দেশের অ্যাভিয়েশন শিল্প শনির দশায় পড়েছে। জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত জেট ফুয়েলের উচ্চ মূল্যবৃদ্ধির হার, উচ্চ করারোপ, ভ্যাট, অগ্রিম কর আরোপের ফলে টিকিটের মূল্যবৃদ্ধি এই শিল্পকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে। এর মধ্যেই বেশ কিছু হেলিকপ্টার সার্ভিস বন্ধ হয়েছে, কয়েকটি ধুঁকছে যাত্রী না পেয়ে। উচ্চমূল্যের টিকিট কেনার সামর্থ্যরে যাত্রী কমে যাওয়ায়, এই শিল্প সম্ভাবনার দ্বার থেকে ফিরে যাচ্ছে অস্তিত্ব সংকটে। অ্যাভিয়েশন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন অ্যাভিয়েশন খাত, বিশেষ করে হেলিকপ্টার শিল্প গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যন্ত্রাংশ আমদানিতে উচ্চ শুল্ক, জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান করের চাপ ইত্যাদি তাদের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অ্যাভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে জ্বালানিকে চিহ্নিত করেছে। বর্তমান করনীতি ও শুল্ক কাঠামো অব্যাহত থাকলে দেশের হেলিকপ্টার ও এয়ারলাইনস শিল্পের টিকে থাকা কঠিন হবে। তারা ভর্তুকি ও লোকসান গুনেও আর টিকতে পারছেন না। বর্তমানে জেট ফুয়েলের প্রতি সিআইএফের দাম ১৪৯ দশমিক ৫৬ পয়সা। তার ওপর কর যুক্ত হয় ৪১ টাকা ২৮ পয়সা, যা মোট মূল্যের প্রায় ২৭ দশমিক ৬০ শতাংশ। আবার এর সঙ্গে বিপিসির অপারেশনাল খরচ আরও ১১ দশমিক ৪৫ টাকা যোগ হয়। জাতীয় রাজস্ব বিভাগের সঙ্গে মিটিং করে, এই শিল্প অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অন্জন চৌধুরী জেট ফুয়েলের আমদানি শুল্ক ও আগাম কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক বাজারে জেট ফুয়েলের দাম বেড়ে গেলে, তা অভ্যন্তরীণ করের হার সমন্বয়েরও দাবি জানান অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি। এনবিআরের চেয়ারম্যানও সংকট থেকে উত্তরণের ব্যাপারে একমত পোষণ করেন।
খাদের পাড় থেকে অ্যাভিয়েশন শিল্পের উদ্যোক্তা ব্যবসায়ীদের সমস্যা-সংকটকে অনুধাবন করতে হবে সরকারকে। মনে রাখতে হবে, বিকাশমান এই শিল্পের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। দেশের আর্থসামাজিক পরিবেশ পরিস্থিতি যতই বড় হচ্ছে ততই বাড়ছে এ খাতের ব্যবহার। মানুষ দ্রুত পৌঁছাতে চায় গন্তব্যে। একই সঙ্গে নিরাপদ ও নিশ্চিন্তে। টাকার মায়া যারা করেন না, যাদের টিকিট কেনার সামর্থ্য রয়েছে, তারা হয়তো টিকিটের মূল্যবৃদ্ধিতে ততটা নাখোশ নন। তবে টিকিটের মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেলে, তা বোঝা হতে বাধ্য। এই শিল্পের সম্প্রসারণ ও বিকাশের স্বার্থে সরকারের নজরে রাখতে হবে, কী করে এই খাতের ওপর থেকে চাপ কমিয়ে আনা যায়। আবার এটাও মনে রাখতে হবে, জ্বালানি আমদানি করতে হয়। সেই জ্বালানির ওপর করারোপ করলে, তা বোঝার ওপর শাকের আঁটির মতো ভারবাহী হয়ে উঠতে পারে। সেটাই এখন লক্ষ করা যাচ্ছে, সরকারি-বেসরকারি অ্যাভিয়েশন শিল্পের ওপর।
বিশ্বব্যাপী অ্যাভিয়েশন শিল্পের জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে, বিমানের টিকিটের মূল্য বেড়ে যাওয়া থেকেই তা অনুমান করা যায়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দুই সপ্তাহের জন্য বন্ধ হওয়ায় একধাপে জ্বালানি, বিশেষ করে জেট ফুয়েলের দাম কমে এসেছে। তবে এটা দীর্ঘস্থায়ী হবে না, যদি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরানের মধ্যে যুদ্ধ পুনরায় শুরু হয়। আমরা চাই, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অবসান। সব পক্ষের মধ্যে শুভবুদ্ধির উদয় হোক। বিশেষ করে, ট্রাম্পের মতো হাইপার ব্যক্তির হাতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হলে, তা পৃথিবীর জন্য শনির দশায় নিপতিত হতে বাধ্য। খ্রিস্টান ধর্মযাজকরা শান্তির জন্য প্রার্থনা করেছেন। মুসলিম দেশগুলোও চাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি যুদ্ধ যেন চিরতরে বন্ধ হয়। কেননা যুদ্ধের ফলে পৃথিবীর রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনকে নাস্তানাবুদ করে ফেলেছে, যা কারও কাম্য হতে পারে না। আমরা শান্তির পক্ষে। হানাহানি বন্ধ হোক, আমাদের দেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি মানবিক বিশ্বের অনুগত হোক। তাহলেই সব ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প খাত রক্ষা পাবে।