সন্দেহের অবকাশ নেই, রক্তস্নাত বাংলাদেশের আর্থসামাজিক, এমনকি রাজনৈতিক উন্নয়নের পথে প্রধান বাধা দুর্নীতি, ব্যক্তিস্বার্থে সরকারি দায়িত্বের অপব্যবহার। দুর্নীতি যে বাংলাদেশকে খেয়ে ফেলছে এ কথা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে থাকা চরম দরিদ্রও হাড়ে হাড়ে টের পায়। তবে চুনোপুঁটির দুর্নীতি থাকত না যদি রাঘববোয়ালরা দুর্নীতি দম্ভের সঙ্গে না দাঁড়াতে পারত। আমরা অতীতে দেখেছি দুর্নীতি নির্মূলে সরকারের তরফে যত গর্জন হয়েছে বর্ষণ হয়নি এর কিয়দংশও। সম্প্রতি দেশ রূপান্তরে সিলেট গ্যাস ফিল্ড লিমিটেডে দুর্নীতির যে চিত্র উঠে এসেছে তাতে দেখা গেছে কৌশলের মোড়কে কী ভয়াবহ কদর্যতা!
দুর্নীতি কতটা দুর্দমনীয় তার কিছুটা আভাস মেলে সরকারের দায়িত্বশীল কয়েকজনের সাম্প্রতিক কথাবার্তায়ও। ইতিপূর্বে সংবাদমাধ্যমে তাদের প্রকাশিত প্রতিক্রিয়ায় জানা যায় সরকার দুর্নীতির প্রতি জিরো টলারেন্স দেখাবে। কয়েকদিন আগে দুদক পুনর্গঠন হয়েছে এবং অনেকেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন, সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুসারে অনিয়ম-দুর্নীতির মূলোৎপাটন করবে। আমরা তো সেটাই চাই। কিন্তু দুর্নীতিবাজদের খুঁটির জোর যে কতভাবে কখনো কখনো দৃশ্যমান হয় এরই খণ্ডিত নজির সিলেট গ্যাস ফিল্ড। প্রায় সবাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা বলেছেন। পাশাপাশি সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর কথাও অতীতে বহুবার বলেছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা। অন্যদিকে তাদের সবার প্রতিশ্রুতির জন্য আমরা অনেকেই ধন্যবাদও জানিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তেমন কিছু দেখা যায়নি। মনে রাখতে হবে, সদিচ্ছা দুর্নীতি বা অনিয়ম হ্রাসে দরকারি শর্তমাত্র, যথেষ্ট শর্ত নয়। তাদের মহতি উক্তি এবং করণীয় যে চোরাবালিতে আটকে পড়তে পারে এবং তা কী কারণে সে কথা বলব সবার শেষে।
স্মরণে আসছে প্রয়াত বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ড. আকবর আলি খানের ‘পরার্থপরতার অর্থনীতি’ বই থেকে দুর্নীতি বিষয়ক কিছু প্রাসঙ্গিক বক্তব্য। আমরা সবাই জানি, দুর্নীতি দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে নতুন কিছু নয় তবে বেশিরভাগ ইতিহাসবিদ মনে করেন, ব্রিটিশ শাসনের আগে এ দেশে ব্যাপক দুর্নীতি ছিল না। ইংরেজ প্রবর্তিত শাসনব্যবস্থা দুর্নীতির জন্ম দেয় যদিও তারা নিজেরা দুর্নীতিপরায়ণ ছিল না। আকবর আলি খানের বইতে উল্লেখ রয়েছে, প্রায় ২ হাজার বছর আগে মনুস্মৃতি সংকলিত হয় যেখানে নানা অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘ৃপ্রজাদের রক্ষার দায়িত্ব নিয়ে রাজা যাদের নিয়োগ দেন তারাই ভণ্ডামি করে অন্যদের সম্পত্তি গ্রাস করে এবং রাজাকে এ ধরনের কর্মকর্তাদের হাত থেকে প্রজাদের রক্ষা করতে হবে; রাজার দায়িত্ব হলো, যেসব দুষ্ট লোক মামলার বিভিন্ন পক্ষ থেকে উৎকোচ গ্রহণ করে তাদের নির্বাসনে পাঠিয়ে দেওয়া এবং তাদের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘চাণক্যের অর্থশাস্ত্রের বয়সও প্রায় ২ হাজার বছর। চাণক্য লিখেছেন, সরকারি কর্মচারীরা দুই ভাবে বড়লোক হয় : হয় তারা সরকারকে প্রতারণা করে, অন্যথায় প্রজাদের অত্যাচার করে। জেবের ডগায় বিষ বা মধু থাকলে তা না চেটে থাকা যেমন অবাস্তব, অসম্ভব তেমন সরকারের তহবিল লেনদেন করে একটুকুও সরকারের সম্পদ চেখে না দেখা। জলে বিচরণরত মাছ কখন জল পান করে তা জানা যেমন অসম্ভব তেমন নির্ণয় সম্ভব নয় কখন দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীরা তহবিল তছরুপ করে।’
