নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যে নাকাল মানুষ

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ০৫:১৬ এএম

সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতি কমলেও নিত্যপণ্যের দাম এখনো উচ্চ পর্যায়ে থাকায় বাজারে স্বস্তি ফিরছে না। বরং আয় বাড়ার তুলনায় পণ্যের দাম বেশি বাড়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমে এলেও গড় মজুরি বেড়েছে ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। ফলে টানা ৫৩ মাস ধরে মজুরিবৃদ্ধির হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি রয়েছে। একই সঙ্গে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার গড় মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। তবে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসের গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৯২ শতাংশে, যা সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার আসার পরই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংকটের প্রভাব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। প্রভাব পড়ে দেশের জ্বালানি খাতেও। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়ানো হয় জ্বালানি তেলের দাম। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংকট কিছুটা কমে আসার পর জুন-জুলাইয়ে চট্টগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় সরকার। সবশেষ চলতি মাসে মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) আগুন লাগার ঘটনায় দেশজুড়ে লোডশেডিং দেখা দেয়। জ্বালানিসংকটের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়ছে নিত্যপণ্যের দামেও।

চড়া দামের মধ্যেও মূল্যস্ফীতি কমার বিষয়টি নিয়ে গত ১২ আগস্ট এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘চাল ও মাংসের দাম কমার কারণেই জুলাইতে মূল্যস্ফীতি আট মাসের মধ্যে সবচেয়ে কম হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতির যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, এর মধ্যে আমি দুইটা জিনিস পরীক্ষা করে দেখেছি। চালের দাম কমেছে। মাংসের দাম কমেছে। আমরা পুনর্বার যাচাই করেছি। নতুন মূল্যস্ফীতির যে তথ্যটা দেওয়া হয়েছে, সঠিকভাবেই দেওয়া হয়েছে।’

৬ মাসে মূল্যস্ফীতিতে লাগাম পরানোর চেষ্টা সরকারের: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, সরকারের প্রথম মাস ফেব্রুয়ারিতে আগের মাসের তুলনায় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। ওই মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল আগের ১০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। ফেব্রুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ০১ শতাংশ। একই সময়ে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ দ্বিতীয় মাস মার্চে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে দাঁড়ায়। ওই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ। একই সময়ে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৯ শতাংশ।

সরকারের তৃতীয় মাস এপ্রিলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর মূল্যস্ফীতি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়। ওই মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে দাঁড়ায়। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও বেড়ে হয় ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ। অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশে পৌঁছায়। একই সময়ে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ।

চতুর্থ মাস মে-তে আবারও মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে দাঁড়ায়, যা আগের ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। ওই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ০৬ শতাংশে এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৭১ শতাংশে পৌঁছায়। এর বিপরীতে, এ সময়ে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২১ শতাংশ।

পঞ্চম মাসে মূল্যস্ফীতি আবারও কমতে শুরু করে। জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে দাঁড়ায়। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও শূন্য দশমিক ৪৬ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে ৮ দশমিক ৬০ শতাংশে নেমে আসে। একইভাবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতিও কমে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৬১ শতাংশে। এ সময়ে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। জুনে ১২ মাসের চলমান গড় মূল্যস্ফীতিও কমেছে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ১২ মাসে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এর আগের বছরের একই সময়ে, অর্থাৎ ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত এ হার ছিল ১০ দশমিক ০৩ শতাংশ।

ষষ্ঠ মাসে মূল্যস্ফীতি আরও কমে আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামে। জুলাইয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে দাঁড়ায়। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতিও কমে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে দাঁড়ায়, যা নয় মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতিও কমে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ২৮ শতাংশে দাঁড়ায়। এ সময়ে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২২ শতাংশ।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাজার ঘুরে দেখা গেছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা জানান, আগে প্রতি কেজি চিনি ১০০ টাকা দরে পাইকারি কিনে ১২০ টাকায় বিক্রি করলেও এখন সেই চিনি পাইকারিতেই ১২০ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে। ডিমও ১৩০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সিদ্ধ চালের দাম ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে। অন্যদিকে পোলাওয়ের চালের দাম আগে ১৭৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৯৫ টাকা হলেও বর্তমানে তা আবার ২৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া গায়ে দেওয়ার সাবান, ডিটারজেন্ট পাউডারসহ প্রায় সব জিনিসের দাম বেড়েছে।

