গোলাপি এখন ঢাকায়

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:৩৩ এএম

মহিলা চালিত, মহিলা পরিদর্শক ও মহিলা যাত্রী নিয়ে দেশে বাস সার্ভিস চালু হয়েছে। খবরে দেখলাম, মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) তেজগাঁওয়ে বিআরটিসি আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাস সার্ভিসের উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এবং প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশীদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সড়ক, পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘নারী যাত্রীদের শুধু বাসে ওঠার পর নয়, অপেক্ষার সময় এবং বাস থেকে নামার সময়ও নিরাপদ পরিবেশ দিতে হবে। নারীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এই সেবা শুধু উদ্বোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নিয়মিতভাবে এর মান উন্নত করতে হবে।’ তিনি জানান, ‘ঢাকার গণপরিবহনকে পরিবেশবান্ধব করতে ২০০ বৈদ্যুতিক বাস (ইভি) কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১০০টি বাস নারীদের জন্য বিভিন্ন রুটে পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব বাস কেনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’

গোলাপি বাস এবং গোলাপি পোশাক পরিহিতা চালিকারা এখন ‘টক অব দ্য টাউন’। আমি যে দেশে থাকি, সেই অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যা ৩ কোটি ছুঁতে পারেনি। এ দেশে সাধারণ বাসে চড়লে, মাঝে মধ্যে নারী চালকের দেখা মেলে। আলাদা করে নারী যাত্রীদের বাসের দরকার হয় না। পাশের দেশ ভারতের কলকাতার রেলগাড়িতে আলাদা ‘মহিলা বগি’ চলছে অনেক দিন। তাদের আলাদা বাস আছে কিনা জানি না। আমাদের স্বভাব হচ্ছে, নতুন কিছু শুরু হলে তার খুঁত বের করা। নিন্দায় যে পরিমাণ আগ্রহ আর উত্তেজনা, তার ছিটেফোঁটাও দেখি না পজিটিভ বিষয়ে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে ফিরে বলেছিলেন, ‘আই  হ্যাভ এ প্ল্যান’। কী প্ল্যান তা এখনো খোলাসা হয়নি। হয়তো তার একটি গোলাপি ‘মহিলা বাস’ চালু। এখন নেগেটিভ বিষয়গুলোতে আসি। অনেকে বলছেন, এভাবে কি নারীদের একা করা হবে? এখানে ‘একা’ বলতে পৃথকীকরণ মনে করা হচ্ছে। যারা এমনটি ভাবছেন, তাদের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়ার মতো না। নারীদের যারা ভয় পায়, তারা খুব ভালো জানে বাংলাদেশের নারী অপার শক্তির ধারক। তারা চাইলে, অনেক কিছু করতে পারে। বেশি কথা বাড়ানোর দরকার নেই। দেশটি কিন্তু সবচেয়ে বেশি সময় সরকার পরিচালনা করেছেন দুজন নারীই।

খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যত কথাই বলা হোক, অভিযোগ থাকুক না কেন তারাই ভিত্তি দিয়ে গেছেন। গণতন্ত্র আর বহুমতের প্রথম শর্ত হচ্ছে ধৈর্য এবং সহ্য করা। মতামতের ভিন্নতাকে সহ্য করতে না পারলে, গণতন্ত্র টিকবে না। এর অর্থ কিন্তু এই নয় যে,  স্বৈরতন্ত্রকে সমর্থন করা। কিন্তু গণতান্ত্রিক সব ভিন্নমতকে সাদর সম্মান জানিয়েই বলি মহিলা বাস চালু হলে নারীরা বিচ্ছিন্ন হবে, এটা মানা যায় না । মূলত এটি একটি উদ্যোগ, যাতে নারী স্বাবলম্বী হওয়ার পথ খুঁজে পাবে। নারী জেগে উঠলে, বাংলাদেশ কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে, তা আমাদের অজানা নয়। সবকিছুতে ভুল ধরা আর একে অপরের ত্রুটি বা বিরোধিতা করাই যেন আমাদের বৈশিষ্ট্য।

একটা অন্য প্রসঙ্গে আসি। দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হয়েছেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আমি জাতীয়তাবাদী দলের সমর্থক কেউ নই। বরং আমার কলাম লেখার সময়কালে, বেগম খালেদা জিয়ার সমালোচনা করে লেখার সংখ্যা বেশি। কিন্তু মনে করি, সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলাই লেখকের ধর্ম হওয়া উচিত। সেটা হয় না বা হয়নি বলেই আমাদের দেশের লেখকদের কপালে ‘দালাল’ খেতাব জুটেছে। সেটা যে খুব বাড়িয়ে, তা কিন্তু নয়। দুই বছর আগের নৌকাডুবির কা-ারীরা ভুলে যায় তাদের তেলের সমুদ্রেই বাস্তবে নৌকা দিশা হারিয়ে ফেলেছিল। যে কথা বলছিলাম, মির্জা ফখরুল ইসলাম একজন সজ্জন মানুষ। আমি লিখেছিলাম : এক দলের একজন সেক্রেটারি মুখ খুললেই দুর্গন্ধের মতো বাজে কথা বের হতো। কা, কা করার বিপরীতে এই ভদ্রলোকের নীরবতা ছিল হিরণ¥য়। তার ভাষণ মনে হতো, কোকিলের মতো। তার সাক্ষাৎকার দেখেছি মন দিয়ে। ভালোবাসা উজাড় করে রবীন্দ্রনাথের কবিতা বলেছেন। শুনেছি, রাজপথের মিছিলে তিনি নাকি রবীন্দ্রনাথ-নজরুল আওড়াতে আওড়াতে পদযাত্রা করতেন।  একজন মিতভাষী, ভদ্রলোক, অধ্যাপক দেশের রাষ্ট্রপতি হয়েছেন, যাকে কারও পায়ে কদমবুসি করতে হয়নি বা মেয়েদের নিয়ে রসালো কথা বলে পপুলারিটি চাইতে হয়নি। তার রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে আমার মতৈক্য আছে, কী নেই, সেটা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু একজন নিপাট ভদ্রলোক, শিক্ষক রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানানোর অধিকার সবার। এখন তিনি দল, মতের ঊর্ধ্বে, জাতি ও বাংলাদেশের অভিভাবক। অভিনন্দন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

পরাজিত বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়তে দেরি করেনি। বিরক্তি বা ক্রোধের পরিবর্তে, আমার করুণা হয়েছে এদের জন্য। যে মুখের জন্য, যে ভাষার জন্য এত বিপত্তি, পলায়ন আর পদ হারানো সে ভাষা এখনো তাদের দুশমন। আমার মনে হয়েছে, পরাজিতরা বোধকরি এভাবেই ক্রোধান্ধ হয়। আবারও বলছি, গোলাপি বাসের নারীকুল এবং নতুন রাষ্ট্রপতির জন্য আমাদের দেশ ও জাতির শুভ কামনা থাকা উচিত। আগে বিষয়গুলো স্থায়িত্ব পাক। এরপর দেখা যাবে, কোনটা ভালো কোনটা মন্দ। নতুন ও পরিবর্তন দুটি বিষয়কে মানতে জানলেই, আমরা এগোতে পারব। নয়তো সুচ যেমন চালুনির ছিদ্র খুঁজে পাগল হয়ে যায়, সেটাই হবে এদের নিয়তি।

লেখক : সিডনি প্রবাসী কলাম লেখক, ছড়াকার।  

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত