বিশাল জলাধারের পাশে অতি সঙ্গীনভাবে দাঁড়িয়ে আছে পুরনো আমলের একটি মসজিদ। সকালের নরম আলোয় মজা পানিতে তার ছায়া ভাসছে। মসজিদের এক কোনায় অনাদরে বেড়ে উঠছে একটি তালগাছের চারা। সামনের বিরান মাঠে অনেকগুলো নতুন ইট রাখা। দেখে মনে হয় গৌরব হারানো মসজিদটির সংস্কারের জন্যই ইটগুলো এনে রাখা হয়েছে। মসজিদ আর ইটের স্তূপের মাঝখানে দুজন মানুষের উপস্থিতি যেন নিঃসঙ্গতার মধ্যে প্রাণের সঞ্চার করেছে। ছয় দশকেরও বেশি সময় আগে বাংলাদেশের পথিকৃৎ আলোকচিত্রী গোলাম কাসেম ড্যাডি মোগল আমলে নির্মিত এই ঐতিহাসিক মসজিদটির ছবি তুলেছিলেন। ছবিটি ১৯৫৯ সালে ঢাকায় তোলা মিডিয়াম ফরমেট নেগেটিভের খামের ওপর এতটুকু তথ্য ছাড়া আর কিছু লিখে যাননি ড্যাডি।
ড্যাডির তোলা মসজিদটির নাম কী, কোথায় এর অবস্থান এক বছরের বেশি সময় ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করছিলাম। মসজিদটি সম্পর্কে জানতে ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুনসহ বেশ কয়েকজন তরুণ গবেষককে ছবিটির ডিজিটাল ইমেজ পাঠাই। তারা অনুমান করে আমাকে কয়েকটি মসজিদের নাম বলেন। কিন্তু ড্যাডির তোলা ছবিটির সঙ্গে তাদের বলা মসজিদগুলোর আকৃতির সামঞ্জস্য থাকলেও পুরোপুরি মিল নেই। এক সময় হতাশ হয়ে এর আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। পরে মনে হলো, ড্যাডি যেহেতু মসজিদটির অবস্থান ঢাকায় লিখে গেছেন; তাহলে আরেকটু খোঁজ করে দেখি। কোনো কিছু মন থেকে খুঁজলে পাওয়া যায় এই কথা আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি এবং মাঝে মাঝে এর ফল পেয়েও যাই।
২০২২ সালের ২১ জুলাই দুপুরে ঢাকার লালমাটিয়া আবাসিক এলাকার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ পুরনো একটি মসজিদের সাইনবোর্ড চোখে পড়ে।
কৌতূহল নিয়ে আমি এই মসজিদ কমপ্লেক্সের ভেতরে যাই। ড্যাডির তোলা ছবিটির সঙ্গে এই মসজিদের হুবহু মিল! স্থানীয় কয়েকজনের কাছে জানতে পারি, মসজিদটির নাম ‘বিবি মসজিদ’। ১৬৬৫ সালে তৎকালীন বাংলার সুবাদার শায়েস্তা খাঁ মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। মসজিদের কাছেই দারা বিবি নামে এক শাহজাদীর সমাধি ছিল। তার নামেই মসজিদের নামকরণ করা হয়। মসজিদের পাশের পুকুরটির নামও দারা বিবির পুকুর’ জানালেন মুস্তাকিম নামের এক দোকানদার। মুস্তাকিম বললেন, ‘এই পুকুরের মাটি কেটেই ইট তৈরি করা হয়। সেই ইট দিয়ে বানানো হয় এই মসজিদ। ব্রিটিশ আমলে মসজিদটি জঙ্গলাকীর্ণ ও পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। চারদিকে ছিল ধান ক্ষেত। তখন সন্ধ্যা নামলেই বাঘ-শিয়ালের ডাক শোনা যেত। দেশভাগের পর মসজিদটি সংস্কার করা হয়।’
মসজিদকে ঘিরে বিশাল জায়গাজুড়ে নির্মিত হয়েছে জামিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসা কমপ্লেক্স। ফলে ড্যাডির তোলা ছবি ধরে বাইরে থেকে খুঁজলে মসজিদটি খুঁজে পাওয়া মুশকিল। মূল মসজিদটি ঠিক রাখা হলেও কিছু সংস্কার ও পরিবর্তন চোখে পড়ে। মসজিদের বাইরের দেয়ালে যে রঙ লাগানো হয়েছে তা বড় বেশি বেমানান মনে হলো। আদি মসজিদটির একটি গম্বুজ ও ছয়টি মিনার ছিল। সম্প্রসারণের কারণে এখন আরও চারটি মিনার যুক্ত করা হয়েছে। মসজিদের পেছনের সেই তালগাছের চারাটি এখন বেশ পরিণত। পুকুরটিও আছে আগের মতোই। তবে তালগাছ ও পুকুরটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে কল্পকাহিনির শেষ নেই। ড্যাডি যে অ্যাঙ্গেলে ছবিটা তুলেছিলেন আমি সেই অ্যাঙ্গেল থেকে একই রকম ছবি তোলার চেষ্টা করি। কিন্তু আশপাশে বড় বড় স্থাপনা গড়ে ওঠায় সেই অ্যাঙ্গেলে ছবি তোলা সম্ভব হচ্ছিল না। তবে আমার ক্যানন ওয়ান ডিএক্স মার্ক টু ক্যামেরায় কাছাকাছি অ্যাঙ্গেল থেকে ছবি তোলার চেষ্টা করি। আসলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যপট পাল্টায়। তাতে পাল্টে যায় ছবির অ্যাঙ্গেলও। তবে পঞ্চাশের দশকে কেমন ছিল ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকা, ইতিহাসের নিবিড় পাঠকদের যেন তারই বয়ান দেয় ড্যাডির তোলা এই সাদাকালো ছবি।
এই ঘটনার কিছুদিন পর আহমদ হাসান দানীর মুসলিম আর্কিটেকচার ইন বেঙ্গল বইটা আমার চোখে পড়ে। বইটি ১৯৬১ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়। বইয়ে বিবি মসজিদের একটি ছবি পাওয়া যায়। ছবিটির ক্যাপশনে লেখা হয় ‘দারা বেগম মসজিদ’। ছবিটি সামনে থেকে তোলা। আর ড্যাডির ছবিটা মসজিদের পেছন দিক থেকে তোলা। পুকুরের স্বচ্ছ পানিতে মসজিদের প্রতিবিম্ব কিংবা ছায়া পেতেই হয়তো পেছন দিক থেকে ছবিটি তুলেছিলেন ড্যাডি। ড্যাডি নিশ্চয়ই মসজিদটির সামনে থেকেও ছবি তুলেছেন। সেই ছবি আমাদের দেখার অনেক আগেই ইতিহাসের অন্ধকারে হারিয়ে গেছে।
বিবি মসজিদটির কয়েকশ গজের মধ্যেই মোহাম্মদপুরের ঐতিহাসিক সাত গম্বুজ মসজিদ। ১৬৮০ সালে মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন শায়েস্তা খাঁর পুত্র উমিদ খাঁ। এই মসজিদের পুব দিকে রয়েছে একটি সমাধি স্তম্ভ। এটি কার সমাধি কেউ জানে না। তাই স্থানীয়রা একে বলে ‘অজানা সমাধি’। সমাধিটির সামনে প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের একটি সাইনবোর্ড। তাতে লেখা ‘সমাধি স্থাপনাটি সাত গম্বুজ মসজিদেরই একটি অচ্ছেদ্য অংশ। প্রচলিত লোককথা অনুযায়ী জানা যায়, এর ভেতরে নবাব শায়েস্তা খাঁর কোনো এক কন্যার মরদেহ সমাহিত রয়েছে...।’ এই তথ্যের ভিত্তিতে অজানা সমাধিটির ব্যাপারে গবেষকরা নতুন এক দিগন্তের সন্ধান পেতে পারেন।