সবজির বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ সবজিই কেজিপ্রতি ৬০ টাকার নিচে পাওয়া কঠিন। শীতের মৌসুমে শিম ২০ থেকে ৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও এখন তা বেড়ে ১৪০ টাকা হয়েছে। একইভাবে বেগুনের দাম বেড়ে ১৫০ টাকা। তবে আলুর দামে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি। বর্তমানে কেজি প্রতি ২০ টাকা থেকে বেড়ে ৩০ টাকা হয়েছে।

রাজধানীর সবুজবাগ এলাকার মুদি দোকানি শাহ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই কয়েক দিনে হঠাৎ করেই বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। আগে কোনো পণ্যের দাম ৫ থেকে ১০ টাকা বাড়ত, এখন প্রায় সব পণ্যের দামই ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আমরা খুচরা ব্যবসায়ী। পণ্যের দাম হঠাৎ এভাবে বেড়ে গেলে ক্রেতারা আমাদের ওপরই ক্ষুব্ধ হন।’

বনশ্রী এলাকার বেসরকারি চাকরিজীবী সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দামই বেড়েছে। শাকসবজি থেকে শুরু করে সাবান, শ্যাম্পু, চাল, চিনি সবকিছুর দাম বেড়েছে। এভাবে দাম বাড়তে থাকলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কী হবে? বাজারে পণ্যের দাম বাড়লেও আমাদের বেতন তো বাড়েনি।’

বিষয়টি নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নেমেছে। তবে মূল্যস্তর এখনো অনেক উঁচুতে রয়েছে। মূল্যস্ফীতির হার কমার অর্থ এই নয় যে, পণ্যের দাম কমেছে। বরং উচ্চ মূল্যস্তরের ওপর নতুন করে মূল্যস্ফীতির হার যোগ হচ্ছে, সেটি এখনো আগের তুলনায় বেশি। ফলে মূল্যস্তর উঁচুতেই থাকবে। এর ফলে মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার এখনো বেশি। তাই মানুষের জীবনমানের যে অবনমন হয়েছে, তা অব্যাহত আছে। জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও এতে সাধারণ মানুষের খুব একটা স্বস্তি আসছে না। বিনিয়োগ চাঙ্গা হলে, সরবরাহ আরও বাড়লে এবং বাজার ব্যবস্থাপনাকে আরও উন্নত করতে পারলে কিছুটা স্বস্তি আসবে।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ছয় মাসে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে বা বেড়েছে এটা জীবনযাত্রায় খুব বড় প্রভাব ফেলেনি। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন ও বিদ্যুতের খরচ বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে দ্রব্যমূল্যের ওপর।’

সর্বশেষ জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতি কমার বিষয়ে ক্যাব সভাপতি বলেন, ‘দেশের পরিসংখ্যানের ওপর মানুষের আস্থা নেই। উৎপাদন, ভোগ বা অন্যান্য বিষয়ে যে পরিসংখ্যান দেওয়া হয়, তার সঙ্গে বাস্তবতার অনেক সময় মিল পাওয়া যায় না। ফলে মূল্যস্ফীতি কমছে বলা হলেও বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।’

বিবিএসের ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং উইংয়ের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. সাহাবুদ্দীন সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, দ্রব্যমূল্য বেড়েছে, এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আমাদের দেওয়া তথ্যের মধ্যেও বিষয়টি রয়েছে। জুলাই মাসে আগের মাসের তুলনায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি ২ দশমিক ৫৭ শতাংশ বেড়েছে, যা অনেক বেশি। তবে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হিসাব করা হয় পয়েন্ট টু পয়েন্ট পদ্ধতিতে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানের তথ্য তুলনা করা হয়। যেমন, জুলাই মাসের মূল্যস্ফীতি হিসাবের ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের জুলাইয়ের সঙ্গে ২০২৫ সালের জুলাইয়ের তুলনা করা হয়েছে। সে হিসেবে মূলস্ফীতি কমেছে। এখানে ভুল বা অসত্য তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত