়ালে বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচার অভিযোগ তুলেছে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই)। সংস্থাটি বলছে, গত এক দশকে শুল্ক ফাঁকি এবং পণ্যের মূল্যে মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে গেছে। তবে জিএফআইয়ের এ দাবি প্রমাণ সাপেক্ষে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছে দেশের প্রধান রপ্তানি খাতে তৈরি পোশাক শিল্প সংশ্লিষ্টরা।

জিএফআই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১০ বছরে বাংলাদেশের পুঞ্জীভূত বাণিজ্য ‘ভ্যালু গ্যাপ’-এর পরিমাণ ৬ হাজার ৮৩০ কোটি ডলার।

জানা গেছে, জিএফআই গত ২৬ মার্চ প্রকাশিত তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদন দাবি করেছে গত এক দশকে শুল্ক ফাঁকি এবং পণ্যের মূল্যে মিথ্যা ঘোষণার (ট্রেড মিস-ইনভয়েসিং) মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশের বাজারে চলে গেছে।

জিএফআই বলেছে, বাংলাদেশের এ অবৈধ অর্থপ্রবাহের একটি বড় অংশই সম্পন্ন হচ্ছে উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের মাধ্যমে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির আড়ালে অর্থপাচারের ঘটনাগুলো বেশি ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে আমদানির ব্যয় বাড়িয়ে দেখিয়ে (ওভার-ইনভয়েসিং) এবং রপ্তানি আয় কমিয়ে প্রদর্শন করে (আন্ডার-ইনভয়েসিং) দেশ থেকে ডলার সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

সংস্থাটির তথ্যমতে, বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশই এ ধরনের অসামঞ্জস্যপূর্ণ লেনদেনের শিকার, যা সরাসরি দেশের কর রাজস্ব এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাণিজ্য মূল্যের এই বিশাল ব্যবধানের দিক থেকে এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষ ১০টি দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশের এই অবৈধ অর্থপ্রবাহের একটি বড় অংশ উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যের সময় ঘটেছে। মোট ঘাটতির মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলার বা ৩৩ বিলিয়ন ডলারের কারসাজি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে লেনদেনের ক্ষেত্রে।

প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের এই ঝুঁকি কেবল আঞ্চলিক বাণিজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী খাত এবং আমদানিনির্ভর শিল্পগুলোতে এই ধরনের অর্থ পাচারের প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের এই ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হলেও ভারতের তুলনায় তা অনেক কম। একই সময়ে ভারত থেকে বাণিজ্যের আড়ালে রেকর্ড ১ লাখ ৬ হাজার কোটি (১.০৬ ট্রিলিয়ন) ডলার পাচার হয়েছে। অন্যদিকে, শ্রীলঙ্কায় উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি লক্ষ করা গেছে। তবে শ্রীলঙ্কার ভঙ্গুর অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতে এই পাচারের প্রভাব দেশটিতে অনেক বেশি ভয়াবহ।

পুরো এশিয়া অঞ্চলের চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেবল ২০২২ সালেই এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে বাণিজ্যের আড়ালে পাচার হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৬৯ হাজার কোটি ডলার। চীন, থাইল্যান্ড ও ভারতের মতো বড় অর্থনীতিগুলো এই তালিকায় শীর্ষে থাকলেও ছোট-বড় সব দেশেই এই সমস্যা প্রকট আকারে বিদ্যমান।

গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এশীয় অর্থনীতিগুলোতে এ ধরনের অনৈতিক চর্চা গভীরভাবে গেড়ে বসেছে। গত এক দশকে এই প্রবণতা হ্রাসের কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায়নি বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।

বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচারের বিষয়ে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, যে সংস্থাটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তারা বলতে পারবে কোন রপ্তানিকারকরা অর্থ পাচারে জড়িত। তাদের প্রতিবেদনে তৈরি পোশাক খাতের বিষয় এসেছে বলে শুনেছি। ফলে কোনো অভিযোগ এলেই সেটি সঠিক বলা যায় না। কেউ যদি এমন কাজে জড়িত থাকে- যেমন কোনো কারখানা, কোনো মালিক বা কারা জড়িত তা সুনির্দিষ্টভাবে বলতে হবে। শুধু গবেষণার জন্য, কিছু তথ্য উপস্থাপন করার খাতিরে প্রতিবেদন তৈরি হলে সেটি গ্রহণযোগ্য হবে না। আমাদের কোনো সদস্য বা কারখানা জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে সুনিদিষ্ট তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমরা সহায়তা করব।