ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) বিভাগীয় চেয়ারম্যানের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পালন করাকেই নিয়মিত চেয়ারম্যানের মেয়াদের অংশ হিসেবে গণনা করা হচ্ছে। ফলে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর কেউ নিয়মিত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেলেও বাস্তবে তিনি পূর্ণ দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাচ্ছেন না। সম্প্রতি পাঁচ অধ্যাপক কাগজে-কলমে তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা তিন বছর দায়িত্ব পালনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। চলতি বছরের বিভিন্ন সময়ে পাঁচ অধ্যাপককে বিভাগের নিয়মিত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও তাদের মেয়াদ কার্যকর দেখানো হয়েছে ২০২৪ সালের বিভিন্ন তারিখ থেকে। অর্থাৎ যে সময় তারা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক জানিয়েছেন, ভারপ্রাপ্ত ও নিয়মিত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব এক নয়। বিভাগীয় সংকট কিংবা চেয়ারম্যান পদ শূন্য থাকলে প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখতে সাময়িকভাবে কাউকে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে নিয়মিত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলে নতুন করে পূর্ণ মেয়াদ শুরু হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু ঢাবির বর্তমান সিদ্ধান্তে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বের সময়ও নিয়মিত চেয়ারম্যানের তিন বছরের মেয়াদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
জানা গেছে, ২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ঢাবির পাঁচ বিভাগীয় চেয়ারম্যান পদে শূন্যতা তৈরি হয়। প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখতে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ড. ফাতেমা রেজিনা ইকবাল, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগে ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী, নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ড. অনিমেষ পাল, সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগে ড. আবু হেনা মো. ইউসুফ এবং মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগে ড. মোহাম্মদ মামুন চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
চলতি বছরের ১৭ মে ইস্যু করা চিঠিতে মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মামুন চৌধুরীকে ২৪ অক্টোবর ২০২৪ থেকে তিন বছরের জন্য নিয়মিত চেয়ারম্যান করা হয়। ১৫ জুলাইয়ের চিঠিতে সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের ড. আবু হেনা মোহাম্মদ ইউসুফকে ২৮ ডিসেম্বর ২০২৪ থেকে, ১৬ জুলাইয়ের চিঠিতে নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. অনিমেষ পালকে ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে এবং ৪ আগস্টের চিঠিতে শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকীকে ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে তিন বছরের জন্য নিয়মিত চেয়ারম্যান করা হয়। অর্থাৎ, নিয়মিত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগের তারিখের বদলে তাদের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব গ্রহণের সময় থেকেই তিন বছরের মেয়াদ গণনা করা হয়েছে। এতে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বের সময়কালও নিয়মিত চেয়ারম্যানশিপের মেয়াদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্যাটিউট ৩৬ (১)-এ চেয়ারম্যানকে তিন বছরের জন্য নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। তবে জানা গেছে, নিয়োগপত্রে ৪৩ (১) ধারার কথা উল্লেখ করা হলেও তা মানা হচ্ছে না। সেখানে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বকেও পূর্ণ দায়িত্বের সঙ্গে একীভূত করা হচ্ছে।
বিষয়টির আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মমতাজ মৌ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত বা রুটিন দায়িত্ব থেকে নিয়মিত পদে উন্নীত করার সময় ভারপ্রাপ্তকাল মূল নিয়োগের মেয়াদ বা টেনিওর হিসেবে সাধারণত গণনা করা যাবে না। কোনো শিক্ষককে নিয়মিত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর তিনি যেদিন ওই পদে যোগদান করবেন, তখন থেকেই মূল পদের মেয়াদ গণনা শুরু হয়।
ঢাবির অতীতের ঘটনাতেও অস্থায়ী বা ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বের সঙ্গে পূর্ণকালীন দায়িত্বের মেয়াদ এক করার নজির পাওয়া যায় না। ২০০৯ সালের ১৫ জানুয়ারি অস্থায়ী উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। পরে ২০১৩ সালের ২৫ আগস্ট তিনি পূর্ণকালীন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান। এ ছাড়া ২০১৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৯ সালের ৩ নভেম্বর পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য ছিলেন ড. মো. আখতারুজ্জামান। পরে তিনি চার বছরের জন্য পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব পান।
বঞ্চনার অভিযোগ তুলে সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবু হেনা মো. ইউসুফ বলেন, আমাকে শুরুতে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। আমি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হতে চাইনি, এমনকি চেয়ারম্যানও হতে চাইনি। তবুও আমি প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে সম্মান করে দায়িত্ব গ্রহণ করি। এখন প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সেটিই নাকি আমার নিয়মিত বা মূল দায়িত্ব। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, এটা কি মানবিক?
মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ মামুন চৌধুরী বলেন, ১৯৭৩ সালের আদেশ দ্বারা পরিচালিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভারপ্রাপ্ত উপাচার্যের পর পূর্ণাঙ্গ নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ থেকে নতুন মেয়াদ গণনা করা হয়েছে। এটিই প্রচলিত ও সাংবিধানিকভাবে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি। চেয়ারম্যানের বিষয়েও একই বিষয় প্রযোজ্য।
তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আমাকে পরপর দুইবার চেয়ারম্যানশিপ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। এরপর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে একটি বিধ্বস্ত বিভাগে দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রায় দুই বছরে বিভাগটিকে কার্যকর অবস্থায় নিয়ে এসেছি। এখন বলা হচ্ছে আমার পূর্ণাঙ্গ নিয়োগ থেকে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বকাল বাদ যাবে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) মুনসী শামস উদ্দিন আহম্মদ বলেন, এখানে নিয়মের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। যেদিন থেকে তাদের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, সেদিনকেই তাদের পূর্ণকালীন দায়িত্বের শুরু বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাইলে এমনটা করতে পারেন।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার পর ইতিমধ্যে অনেকের দুই বছর পার হয়ে গেছে। এখন যদি সেই দুই বছরকে বাদ দিয়ে আবার পুরো তিন বছরের নিয়োগ দেওয়া হয়, তাহলে একই ব্যক্তি মোট পাঁচ বছর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন। একজনকে মোট পাঁচ বছর দায়িত্ব দিয়ে কি ন্যায়বিচার হচ্ছে? একজন মানুষের মধ্যে ক্ষমতা ধরে রাখার এত আগ্রহ কেন জন্মায়?