রাজধানীর ফুটপাত দখলমুক্ত করে নগরীর সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে অভিযানে মাঠে নেমেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। গতকাল বুধবার সকাল থেকে চালানো অভিযানে ১ লাখ ৯২ হাজার টাকা জরিমানা ও ২৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সড়ক ও ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠা দোকানপাট ও অতিরিক্ত বর্ধিতাংশ অপসারণ করা হচ্ছে এই অভিযানে। টানা পাঁচ দিনব্যাপী এই বিশেষ অভিযান চলবে আগামী রবিবার পর্যন্ত।
উচ্ছেদ অভিযানে অংশ নেওয়া পুলিশ কর্তৃপক্ষ বলছে, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে এ ধরনের অভিযান নিয়মিত চালবে। ফুটপাত উন্মুক্ত হবে জনগণের চলাচলের জন্য। তবে উচ্ছেদ হওয়া ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বলছেন, জীবিকার তাগিদেই তারা ফুটপাতে বসেছিলেন। তারা সরকারের কাছে বিকল্প পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন।
ডিএমপির পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানা যায়, বুধবার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে ১ লাখ ৯২ হাজার টাকা জরিমানা ও ২৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। দিনব্যাপী পরিচালিত এসব অভিযানে ফুটপাত ও সড়কের অবৈধ দখল উচ্ছেদ, জরিমানা আদায়, মালামাল জব্দ এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
অভিযানের কবলে পড়া ভাষানটেক এলাকার তরমুজ ব্যবসায়ী মো. শিপন বলেন, ‘আমাকে ৩ হাজার টাকা জরিমানা করেছে। গরিব মানুষ ব্যবসা করে খাই। পেট তো চালাতে হবে। ধনীরা ঠিকই আছে, শুধু আমাদের বেলায় অসুবিধা। সরকার আমাদের একটা জায়গা খুঁজে দিক, আমরা সেখানে ব্যবসা করব। না হলে আমরা কই যাব? আমাদের এই ব্যবসা করে বাচ্চা-পোলাপানদের লেখাপড়া করাতে হয়। মা-বাবাদের চিকিৎসা খরচ চালাতে হয়। আমরা তো চুরি-ছিনতাই করে খাচ্ছি না। আগের সরকার যেমন ছিল, এখন তেমনই আছে।’
ডিএমপির অভিযানকে স্বাগত জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘‘হকারদের মানবিক দিক বিবেচনা করে এবং সরকারের আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে উন্নত দেশের মতো ‘নাইট মার্কেট’ এবং শুক্র-শনিবার ছুটির দিনে ‘হলিডে মার্কেট’ চালু করলে ভালো হবে। না হলে এই ফুটপাতের দোকান কর্মচারীরাই একসময় চুরি-ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়বে।’’
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. আনিছুর রহমান বলেন, দোকানের সীমানা পেরিয়ে ফুটপাত বা মূল সড়কে রেস্টুরেন্টের কিচেন, গ্রিল-কাবাবের মেশিন, আসবাবপত্র কিংবা ওয়ার্কশপের টায়ার ও যন্ত্রপাতি রেখে জনপথ আগলে রেখেছেন তাদের বিরুদ্ধে অভিযান। যেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তাদের বৈধ জায়গার বাইরে অতিরিক্ত জায়গা দখল করে জনগণ চলাচলে বিঘœ ঘটাচ্ছে, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
নয়াপল্টনে আড়াই ঘণ্টায় ১৩টি মামলা, ৩৫ হাজার জরিমানা : বুধবার সকালে রাজধানীর নাইটিংগেল (নয়াপল্টন) মোড় থেকে ফকিরাপুল এলাকায় ফুটপাত দখলমুক্তর অভিযানে ১৩টি মামলায় ৩৫ হাজার ৩০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ সময় স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (ডিএমপি) মহিদুর রহমান জানান, প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ ফুট চওড়া রাস্তার ৩০ ফুট অংশই অবৈধ দখলে ছিল। সেই ৩০ ফুট জায়গা দখলমুক্ত করা হয়েছে। সড়ক ও ফুটপাতে অবৈধ দখলমুক্ত করতে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, অবৈধভাবে ফুটপাত দখলের অপরাধে সর্বনি¤œ ১০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকাসহ মোট ১৩টি মামলায় ৩৫ হাজার ৩০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। যাদের সতর্ক করার প্রয়োজন, তাদের সতর্ক করা হয়েছে।
