হঠাৎ করেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়ার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে চলছে ‘গুরু-শিষ্যের’ লড়াই। চলছে দফায় দফায় গোলাগুলি ও মারামারি। সবশেষ গত সোমবার সকালে আদালতে হাজিরা দিতে যাওয়ার পথে বলুয়ারদীঘি এলাকায় যুবদলের এক কর্মীর হাতের কব্জি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। এর আগে শনিবার রাতে দুগ্রুপের মধ্যে মারামারি-গোলাগুলি হয়। এ ঘটনায় ফাহিম নামে এক কিশোরসহ চারজন গুলিবিদ্ধ হন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, নগর পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী মোরশেদ খান এবং সোবহান গ্রুপ দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। এতে হতাহতের ঘটনাও ঘটছে। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুগ্রুপের মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে মারামারি, হামলা-পাল্টাহামলা চলে আসছে বলে জানিয়েছে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র। এসব ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন এলাকাবাসী।
পুলিশ জানায়, মোরশেদ খান ও আবদুস সোবহান দুজনই নগর পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। সোবহান একসময় ছিলেন মোরশেদ খানের শিষ্য। দুজনের আছে পৃথক দুটি কিশোর গ্যাং। উভয়ের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, মারামারি, অস্ত্রবাজির অভিযোগে অন্তত দেড় ডজন করে মামলা। দুজনই একাধিকবার খেটেছেন জেল। তাদের গ্যাংয়ে সদস্য আছে ১৮ থেকে ২০ জন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০০৩ সালে অপারেশন ক্লিনহার্টের সময় যৌথ বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন মোরশেদ খান। সে সময় ছাত্রদল ক্যাডার ইকবাল ওরফে পাথরঘাটা ইকবাল, ছাত্রলীগ ক্যাডার মহিম উদ্দিন, শিবির ক্যাডার হুমায়ুনসহ শীর্ষ একাধিক সন্ত্রাসী র্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হন। এ সময় ভয়ে শহর ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান মোরশেদ খান। এরপর ২০ বছর এলাকায় আর তাকে দেখা যায়নি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর এলাকায় ফিরে আসেন মোরশেদ খান। এসেই জড়িয়ে পড়েন নানা অপরাধে। ‘শিষ্য’ সোবহানের নিয়ন্ত্রণে থাকা অপরাধের সাম্রাজ্য দখলে নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেন মোরশেদ। এ নিয়ে প্রকাশ্যে দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়ায় গুরু-শিষ্যের গ্রুপ।
বাকলিয়া মিয়াখান নগর এলাকার একাধিক বাসিন্দা নাম গোপন রাখার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মোরশেদ খান ও সোবহান গ্রুপের দ্বন্দ্বে অতিষ্ঠ বাকলিয়ার মানুষ। মাদক, ঝুট ব্যবসা, ইট-বালু ব্যবসা, চাঁদাবাজির আধিপত্য নিয়ে প্রায় সময় দুগ্রুপ মারামারি ও সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। পুলিশেরও কার্যকর ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না।’
নগর পুলিশের মুখপাত্র সহকারী পুলিশ কমিশনার আমিনুর রশিদ জানান, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে মোরশেদ খান ও সোবহান গ্রুপ প্রায় সময় দ্বন্দ্বে লিপ্ত হচ্ছে। সোমবার সকালে এক যুবকের হাতের কব্জি বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এটা দুঃখজনক ঘটনা। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। এর একদিন আগে আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে মোরশেদ ও সোবহান গ্রুপের গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ প্রতিটি ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে। অপরাধীদের ধরতে অভিযান চলছে।
এদিকে দলীয় একটি সূত্রে জানা গেছে, মোরশেদ খান ও সোবহানÑ দুজনই বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত। মাদক, ইট-বালুর ব্যবসা, ঝুট ব্যবসা, ইন্টারনেট ব্যবসা, জায়গা দখল-বেদখলের আধিপত্য নিয়েই এই ‘গুরু-শিষ্য’ দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জড়াচ্ছেন। সবশেষ গত সোমবার সকাল ১০টার দিকে আদালতে হাজিরা দিতে যাওয়ার পথে বলুয়ারদীঘি এলাকায় মিনহাজ উদ্দিন নামে এক যুবদলকর্মীর হাতের কব্জি বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। ঘটনার শিকার মিনহাজ উদ্দিন বাকলিয়া থানার মাস্টারপুল এলাকার মৃত মিজানের ছেলে। এ ঘটনার জেরে পাল্টা হামলায় আরমান ওরফে এঞ্জেল নামে আরও একজন আহত হয়েছেন। গুরুতর আহতাবস্থায় মিনহাজকে প্রথমে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে পাঠানো হয়েছে ঢাকায়।
এর আগে শনিবার রাতে বাকলিয়া থানার ময়দার মিল এলাকায় গোলাগুলিতে লিপ্ত হয় দুগ্রুপ। এতে এক কিশোরসহ চারজন গুলিবিদ্ধ হন। এ ঘটনায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করে। একটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, মোরশেদ খান বাকলিয়া মিয়াখান এলাকার বাসিন্দা। তার বাবার নাম মহসিন খান। এক সময় বাকলিয়া ছাত্রদলের আহ্বায়ক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯২ সালে বাকলিয়া থানা ছাত্রলীগ নেতা আছু হত্যা মামলার আসামি হিসেবে যাবজ্জীবন সাজা হয় মোরশেদ খানের। এ ছাড়া বাকলিয়ার রুবেল সেন হত্যা, শমসের আলী হত্যা মামলার আসামি ছিলেন মোরশেদ খান।
আদালত সূত্র জানায়, সন্ত্রাস দমনে করা একটি মামলায় পাঁচ বছর, জননিরাপত্তা আইনের মামলায় ১৫ বছরসহ বিভিন্ন মামলায় সাজা হয় মোরশেদ খানের। এর আগে বিএনপি সরকারের আমলেই সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, অপহরণসহ বেপরোয়া নানা অপরাধ সংঘটনের দায়ে একাধিকবার কারাভোগ করেন মোরশেদ খান।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আবার এলাকায় ফিরে আসেন মোরশেদ খান। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেন। পুলিশ জানায়, মোরশেদ খানের শিষ্য সোবহানও বাকলিয়া থানা পুলিশের তালিকাভুক্ত (২৮ নম্বর) সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে বাকলিয়া থানায় দুটি হত্যা মামলাসহ ১৭টি মামলা রয়েছে। তার বাবার নাম নুরুল ইসলাম। একাধিকবার জেলও খেটেছেন এই সোবহান।
পুলিশের সূত্র জানায়, মোরশেদ খান এলাকায় ফিরে আসার আগ পর্যন্ত এলাকায় মাদক, চাঁদাবাজি, ঝুট ব্যবসা, জায়গা দখল-বেদখলসহ নানা অপরাধের খাত নিয়ন্ত্রণ করতেন সোবহান। তার দলে আছে আপন সহোদর করিম, বাদশা, সাইফুল, সাজ্জাদসহ ১৮-২০ জনের কিশোর গ্যাং। ২০২৪ সালের আগস্টে এলাকায় ফেরার পর মাদক স্পটসহ নানা অপরাধ খাতের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা চালান মোরশেদ খান। মূলত এসব নিয়েই চলছে দুজনের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত। মোরশেদ খানের গ্রুপে আছেন খোরশেদ, রাজিব খান, আজম খান, শওকত, ফারুক হোসেন, কাউছার, গলাকাটা হোসেন, কালন, জাকিরসহ ১৮-২০ জন।
এর আগে ২০২৫ সালের ৮ জুন মোরশেদ খান তার অনুসারীদের নিয়ে সোবহানের আস্তানায় হানা দেন। এ সময় সোবহানের অনুসারীরা কুপিয়ে মোরশেদ খান ও তার সহযোগীদের আহত করে। ঘটনাটি ঘটেছিল বাকলিয়া থানার আলী স্টোর বিল্ডিং তক্তারপুল সংলগ্ন আবদুল করিম বাইলেনে। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তলসহ মোরশেদ খানের অনুসারী শফিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে। তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী মোরশেদ খান ও সোবহান এবং তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন কিশোর গ্যাং সদস্যদের বিরুদ্ধে কী আইনগত পদক্ষেপ নিয়েছে পুলিশ, এ বিষয়ে জানতে মঙ্গলবার বিকেলে একাধিবার কল করা হলেও মোবাইল ফোন রিসিভ করেননি নগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) হোসাইন মুহাম্মদ কবীর ভুঁইয়া।