প্রসঙ্গক্রমে বলি, শুধু সরকারি কর্মচারীরাই দুর্নীতি করেন এমন কথা নেই, বেসরকারি খাতে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও প্রতারণা করা, ভেজাল মেশানো, সিন্ডিকেট গড়ে তোলা ইত্যাদির মাধ্যমে দুর্নীতি বিকাশ লাভ করে। যেমন অতীতে আমরা দেখেছি অস্থিতিশীল চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে খাদ্যমন্ত্রী হুংকার ছাড়লেন ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে এবং নামকাওয়াস্তে কিছু অভিযান চালিয়ে সবাইকে হুঁশিয়ারও করলেন, কিন্তু পরিস্থিতির খুব যে একটা হেরফের কিছু হলো তা নয়। ঋণখেলাপের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছে দুর্নীতি, আমদানি-রপ্তানিতে দুর্নীতি। আবার রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও ব্যাপক দুর্নীতির ছাপ লক্ষ করা যায়। ভারতের জনৈক রসিক ব্যক্তি বলেছেন, ‘রাজনীতিবিদরা ও ডাকাতরা একই ধরনের কাজ করে, তবে উল্টো পরম্পরায়। ডাকাতরা প্রথমে ডাকাতি করে তারপর জেলে যায়; রাজনীতিবিদরা প্রথমে জেলে যান, জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ডাকাতি করেন।’ তা ছাড়া বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে দুর্নীতির আসল হোতা প্রশাসনিক দুর্নীতির কথা নাই বা বলা হলো।
এককালে সমাজবিজ্ঞানীদের ধারণায় শেকড় গেড়েছিল এমনতর তত্ত্ব যে দুর্নীতি উন্নয়নের জন্য জ্বালানিস্বরূপ। যুক্তি হিসেবে দাঁড়াল এই, ঘুষের টাকায় লাল ফিতার দাপট দূর করা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত হাতে পাওয়া সহজ; কেননা ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না, বাবুও কাবু হয় না। ফেলো কড়ি, মাখো তেল যেখানে বিধিবদ্ধ নিয়ম, সেখানে পদে পদে ঘুষের ভূমিকা সহজে অনুমেয়। অবশ্য এ প্রতিপাদ্যটি অসার বলে প্রমাণ করেছেন পরবর্তী গবেষকরা। নিকট অতীতে এক গবেষণায় দুর্নীতির চার ধরনের কুফল চিহ্নিত করা হয়। যেমন- সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট, প্রকটতর সামাজিক বৈষম্য এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ নিরুৎসাহ। একটা প্রচলিত ধারণা, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি দুর্নীতি রোধে সাহায্য করে। কিন্তু তা যে মোক্ষম অস্ত্র নয় তার প্রমাণ স্বয়ং বাংলাদেশ। দফায় দফায় বেতন ও দুর্নীতি পাল্লা দিয়ে বাড়ে। তা ছাড়া, কত দিন আপনি বেতন বাড়াবেন যখন দুর্নীতির কারণে রাজস্ব আহরণ নিম্নমুখী? তার মানে এই নয়, প্রশাসনে সৎ কর্মচারী নেই; আছেন তবে দুর্নীতিপরায়ণ কর্মচারীর দাপটে তারা শান্তিতে থাকতে পারেন না। মুদ্রার জগৎ সম্পর্কে যেমন গ্রেসাম বলতেন, খারাপ মুদ্রা ভালো মুদ্রাকে তাড়িয়ে দেয়, তেমন এক অবস্থা।
কথায় আছে, লোম বাছতে কম্বল উজাড়! বাংলাদেশে দুর্নীতি নির্মূলে তেমন অবস্থা, সর্ব অঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দেব কোথা। তার পরও দুয়েকটা বিষয় বিবেচনা করা যায় অন্তত লাগাম টেনে ধরার জন্য। দুর্নীতি হ্রাসে সর্বপ্রথম দরকার দুর্নীতিপরায়ণদের আইন অনুযায়ী সাজা দেওয়া, তার মানে আইনের শাসন। যেমন হংকং, চিলি ও নিউ সাউথ ওয়েলসের অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশে আইনের অভাব নেই, যেমন অভাব নেই আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসার ফাঁকফোকরের। সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা, মামলাও হচ্ছে কিন্তু সে মামলার বিরুদ্ধে আপিল করে তারা আপাত স্থিতাবস্থার সুযোগ নিয়ে সুদাসলে লাভবান হচ্ছে। তা ছাড়া, প্রলম্বিত শুনানি দুর্নীতির জন্য সোনায় সোহাগা! দুর্নীতিবিরোধী অভিযান সব সমাজে সফল হয় না। শুধু যেসব দেশে প্রশাসনে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সৎ কর্মকর্তা রয়েছেন সেসব দেশে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের শাস্তি দেওয়া সম্ভব। মাঝে মাঝে অভিযান করে দুর্নীতি তাড়ানো সম্ভব নয়, আইন হলো মাকড়সার জালের মতো, যা ছোট ছোট পতঙ্গদের আটকাতে পারে, বড় পোকাদের ঠেকাতে পারে না।
দুর্নীতি নির্মূলে সরকারের সদিচ্ছা বাস্তবায়ন করতে হলে সর্বপ্রথম সরকারকে সব ব্যবসা থেকে হাত গোটাতে হবে। মার্কিন সাংবাদিক উইল রজারসের ভাষায়, ‘সরকারের কাজ হচ্ছে সরকারকে ব্যবসা-বাণিজ্যের বাইরে রাখা যদি না ব্যবসায়ীরা সরকারের সাহায্যের প্রয়োজন বোধ করে।’ একমাত্র একচেটিয়া ব্যবসা ছাড়া সরকারি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান লাভের মুখ দেখেছে এমন নজির পৃথিবীতে খুব কম আছে। বিশেষ করে সরকারি ব্যাংক কিংবা বিমানের ব্যর্থতার কথা কে না জানে। তারপরও বলতে হয়, দুর্নীতি নির্মূলের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে প্রতিটি সরকারি ব্যবসায় সংস্থায় একজন ন্যায়পাল নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। আরও জরুরি, দুর্নীতি বিষয়ক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আলাদা বেঞ্চ বা অন্য কোনো উপায় বের করতেই হবে। দুর্নীতিবাজদের প্রধান ভরসাস্থল হচ্ছে বিচারবিভাগীয় দীর্ঘসূত্রতা। তাছাড়া সার্বিকভাবে ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার দরকার যা অবশ্যম্ভাবী। কারণ সংস্কার ও সুনীতির অভাবে প্রশাসনিক, রাজস্ব, আমদানি-রপ্তানি ইত্যাদি ক্ষেত্রে দুর্নীতি নির্মূল বা অধরা থেকে যাওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। আর এসব সংস্কারের বিরুদ্ধে যারা জোট পাকিয়ে সরকারকে বিভ্রান্ত করেন তাদের মধ্যে আছেন একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ও আমলা। শর্ষের ভেতর ভূত রেখে ভূত তাড়ানো যেমন অসম্ভব তেমন এসব সংস্কারবিরোধী গোষ্ঠী ক্ষমতায় থাকলে দুর্নীতি নির্মূল অভিযান ভেস্তে যেতে পারে। প্রচণ্ড ধরনের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছাড়া বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতি নির্মূল (দুর্নীতি হ্রাস পেলেই বগলে ডুগডুগি বাজাবে জনগণ) অত সহজ হবে বলে মনে হয় না। মোট কথা, একমাত্র সুশাসন পারে দুর্নীতিমুক্ত এক বাংলাদেশ উপহার দিতে।
বলা হয়, দুর্নীতির জন্য আমরা প্রতি বছর ২-৩ শতাংশ জিডিপি কম পাই। ২০২১-২২ স্থিরমূল্যে বাংলাদেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ছিল ৩০ লাখ কোটি টাকার কিছু ওপরে। সে হিসেবে প্রতি বছর প্রায় তিনটি পদ্মা সেতুর সমপরিমাণ অর্থ খোয়া যায় শুধু দুর্নীতির কারণে। বাংলাদেশ দুর্নীতিমুক্ত হতে পারলে কোথায় তার অবস্থান হতো সহজেই অনুমেয়। দুর্নীতি নির্মূলে সরকারের সদিচ্ছার কোনো ঘাটতি নেই তা কথায় নয়, প্রমাণ দিতে হবে কাজে। শুধু কথায় যে চিঁড়া ভিজবে না- সফল হতে চাই সর্বাত্মক যূথবদ্ধ প্রয়াস। চাই সুনীতি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গভীর মনোযোগ। দুর্নীতি নির্মূলে সমভাবে জরুরি সরকারের নির্মোহ অবস্থানও। আশা করি সদাশয় সরকার এ বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে আমলে রাখবে।
লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সমাজ-বিশ্লেষক। সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।