মগবাজার-বাংলামোটরে ৪৯ গাড়ির বিরুদ্ধে ভিডিও মামলা : ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করতে ডিএমপি মগবাজার থেকে বাংলামোটর পর্যন্ত সড়কে অভিযান চালিয়ে ৪৯ গাড়ির বিরুদ্ধে ভিডিও মামলা এবং ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া ফুটপাতে অবৈধ দোকান ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. ইমরান আহমেদ বলেন, এই অভিযানগুলো আমাদের চলমান থাকবে। ৫ তারিখের পর অবস্থার উন্নতি না হলে, নতুন করে শিডিউল দিয়ে গোপনে অভিযান চালানো হবে।
মগবাজারে সরেজমিনে দেখা যায়, উচ্ছেদ অভিযানে ফুটপাতের দোকানগুলোর টিন, কাপড় ও কাঠের বেড়া ভেঙে ফেলতে দেখা গেছে। আবার অনেকের দোকান বন্ধ থাকায় তার মালামাল সরিয়ে ফেলতে বলা হয়। তবে যার যে মালামাল রয়েছে তা নিয়ে যেতে দেখা যায়। অনেকে দোকানের ভেঙে ফেলা অংশ কুড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। মগবাজারের মোড়ের অভিযান দেখে বাংলামোটরের এই পাশের দোকানগুলো বন্ধ করে মালামাল সরিয়ে ফেলতে দেখা যায়।
নিয়ম না মানলে আরও কঠোর উচ্ছেদ অভিযানের হুঁশিয়ারি : ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের ডিসি রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক অভিযানে দখলকারীদের সতর্ক ও দোকানের সামনের অতিরিক্ত অংশ ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। দোকানের সামনে যদি অতিরিক্ত দোকান তৈরি করে মানুষের চলাচলে ভোগান্তি ও যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে আমরা তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযানে নামব।
তিনি আরও বলেন, আমরা এর আগেও গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে তাদের সচেতন করার চেষ্টা করেছি, তাদের নোটিশ দিয়েছি। আজকে আমরা খুব সফটলি অভিযানটি পরিচালনা করছি। যারা ইচ্ছাকৃতভাবে আইন অমান্য করে আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে তাদের আমাদের স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আইন অনুযায়ী জরিমানা ও মালামাল জব্দ করার বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
গুলশানে ৫০ দোকানকে জরিমানা : গুলশান ট্রাফিক বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মিজানুর রহমান জানান, গুলশান এলাকায় ফুটপাত উচ্ছেদ অভিযানে প্রায় ৫০টি দোকানকে সতর্ক করা হয়। একই সঙ্গে বিধি লঙ্ঘনের অপরাধে মোট ২৭ হাজার টাকা অর্থদণ্ড আদায় করা হয়েছে। জনস্বার্থে এ ধরনের অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতেও নিয়মিতভাবে এ ধরনের অভিযান পরিচালনা অব্যাহত থাকবে।
মিরপুরে ৬৫ হাজার টাকা জরিমানা : ডিএমপির স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. বেলাল হোসাইন জানান, পল্লবী জোনে কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া ও ভাষানটেক এলাকায় পরিচালিত অভিযানে ৬ জন ব্যবসায়ীকে ৬৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং রাস্তা দখলমুক্ত করা হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, অভিযানের সংবাদ পেয়ে দোকানিরা তড়িঘড়ি করে মালামাল সরাতে শুরু করে। অনেকে তাদের দোকান বন্ধ করে দেয়। এ সময় ফুটপাতে দোকানের মালামাল রাখায় বেশ কয়েকজন দোকান মালিককে জরিমানা করা হয়। অভিযানকালে ব্যবসায়ীদের দ্রুত মালামাল সরানোর নির্দেশ দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। তবে অনেকে দোকান রেখে পালিয়ে যান। তখন বেশ কিছু দোকানের মালামালও জব্দ করে পুলিশ।
ধোলাইখালে ১৩ জন আটক : পুরান ঢাকার ধোলাইখাল এলাকায় সড়ক দখলমুক্ত করতে দিনভর অভিযানে ১৩ জনকে আটক করেছে ডিএমপি। একই সঙ্গে সড়কে অবৈধভাবে রাখা বিপুল পরিমাণ মালামাল জব্দ করে পুলিশের দুটি ট্রাকে করে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অভিযানস্থলে উপস্থিত ডিএমপির এডিশনাল কমিশনার আনিসুর রহমান বলেন, আমরা ব্যবসাবান্ধব। আমরা চাই না কাউকে জেল-জরিমানায় ফেলতে। তবে ব্যবসা করতে এসে সাধারণ মানুষের সুযোগ-সুবিধা নষ্ট করা যাবে না।