আমরা জানি, গ্রিন ফাইন্যান্স বা সবুজ অর্থায়ন হলো এমন একটি আর্থিক ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব, টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন রোধকারী প্রকল্পগুলোতে ঋণ বা বিনিয়োগ প্রদান করা হয়। এটি নিশ্চিত করে যে, অর্থনৈতিক কার্যক্রম যেন পরিবেশের ক্ষতি না করে। ২৩ আগস্ট দেশ রূপান্তরের প্রচ্ছদে তা-ই প্রতিফলিত হয়েছে। প্রকাশিত প্রচ্ছদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, জ্বালানি সাশ্রয় এবং শিল্প উৎপাদনে পরিবেশের ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করতে বিশ্বজুড়ে গুরুত্ব পাচ্ছে গ্রিন ইকোনমি। বাংলাদেশও সেই পরিবর্তনের পথে হাঁটছে। পরিবেশবান্ধব শিল্পকারখানা, গ্রিন বিল্ডিং, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তিতে বাড়ছে বিনিয়োগের সুযোগ। এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রিন ফাইন্যান্সও বিস্তৃত হচ্ছে। সরকারের ডেল্টা প্ল্যান-২১০০, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এবং জাতীয় টেকসই অর্থায়ন নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিবেশবান্ধব শিল্পে অর্থায়ন বাড়াতে নীতিগত সহায়তা দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকগুলোকে উৎসাহিত করা হচ্ছে গ্রিন রিফাইন্যান্স, টেকসই অর্থায়ন এবং পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে ঋণ দেওয়ার জন্য। আমরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।
আমরা জানি, পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানা নির্মাণ সহজসাধ্য বিষয় নয়; বরং বিপুল বিনিয়োগের একটি অধ্যায়। সাধারণ কারখানার তুলনায় এর নির্মাণ খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বেশি। আর অর্থায়নের পরিমাণ বাড়লেই যে অর্থনীতি সবুজ হয়ে যাবে, বিষয়টি এতটা সহজও নয়। এর সুফল পেতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন এবং এই বাড়তি বিনিয়োগ বড় ধরনের চ্যালেঞ্জও বটে। শিল্প খাত সংশ্লিষ্ট অনেকের অভিমত, গ্রিন ইকোনমিকে অনেক সময় শুধু পরিবেশ রক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা হলেও এর প্রভাব অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতেই পড়ছে। তারা এও মনে করেন, কম জ্বালানি ব্যবহার, উৎপাদন ব্যয় কমানো, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে শিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব। বিদ্যমান বিশ্ববাজার ব্যবস্থার কৌশল-ভাবনায় ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষণীয়। আমরা দেখছি, বিশ্ববাজারে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের চাহিদা বাড়ছে। তৈরি পোশাক, চামড়া, সিরামিক, টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন রপ্তানিমুখী শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পরিবেশগত মান নিশ্চিত করার বিষয়টি অধিক গুরুত্বে সামনে এসেছে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রিন ফাইন্যান্স এখন শুধু ব্যাংকের একটি বিশেষ ঋণ কর্মসূচি নয়; বরং ভবিষ্যতের শিল্প ও রপ্তানি সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি অর্থনৈতিক বিষয়, তা বলা হয়েছে দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে। দেশ রূপান্তরের প্রচ্ছদ প্রতিবেদনের সঙ্গে রয়েছে দেশের প্রথম কাতারের কয়েকটি ব্যাংকের শীর্ষজনদের এ সংক্রান্ত প্রতিক্রিয়া ও এ নিয়ে তাদের কর্মপরিকল্পনার কথা। তারা এই উদ্যোগকে শুধু আরও গতিশীলই নয়, এর সুফল কীভাবে কাক্সিক্ষত মাত্রায় পৌঁছতে পারে, এর জন্য তাদের লক্ষ্যেরও প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। অন্যদিকে উদ্যোক্তাদের বক্তব্য, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন পাওয়া গেলে শিল্পের প্রযুক্তিগত রূপান্তর দ্রুত সম্ভব। আমরা মনে করি, এত বড় উদ্যোগের বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের যূথবদ্ধ প্রয়াস দরকার। সবার আন্তরিকতা-দূরদর্শিতাও সমভাবেই জরুরি। ব্যাংকের ঋণ সুবিধার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষ জনবল, সুশাসন, সহজ ও কার্যকর ঋণ বিতরণ, নিবিড় তদারকি, সেবার পথ মসৃণ করাসহ অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিতের বিকল্প নেই।
আমরা আরও জানি, সবুজ অর্থায়ন হলো যেকোনো কাঠামোগত আর্থিক কার্যকলাপ, যা পণ্য বা পরিষেবা আরও ভালো পরিবেশগত ফলাফল নিশ্চিত করার জন্য উপযুক্ত করে বেসরকারি এবং অলাভজনক খাত থেকে টেকসই উন্নয়নের অগ্রাধিকারমূলক ক্ষেত্রগুলোতে আর্থিক প্রবাহের মাত্রা বৃদ্ধি করা। তাই আমরা মনে করি, সবুজ অর্থায়ন উদ্ভাবনী আর্থিক পদ্ধতির মাধ্যমে ইতিবাচক ও টেকসই বাহ্যিক প্রভাব সৃষ্টিকারী প্রকল্পগুলো যেন বিনিয়োগকে সমর্থন করার মাধ্যমে আর্থিক খাতের ভবিষ্যৎকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে প্রতিবন্ধকতাহীনভাবে এদিকে গভীর নজর রাখা দরকার। একই সঙ্গে জলবায়ু, জীববৈচিত্র্য এবং অন্যান্য পরিবেশগত ক্ষয় মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় অন্তর্নিহিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন সবুজ প্রবৃদ্ধির পদ্ধতিগুলোয় অন্তর্ভুক্ত রাখাও বাঞ্ছনীয়।