ইউরোপীয় পার্লামেন্টে কয়েক দিন আগে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বাইরে ‘রিটার্ন হাব’ বা অভিবাসী আটককেন্দ্র স্থাপনের একটি প্রস্তাব পাস হয়। এ সিদ্ধান্তকে ইউরোপের অভিবাসন ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং একই সঙ্গে বিতর্কিত মোড় হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। একদিকে সীমান্ত নিরাপত্তা ও অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের যুক্তি তুলে ধরা হচ্ছে, অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলছে এ নীতি শরণার্থী সুরক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল করতে পারে।
নীতির নতুন দিক : ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ভোটাভুটিতে প্রস্তাবের পক্ষে ৩৮৯ জন এবং বিপক্ষে ২০৬ আইনপ্রণেতা ভোট দেন। ৩২ সদস্য ভোটদানে বিরত থাকেন। এই ভোটের মধ্য দিয়ে ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে ইউরোপের বাইরে অভিবাসী প্রক্রিয়াকরণ ও প্রত্যাবাসন কেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ফলে অনিয়মিতভাবে ইউরোপে প্রবেশ করা অভিবাসীদের সরাসরি ইউরোপে আশ্রয় প্রক্রিয়ায় নেওয়ার পরিবর্তে তৃতীয় দেশের নির্ধারিত কেন্দ্রে পাঠানো হতে পারে। সেখানে তাদের পরিচয় যাচাই, আইনি প্রক্রিয়া এবং প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করা হবে।
অভিবাসন সংকট, সংখ্যার বাস্তবতা : গত একদশকে ইউরোপে অভিবাসন একটি বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ২০১৫ সালে সিরিয়া যুদ্ধের সময় ইউরোপে প্রায় ১৩ লাখের বেশি আশ্রয় আবেদন জমা পড়ে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় শরণার্থী সংকট হিসেবে বিবেচিত। ইউরোপীয় সীমান্ত সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালে ইউরোপে অনিয়মিতভাবে অভিবাসনপ্রত্যাশী প্রবেশের সংখ্যা প্রায় তিন লাখ ৮০ হাজারে পৌঁছায়। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত অভিবাসন রুটগুলোর মধ্যে রয়েছে ভূমধ্যসাগরীয় মধ্য রুট, পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় রুট এবং পশ্চিম আফ্রিকা থেকে স্পেনমুখী পথ।
কঠোর নীতির পেছনে রাজনৈতিক বাস্তবতা : ইউরোপের অনেক দেশে নির্বাচনে অভিবাসন এখন অন্যতম ইস্যু। ডানপন্থি ও চরম ডানপন্থি রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে কঠোর অভিবাসন নীতির দাবি জানিয়ে আসছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি নতুন এ নীতিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, রিটার্ন হাব স্থাপনের মাধ্যমে অভিবাসীদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরও কার্যকর হবে এবং ইউরোপ একটি বিশ্বাসযোগ্য অভিবাসন ব্যবস্থার দিকে এগোবে। জার্মানি ও বেলজিয়ামের কয়েকটি ডানপন্থি দল অভিবাসী শনাক্ত ও বহিষ্কারের জন্য বিশেষ বাহিনী গঠনের প্রস্তাবও দিয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ : তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ উদ্যোগকে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে দেখছে। তাদের মতে, ইউরোপের বাইরে আটককেন্দ্র স্থাপন করলে শরণার্থীদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এসব কেন্দ্র বাস্তবে এমন জায়গায় পরিণত হতে পারে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি আটক, পরিবার বিচ্ছেদ এবং আইনি সহায়তার সীমাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে।
অফশোর আটককেন্দ্রের বিতর্ক : অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় অফশোর বা দেশের বাইরে আটককেন্দ্র স্থাপনের ধারণা নতুন নয়। অস্ট্রেলিয়া দীর্ঘদিন ধরে নাউরু ও পাপুয়া নিউগিনিতে অভিবাসী আটককেন্দ্র পরিচালনা করেছে। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো সেখানে দীর্ঘমেয়াদি আটক ও মানবিক সংকটের অভিযোগ তুলেছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যও রুয়ান্ডায় আশ্রয়প্রার্থী পাঠানোর পরিকল্পনা নেয়, কিন্তু আইনি জটিলতা ও মানবাধিকার বিতর্কের কারণে সেই পরিকল্পনা এখনো পূর্ণ বাস্তবায়নে যায়নি।
তবে পার্লামেন্টে পাস হলেও এ নীতি বাস্তবায়নের পথে এখনো অনেক প্রশ্ন রয়েছে। তৃতীয় দেশের সঙ্গে চুক্তি, আইনি চ্যালেঞ্জ, মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ এবং অর্থনৈতিক ব্যয়ের মতো বিষয়গুলো সমাধান না হলে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন জটিল হয়ে উঠতে পারে।