নিজের ঢঙে কথা বলে আলোচনায় তাইজুল

হাতে লম্বা বুম, টেলিভিশন সাংবাদিকের মতো ভঙ্গি আর গ্রামের সহজ-সরল ভাষায় এলাকার নানা সমস্যা তুলে ধরে ‘লাইভ’ আদলে ভিডিও বানিয়ে রাতারাতি ভাইরাল হয়েছেন কুড়িগ্রামের তাইজুল ইসলাম তাজু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি এখন ‘তাজু ভাই ২.০’ নামে পরিচিত। কিন্তু ভাইরাল হওয়ার পরও বদলায়নি তার জীবনের কঠিন বাস্তবতা অভাব-অনটন এখনো পিছু ছাড়েনি, ফেসবুক পেজ থেকে কোনো আয় নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত উত্তর ঢাকডহর সরকারপাড়া (সরকারপাড়া চর) গ্রামের বাসিন্দা ৩০ বছর বয়সী মো. তাইজুল ইসলাম তাজু। পেশায় তিনি রাজমিস্ত্রির সহকারী (হেলপার)। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে সংসার চালাতেন। গত ঈদের সময় বাড়িতে এসে স্থানীয় নারায়ণপুর বাজারে ২৬ মার্চ (মহান স্বাধীনতা দিবস) উপলক্ষে একটি জিলাপির দোকানে দাঁড়িয়ে ‘সরকারি রেটে’ জিলাপি কত করে বিক্রি হচ্ছে এমন সরল প্রশ্ন করে ভিডিও ধারণ করেন। সেই ভিডিওটি গ্রাম্য ভাষায় সহজ উপস্থাপনায় ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে রেকর্ড ৫০-৫৯ লাখ ভিউ ছাড়িয়ে যায়। এরপর থেকে তিনি নিয়মিত এলাকার নদীভাঙন, রাস্তাঘাটের বেহাল দশা, চরাঞ্চলের উন্নয়ন বঞ্চনাসহ নানা সমস্যা নিয়ে ভিডিও বানিয়ে যাচ্ছেন। তার আবেগঘন, সরল বক্তব্য মানুষের মনে দাগ কাটছে।

কিন্তু তাজুর নিজের জীবন এখনো অপরিবর্তিত। অভাবের সংসারে দাম্পত্য জীবনও টেকেনি। অসুস্থ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী বাবা-মা সিরাজুল ইসলাম ও তাহেরা দম্পতির ছয় সন্তানের মধ্যে সবার বড় তিনি। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে দুই ভাই-বোনের লেখাপড়ার খরচসহ আট সদস্যের সংসার চালান। নদীভাঙনের কবলে পড়ে ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যের জমিতে বসবাস করছেন তারা। অভাবের তাড়নায় তিনি কখনো স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পাননি পড়াশোনা শেখা হয়নি। মাত্র ৮ হাজার টাকার একটি মোবাইল ফোন আর ধার করা বুম দিয়েই ভিডিও বানিয়ে নিজের জীবনসংগ্রামের কথাও তুলে ধরেন।

স্থানীয় সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘তাজু আমাদের এলাকার গর্ব। তার সরলতা আর প্রতিভাকে সম্মান করা উচিত। কেউ যেন তাকে নিয়ে ট্রল না করে, বরং সবাই তার পাশে দাঁড়ালে সে উপকৃত হবে। খুব সহজ ভাষায় আমাদের এলাকার কথা বলে, তাই মানুষ পছন্দ করে, ভাইরালও হয়েছে।’

তাইজুল ইসলাম তাজু বলেন, ‘মানুষ ভালোবাসা দিছে, ভিডিও ভাইরাল হইছে। কিন্তু আমার তো এখনো কষ্টই কমে নাই। পেইজে আয় নাই, সংসার চালানো কষ্ট হয়। চিন্তা করছি, আবারও ঢাকা গিয়ে কাজ করব। কাজ না করলে তো আর ভাত জুটবে না পরিবারে। আমি সাংবাদিক না। পরিবারের দুঃখ-কষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি। এলাকার খবর বাইরে তুলে ধরতে চাই, কারণ জেলা শহরের সাংবাদিকরা এখানে আসেন না। আমি বোকাসোকা মানুষ, ভুল হতেই পারে। ট্রল করলেও কষ্ট নাই, শুধু চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক।’

নারায়ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য কবিরুল ইসলাম বলেন, ‘নদীভাঙনের কবলে পড়ে ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যের জায়গায় বসবাস করছে তাজুর পরিবার। এমন পরিস্থিতিতে তার এই অর্জনকে সম্মান জানিয়ে তার পাশে দাঁড়ানো উচিত। তাজু কাজের পাশাপাশি বিনোদনমূলক ভিডিও করে এলাকার উন্নয়ন বঞ্চনার কথা তুলে ধরছে এটা আমাদের জন্য গর্বের।’

ভাইরাল হওয়ার আগে তার ফেসবুক পেজ ‘তাজু ভাই ২.০’-এ ফলোয়ার ছিল মাত্র ৬ হাজারের মতো। এখন সেই সংখ্যা লাখ ছাড়িয়েছে (সোমবার রাতে ১ লাখ ৭ হাজারেরও বেশি)। তবু মনিটাইজেশন বা আয়ের কোনো ব্যবস্থা হয়নি। চারদিকে নদবেষ্টিত দুর্গম চরাঞ্চলের এই তরুণ জীবনের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও নিজের প্রচেষ্টায় সামাজিক মাধ্যমে জায়গা করে নিয়েছেন। মানুষের ভালোবাসাকেই এখন তার একমাত্র শক্তি মনে করছেন তিনি।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসীর দাবি তাজুর মতো প্রতিভাবান যুবকের পাশে দাঁড়িয়ে তাকে সহায়তা করা উচিত।