বাসার আঙিনায় দাঁড়িয়ে থাকা অ্যাম্বুলেন্সটি যেন শুধুই একটি যানবাহন নয়, একটি পরিবার ভেঙে পড়ার নীরব সাক্ষী। ভেতরে কফিন, সাদা কাফনে মোড়ানো নিথর দেহ। বাইরে স্বজনদের ভিড়। কিন্তু কোনো উচ্চস্বরে কান্না কিংবা বিলাপ নেই। শুধু নিঃশব্দ তাকিয়ে থাকা। যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না, এভাবেও ফিরতে পারে প্রিয় মানুষটি।
চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর ঈদগাহ বউবাজার এলাকার একটি পাঁচতলা ভবনের সামনে শনিবার সকালে এমনই এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। ভবনের
তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকেন প্রবাসী মোহাম্মদ তারেকের পরিবার।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বাহরাইনে গত ১ মার্চ রাতে প্রাণ হারান চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের বাসিন্দা এসএম তারেক। দীর্ঘ এক মাস পর শুক্রবার সন্ধ্যায় তার মরদেহ পৌঁছায় দেশে। কফিনবন্দি মরদেহটি চট্টগ্রামে পৌঁছায় রাত আড়াইটার দিকে; যেখানে অপেক্ষার প্রহর গুনছিলেন স্ত্রী, একমাত্র মেয়ে ও পরিবারের স্বজনরা।
চিকিৎসকদের পরামর্শ ছিল কফিন না খোলার। এ কারণে রাতভর লাশ সামনে থাকলেও প্রিয় মানুষটির মুখ দেখা হয়নি কারও। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে শনিবার সকালে।
জানাজার আগে অল্প সময়ের জন্য কফিন খোলা হয়। সে এক মর্মস্পর্শী মুহূর্ত। এক মাস পর বাবার মুখ দেখার সুযোগ পায় কিশোরী-কন্যা তাসনিম তামান্না। কান্নায় ভেঙে পড়েন। একপর্যায়ে বলেন ‘বাবা ফিরেছেন। একনজর দেখতে পেরেছি। দেশের মাটিতে বাবার দাফন হয়েছে এটিই সান্ত্বনা।’
ঘরের ভেতরেও তখন একই এক দৃশ্য। স্বজনদের মধ্যে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েন তারেকের স্ত্রী রোকেয়া বেগম। তাকে ঘিরে সান্ত্বনা দিচ্ছেন আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীরা। কিন্তু কোনোভাবেই তাকে বোঝানো যাচ্ছিল না।
তারেকের মামাতো ভাই মোশাররফ হোসেন জানান, লাশ বিকৃত হতে পারে এ আশঙ্কায় কফিন না খোলার নির্দেশনা ছিল। কিন্তু স্বজনদের মন তো আর মানে না। তাই রাতভর অপেক্ষার পর সকালে সীমিত পরিসরে অল্প সময়ের জন্য মুখ দেখার সুযোগ দেওয়া হয়।
সকাল সাড়ে ১১টার দিকে জানাজা শেষে মরদেহ হালিশহরের ঈদগাহ বউবাজার এলাকায় দাফন করা হয়।
পারিবারিক সূত্র জানায়, ২০০৯ সালে জীবিকার তাগিদে বাহরাইনে পাড়ি জমান তারেক। সেখানে ‘আরসি ড্রাইডক’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন তিনি। তারেক পরোপকারী ছিলেন। প্রবাসেও দেশের মানুষের জন্য কাজ করতেন। সেখানে অনেক বাংলাদেশিকে চাকরি পেতে সহায়তা করেছেন তিনি এমনটাই জানান প্রতিবেশিরা।
যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে মরদেহ দেশে আনার ব্যাপারে সহায়তার জন্য বাংলাদেশ সরকার, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তারেকের ভাই মোশাররফ। তিনি জানান, ‘বিমানবন্দরে মন্ত্রীরা লাশ গ্রহণ করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেছেন। প্রাথমিকভাবে দাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা ও পরিবারের জন্য ৫০ হাজার টাকা দিয়েছে সরকার। আরও ১০ লাখ টাকা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তারা। এর আগে স্থানীয় সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান তারেকের পরিবারকে ৫০ হাজার সহায়তা টাকা দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে তারেকের মেয়ে তাসনিম তামান্নার পড়ালেখার দায়িত্ব নিয়েছেন।
স্থানীয় সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান দেশ রূপান্তর কে বলেন, যে দিন আমি ঘটনা শুনি সেদিন থেকে মরদেহ চট্টগ্রাম আনতে লাগাতর চেষ্টা শুরু করি। তারেকের একমাত্র কন্যা তামান্নার একটাই অনুরোধ ছিলো তার পিতার লাশটা যে করেই হোক দেশে যেন আনা হয়। তাই দায়িত্ব হিসেবেই আমার চেষ্টাটুকু করেছি। আমি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, বাহরাইন ও দাম্মামের হাইকমিশনে নিয়মিত যোগাযোগ করেছি। অনেক সময় তাদের বিরক্ত করেছি। সবার প্রচেষ্টায় আজ তারেকের মৃতদেহ তার পরিবার বুঝে পেয়েছে।