মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার মধ্যে বাংলাদেশ তুলনামূলক কম দামে ডিজেল আমদানির একটি প্রস্তাব পেয়েছে কাজাখস্তান থেকে। এদিকে রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিশেষ ছাড়ের অনুরোধ ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ফিলিং স্টেশনগুলোয় জ্বালানি তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন কমেনি। সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ চললেও বাস্তবে সংকটের চাপ এখনো রয়ে গেছে।
গতকাল বুধবার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব (অপারেশন অনুবিভাগ) মনির হোসেন চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘জ্বালানি তেল নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব পাচ্ছি। কাজাখস্তান থেকে ৭৬ ডলারে প্রতি ব্যারেল ডিজেলের প্রস্তাব পেয়েছি। সস্তায় পেলে কিনতে অসুবিধা নেই। তবে প্রস্তাব পেলেই হবে না, প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করে সরবরাহ নিশ্চিতের বিষয় আছে। প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন সরবরাহ করতে পারবে বলে জানিয়েছে দেশটি।’
রাশিয়া থেকে তেল আমদানি : এদিকে রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করতে বাংলাদেশের বিশেষ ছাড়ের অনুরোধ যুক্তরাষ্ট্র ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে। ওয়াশিংটনে এক বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট এ আশ্বাস দেন বলে গতকাল এক বিবৃতিতে জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।
বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ায় বাংলাদেশের সংকট নিয়ে আলোচনা করেন। এ সময় তিনি রাশিয়া থেকে সরাসরি পরিশোধিত ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানিপণ্য আমদানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিশেষ ছাড় পাওয়ার অনুরোধ জানান।
এর আগেও বাংলাদেশ একই অনুরোধ জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে চিঠি দিয়েছিল। বৈঠকে ড. খলিলুর রহমান বলেন, কৃষকরা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং খাদ্য নিরাপত্তা যেন বিঘ্নিত না হয়, সেজন্য এ ছাড় প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘এর আগে রাশিয়ার তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী যে ছাড় দিয়েছিল, তার সুফল বাংলাদেশ নিতে পারেনি।’ এ ছাড়া জরুরি চাহিদা মেটাতে তৃতীয় কোনো দেশ থেকে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের বিনিময়ে পরিশোধিত তেল কেনার বিষয়েও দুজন আলোচনা করেন। মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে নিয়ে এ কঠিন সময়ে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মার্কিন সরকারের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
তিনি আশ্বাস দেন, তার দপ্তর এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে মার্কিন সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে কাজ করবে। মার্কিন মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান এবং আগামী দিনগুলোতে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
জ্বালানি তেলের লাইন এখনো দীর্ঘ : রাজধানীতে জ্বালানি তেলের জন্য প্রতীক্ষার দীর্ঘ লাইন এখনও কমেনি। নগরের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে সকাল থেকেই মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি ও গণপরিবহনের সারি চোখে পড়ছে। । সাম্প্রতিক সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশ্বাস মিললেও বাস্তবে সংকটের চাপ পুরোপুরি কাটেনি এমনই চিত্র রাজধানীজুড়ে।
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন দেখা গেছে, সীমিত পরিমাণে তেল সরবরাহের কারণে পাম্পগুলো নির্দিষ্ট সময় পরপর বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এতে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা যানবাহনের চাপ আরও বাড়ছে। অনেক চালক ভোর ৫টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও দুপুর পর্যন্ত তেল পাননি বলে অভিযোগ করেছেন। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকদের ভোগান্তি বেশি, কারণ স্বল্প পরিমাণ তেল নিয়েই তাদের বারবার লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। পরিবহন চালকরাও বলছেন, তেলের অভাবে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী যানবাহন চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
রাজধানীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশে ফিলিং স্টেশনগুলোয় যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। দীর্ঘ লাইনের কারণে মূল সড়কে যানবাহনের গতি কমে যাচ্ছে, যা নগরবাসীর দৈনন্দিন চলাচলে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। অনেক ক্ষেত্রে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে দেশের বিভিন্ন জেলায় জ্বালানি সংকটকে কেন্দ্র করে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাও ঘটছে। ফরিদপুরের ভাঙ্গায় কালোবাজারিদের ড্রামে তেল না দেওয়ায় একটি ফিলিং স্টেশনে হামলা ও মারধরের ঘটনা ঘটেছে। এতে স্টেশন মালিকসহ তিনজন আহত হয়েছেন। ঘটনার পর বুধবার সকাল থেকে সংশ্লিষ্ট মালিকের দুটি ফিলিং স্টেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে ঢাকা-খুলনা ও ফরিদপুর-বরিশাল মহাসড়কে চলাচলকারী যানবাহন এবং সেচনির্ভর কৃষকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
অবৈধ মজুদ ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযানও জোরদার হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে যৌথ অভিযানে বিপুল পরিমাণ ডিজেল জব্দ করা হয়েছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কারাদ- ও অর্থদ- দেওয়া হয়েছে। পিরোজপুরের ভা-ারিয়া ও মঠবাড়িয়ায় পৃথক অভিযানে ৩ হাজার লিটারের বেশি জ্বালানি তেল জব্দ করা হয় এবং দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনা হয়। একইভাবে নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও গোপালগঞ্জেও জরিমানা ও দ-াদেশের ঘটনা ঘটেছে। এসব অভিযানে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ এলেও বাজারে আতঙ্ক পুরোপুরি কমেনি।
সংকট মোকাবিলায় কিছু এলাকায় নতুন উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। চুয়াডাঙ্গায় ফুয়েল কার্ডের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো গতকাল থেকে শুরু হয়েছে জ্বালানি তেল বিক্রি। রাজবাড়ীর পাংশায় পরীক্ষামূলকভাবে অ্যাপের মাধ্যমে তেল সরবরাহব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এই পদ্ধতিতে তেল নিতে হলে চালকের নাম, গাড়ির লাইসেন্স, নম্বর প্লেটসহ বিস্তারিত তথ্য ডিজিটালি সংরক্ষণ করা হচ্ছে। একাধিকবার বা অপ্রয়োজনে তেল নেওয়ার প্রবণতা ঠেকাতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। প্রথম দিনেই একাধিক চালককে চিহ্নিত করে জরিমানা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এই পদ্ধতি সফল হলে দেশের অন্যান্য এলাকাতেও চালু করা হতে পারে।
মান পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার দাবি: জ্বালানি তেলের মান যাচাই নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। পেট্রোল পাম্প মালিকদের সংগঠন বলছে, বর্তমানে পাম্প পর্যায়ে তেলের মান পরীক্ষা করা হলেও ডিপো পর্যায়ে একইভাবে কঠোর যাচাই করা হয় না। ফলে তেলের মান খারাপ হলে দায় কার ডিপো না পাম্প তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় তারা প্রথমে ডিপো থেকে তেল সরবরাহের সময় মান পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার দাবি জানিয়েছেন।
সংগঠনটির দাবি, অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহক পাম্পে এসে তেলের মান নিয়ে অভিযোগ করেন, যা নিয়ে বিক্রেতা ও ক্রেতার মধ্যে বাকবিত-া সৃষ্টি হয়। এতে পাম্প মালিকরা অযথা হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে তারা মনে করেন। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, একই তেলের নমুনা ডিপো ও পাম্প দুই পর্যায়েই পরীক্ষা করা হলে প্রকৃত সমস্যা কোথায়, তা সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
এ ছাড়া তারা আরও বলেন, মান যাচাইয়ের নামে অনেক সময় তাৎক্ষণিক অভিযানে পাম্পগুলোকে জরিমানার মুখে পড়তে হয়, যা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই একটি স্বচ্ছ ও সমন্বিত মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরবরাহের পাশাপাশি মান নিয়ন্ত্রণেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সরবরাহ স্বাভাবিক করার চেষ্টা চললেও বাজারে চাহিদা, মজুদ প্রবণতা এবং সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে সংকট পুরোপুরি কাটছে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে রাজধানীসহ সারা দেশের পরিবহন খাত ও কৃষিতে। ফলে দ্রুত স্থিতিশীলতা ফেরাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।