লজ্জা মানুষকে গুনাহ থেকে বাঁচায়

মানুষের মূল সৌন্দর্য নিহিত তার চারিত্রিক গুণাবলিতে। দেহের সাজসজ্জা, ধন-সম্পদ বা বাহ্যিক চাকচিক্য মানুষকে সম্মানিত করে না, বরং মানুষকে প্রকৃত অর্থে সম্মানিত ও মর্যাদাবান করে তার অন্তরের গুণ, নৈতিকতা ও শালীনতা। আর এসব গুণাবলির মধ্যে এমন অনন্য এক গুণ রয়েছে, যা হারিয়ে গেলে অন্য সব গুণও ধ্বংস হয়ে যায় এবং মানুষ তার মানবিক মর্যাদা হারিয়ে পশুর কাতারে শামিল হয়ে যায়। সেই গুণটি হলো লজ্জাশীলতা।

লজ্জা মানুষের অন্তরের এমন এক সৌন্দর্য, যা ব্যক্তির চিন্তা, দৃষ্টি, আচরণ ও কথাকে পরিশুদ্ধ করে তোলে। প্রকৃতপক্ষে লজ্জাই মানুষকে গুনাহ থেকে দূরে রাখে, কল্যাণের পথে চালিত করে এবং অটুট ইমানের অধিকারী বানায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘লজ্জা ইমানের একটি শাখা।’ (সহিহ বুখারি) সুতরাং যার লজ্জা নেই, তার ইমান পরিপূর্ণ নয়। তাই ইমানকে পরিপূর্ণ করতে হলে লজ্জাশীলতার গুণ অবলম্বন করতে হবে।

যার অন্তরে লজ্জা নেই, তার অন্তরে ইমানের আলোও মøান হয়ে যায়। লজ্জা মানুষকে অন্যায় ও অশ্লীলতার দ্বার থেকে ফিরিয়ে আনে, হারাম কাজ থেকে বিরত রাখে এবং আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়ে জবাবদিহির অনুভূতি জাগ্রত করে। কিন্তু আজকের বাস্তবতা অত্যন্ত দুঃখজনক, আমাদের সমাজে লজ্জাহীনতার বিষয়টি স্পষ্ট দৃশ্যমান। সমাজের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে লজ্জাহীনতার বিষ ছড়িয়ে পড়েছে। নারী হোক বা পুরুষ, উভয়ই আজ লজ্জার সীমা ভুলে নির্লজ্জতার প্রতিযোগিতায় নিমগ্ন হয়ে পড়েছে।

ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, লজ্জা হলো সম্মানের ঢাল, চরিত্রের অলংকার ও ইমানের সংরক্ষক। আজ আমাদের সামনে বড় প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, আমরা কি আমাদের পরিবার, সন্তান, সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে লজ্জাহীনতার এই সুনামি থেকে রক্ষা করতে পারব? নাকি নীরব থেকে লজ্জাহীনতার এই বিষাক্ত স্রোতে তলিয়ে যাব?

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) একবার এক আনসারি মুসলিমের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যিনি তার ভাইকে অতিরিক্ত লজ্জা-শরম না করা সম্পর্কে উপদেশ দিচ্ছিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তাকে তার অবস্থায় থাকতে দাও। কারণ লজ্জা তো ইমানেরই একটি অংশ। (সহিহ মুসলিম)

রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘লজ্জা কেবল কল্যাণই বয়ে আনে।’ তিনি আরও ইরশাদ করেন, ‘যখন তোমার মধ্যে লজ্জা অবশিষ্ট থাকবে না, তখন তুমি যা ইচ্ছা তাই করতে পারবে।’ (সহিহ বুখারি) অর্থাৎ নিজেকে কোনো খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখার অন্যতম উপায় হলো লজ্জা-শরম। যখন মানুষের মধ্যে লজ্জার অভাব থাকে, তখন সে তার খুশিমতো কাজ করতে থাকে। আর যখন মানুষ নিজের কামনা-বাসনার দাসে পরিণত হয়, তখন তার ধ্বংস অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই বাস্তবতার দিকেই ইঙ্গিত করে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যখন আল্লাহতায়ালা কোনো বান্দাকে ধ্বংস করতে চান, তখন তার কাছ থেকে লজ্জা-শরমকে ছিনিয়ে নেন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ)

হজরত আবু উমামা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে মুমিন ব্যক্তির দৃষ্টি কোনো পর নারীর দিকে চলে যায় এবং সঙ্গে সঙ্গেই সে নিজের দৃষ্টিকে নিচু করে নেয়, তাহলে মহান আল্লাহ তাকে এমন এক ইবাদত নসিব করেন, যার মাধুর্য ও স্বাদ সে নিজেই অনুভব করতে পারে।’ (মুসনাদে আহমদ)

আজকের এই সমাজ মানুষকে লজ্জার চেতনাকে ভুলে যেতে প্রলুব্ধ করছে। সংস্কৃতির ছদ্মবেশে মানুষের মনে এমন এক কুপ্রবণতা ঢুকে গেছে, যা তাকে তার স্রষ্টা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিচ্ছে। নানা মাধ্যমে মানুষকে লজ্জাহীনতা, কামনার স্বেচ্ছাচারিতা এবং অনৈতিকতার দিকে আকৃষ্ট করা হচ্ছে।

যে ব্যক্তি এই মোহময়, ব্যভিচারী ও লজ্জাহীন সমাজের সংস্কৃতির ফাঁদে পা রাখবে, সে জীবন্তভাবে প্রমাণ হবে কোরআনের সেই অমর বাণীর, ‘নিশ্চয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত।’ (সুরা আসর) এটি আসলে ইবলিস এবং তার অনুসারীদের পথ। এই পথের শেষ পরিণাম জাহান্নামের জ্বলন্ত আগ্নিকূপ।

লজ্জাশীল ও পর্দা মান্যকারী ব্যক্তি এই বিপদের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে। যারা নবীজি (সা.)-এর জীবনধারা অনুসরণ করবে, তারা লাজ-লজ্জার চেতনার মধ্য দিয়ে নিজেদের সংরক্ষণ করবে, নিজেদের দৃষ্টি, কান, জিহ্বা, হাত, পা এবং অন্তরকে নিয়ন্ত্রণ করবে। এই জীবনধারাকে সহজভাবে বলা যায় ‘লজ্জাশীল জীবন’, যেখানে লজ্জা, সংযম ও ইমানের সংরক্ষণই মানুষের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক নিরাপত্তার মূল।

অতএব, এই দুনিয়ায় মানুষে মানুষে লজ্জা প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। ঘরে-বাইরে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বাজার, সামাজিক অনুষ্ঠান, প্রতিটি ক্ষেত্রে লজ্জার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাহলে আখেরাতে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় ও লজ্জা আমাদের চরিত্র ও কর্মকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে।

সত্যিকারের সফলতা ও মুক্তি লজ্জাশীল জীবনেই নিহিত। যে ব্যক্তি এই পথ অবলম্বন করবে, সে কেবল নিজের জন্য নয়, বরং তার পরিবার, সমাজ এবং উম্মাহর জন্যও কল্যাণ বয়ে আনবে।

সুতরাং আমাদের সবাইকে লজ্জাহীনতার গুণ অবলম্বন করতে হবে। তাহলে আমরা দুনিয়ার জীবনে নানা পাপ থেকে বেঁচে থাকতে পারব এবং পরকালে মহান আল্লাহর সামনে মুক্তির আশা নিয়ে দাঁড়াতে পারব। তাই আসুন, লজ্জাশীলতার গুণ অবলম্বন করে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ অর্জন করি এবং পরিবার ও বন্ধুবান্ধবসহ কাছের সবাইকে এ গুণে গুণান্বিত হতে উদ্বুদ্ধ করি। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে আমল করার তওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক, জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া, কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা