লাশের বদলে ১০ লাশ চেয়ে হুমকিতে আতঙ্ক

পাবনার ঈশ্বরদীতে ছাত্রদল নেতা ইমরান হোসেন সোহাগ (২৮) হত্যাকা-ের পর উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে স্থানীয় রাজনীতি। হত্যাকা-কে কেন্দ্র করে ফেসবুক পোস্টে জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক জাকারিয়া পিন্টুর ‘একটি লাশের বদলে ১০টি লাশ’ এবং ‘ফ্যাসিবাদের পুলিশ বাঁচিয়ে রাখা যাবে না’ এমন হুমকিতে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে ঈশ্বরদী পৌর শহরের সাঁড়াগোপালপুর স্কুলের পাশে একটি চায়ের দোকানে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন সোহাগ। এ সময় মুখোশধারী একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী সোহাগকে গুলি করে এবং এলোপাতাড়ি কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে পালিয়ে যায়। সোহাগ উপজেলার পাকশী ইউনিয়নের বাঘইল মন্নবীপাড়া গ্রামের এনামুল হকের ছেলে। তিনি উপজেলা ছাত্রদলের প্রস্তাবিত কমিটির সদস্যসচিব ছিল। এ ছাড়া তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঈশ^রদী শাখার অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন।

ঘটনার পর ওই দিন রাতেই রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাজাহান ও পাবনা পুলিশ সুপার মো. আনোয়ার জাহিদ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রেজিনুর রহমান ও প্রণব কুমার সরকার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। সেই সময় তারা হত্যাকা-ের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনসহ দোষীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তারের আশ্বাস দেন।

গতকাল শুক্রবার বাদ মাগরিব জানাজা শেষে সাঁড়াগোপালপুর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে সোহাগের দাফন সম্পন্ন হয়। এ সময় জানাজায় কয়েক হাজার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে সোহাগ হত্যার প্রতিবাদে গতকাল বিকালে ঈশ্বরদীতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে ঈশ্বরদী উপজেলা ও পৌর বিএনপিসহ সব অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতারা। এ সময় সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বিএনপি নেতা ইসলাম হোসেন জুয়েল, আনোয়ার হোসেন জনি, যুবদল নেতা জাকির হোসেন জুয়েল, ছাত্রদল নেতা মোস্তাফিজুর রহমান বিটু, নাজমুল হাসান রিশাদ ও মাহ্মুদুল ইসলাম শাওন প্রমুখ।

এ সময় বিক্ষোভ মিছিলে বিএনপি নেতা হাবিবুর রহমান হাবিব, মকলেছুর রহমান বাবলু, মাহাবুবুর রহমান পলাশ ও রেজাউল করিম শাহীনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সেøাগান দেন উত্তেজিত নেতাকর্মীরা। তারা এ হত্যাকা-ের জন্য ওই বিএনপি নেতাদের দায়ী করেন।

পিন্টুর ফেসবুক পোস্ট : হত্যাকা-ের খবর ছড়িয়ে পড়লে বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থানরত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে পাবনা-৪ আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী ও বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত জাকারিয়া পিন্টু তার ফেসবুক পেজ থেকে একের পর এক আক্রমণাত্মক পোস্ট দি আমাকে হত্যার চেষ্টা করেছে। ধৈর্যের সীমা শেষ হয়ে গেছে।’

আরেকটি পোস্টে তিনি নেতাকর্মীদেও একটা লাশের বদলে ১০টা লাশ ফেলার প্রতিশোধের ডাক দেন।

পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ

জাকারিয়া পিন্টু তার পোস্টে ঈশ্বরদী থানার বর্তমান ওসির বিরুদ্ধেও ক্ষোভ জানান। ওসিকে ‘আওয়ামী লীগের স্পেশাল নিয়োগ’ দাবি করে পিন্টু লেখেন ‘ওসির সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি অশ্রাব্য ভাষা ব্যবহার করেছেন। ফ্যাসিবাদের কোনো পুলিশকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না।’

পুলিশ যা বলছে

এদিকে পুলিশের বিরুদ্ধে হুমকি ও সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে পাবনা জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) আনোয়ার জাহিদ বলেন, ‘আমরা ক্রাইমসিন ও তদন্ত নিয়ে কাজ করছি। পুলিশকে হুমকি দিয়ে ফেসবুক পোস্টের বিষয়টিও আমাদের নজরে এসেছে এবং এটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।’

নেপথ্যে দলীয় কোন্দল?

ঈশ্বরদীতে দীর্ঘদিন ধরে পাবনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবীব এবং জাকারিয়া পিন্টুর সমর্থকদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধ চলছে। কয়েক দিন আগে গত ২৩ মার্চও দুই পক্ষের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছিলেন। সোহাগের এ হত্যাকা- সেই অভ্যন্তরীণ কোন্দলেরই অংশ কি না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে গুঞ্জন রয়েছে।

বর্তমানে ঈশ্বরদীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে প্রশাসন।

এদিকে অকালে ছেলেকে হারিয়ে দিশেহারা সোহাগের মা মোসা. রেহেনা বেগম। যারাই তার বাড়িতে যাচ্ছেন খোঁজখবর নিতে, তাদেরই জিজ্ঞাসা করছেন ‘বাবা আমার সোহাগ কোথায়, তোমরা আমার সোহাগকে এনে দাও’। সোহাগের ওমর নামে চার বছরের এক সন্তান রয়েছে। স্ত্রী প্রিয়া আক্তার আবারও অন্তঃসত্ত্বা। অকালে স্বামী হারিয়ে পাগলপ্রায়। কারও সঙ্গে কথা বলছেন না তিনি। ছেলে ওমরও বাবাকে না পেয়ে বারবার চিৎকার দিয়ে কান্না করছেন। সব মিলিয়ে হৃদয়বিদারক এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে ঈশ্বরদীতে।