ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা আজ বিশ্বরাজনীতির অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়। একদিকে ইরানের আপসহীন ও ‘হার না মানা’ মনোভাব, তাদের বিপ্লব-পরবর্তী আত্মনির্ভর রাষ্ট্রদর্শনের প্রতিফলন সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হচ্ছে, অন্যদিকে ইসরায়েলের লাগাতার দখলদারত্ব এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের নানা বক্তব্য এই যুদ্ধকে জটিল করে তুলছে। কখনো যুদ্ধে আমেরিকা জিতেছে, কখনো কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুঁশিয়ারি আবার কখনো আলোচনার ইঙ্গিত এই দ্বৈত অবস্থানের সংবাদ পরিবেশন করতে করতে সংবাদমাধ্যম সংবাদ পরিবেশনের গোলকধাঁধায় আবদ্ধ। এই উত্তেজনাপূর্ণ প্রেক্ষাপট আজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এতটাই গুরুত্ব পেয়েছে, বিশে^র প্রায় সব দেশের গণমাধ্যমের প্রধান আলোচ্য বিষয় এখন এই সম্ভাব্য সংঘাতকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। গত ৩০ মার্চ ইসরায়েলের পার্লামেন্ট ‘সন্ত্রাসীদের জন্য মৃত্যুদণ্ড আইন, ২০২৬’ নামে নতুন মৃত্যুদণ্ড আইন পাস করেছে। আলোচিত আইনে ‘সন্ত্রাসবাদী’র ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডকে বাধ্যতামূলক শাস্তি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি এমনভাবে করা হয়েছে, এর প্রয়োগ প্রধানত ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যেতে পারে। বিশেষ করে, দখলকৃত পশ্চিম তীর বা গাজা অঞ্চলে সংঘটিত হামলার ক্ষেত্রে। কেননা, আইনে সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞার ক্ষেত্রে সন্ত্রাসবাদ দমন আইন, ৫৭৭৬-২০১৬-এর যে সংজ্ঞা নেওয়া হয়েছে সেই সংজ্ঞা অনুযায়ী, সব সন্ত্রাসী নতুন আইনের অধীনে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হবে।
সন্ত্রাসবাদ দমন আইনে কিছু বিশেষ বিধানও রয়েছে, যেখানে সব শর্ত প্রমাণ করা না হলেও কোনো কাজকে সন্ত্রাসী কার্য হিসেবে গণ্য করা হবে। যেমন যদি কোনো হামলা অস্ত্র বা ছুরি ব্যবহার করে সংঘটিত হয়, তাহলে রাজনৈতিক বা মতাদর্শিক উদ্দেশ্য সরাসরি প্রমাণ না থাকলেও, তাকে সন্ত্রাসী কার্য হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। অর্থাৎ দখলদারী ইসরায়েলি সরকার, প্রায় যেকোনো ফিলিস্তিনিকে এই আইনের আওতায় এনে মৃত্যুদ-ের আদেশ দিতে পারে। আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিধানসংবলিত আদেশ সংশোধন করে বলা হয়েছে, এই আইনে মৃত্যুদণ্ড দিতে হলে এ ধরনের রায় দেওয়ার জন্য প্রসিকিউটরের পক্ষ থেকে মৃত্যুদণ্ডের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ কিংবা তার সমর্থন বাধ্যতামূলক নয়। সামরিক আদালতে এ ধরনের বিচারের ক্ষেত্রে রায় সর্বসম্মত হওয়ার প্রয়োজন নেই। এমনকি এই আইনের আলোকে সামরিক আদালত কাউকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করলে, সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিরক্ষা বাহিনীর কমান্ডারও তা রদ করতে পারবেন না। রায় কার্যকর করার ক্ষেত্রে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। সাধারণভাবে ৯০ দিনের মধ্যে ফাঁসি কার্যকর করতে হবে, তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে তা সর্বোচ্চ ১৮০ দিন পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে বলে আইনে উল্লেখ আছে। মানুষকে হত্যা করার এই আইনটিতে প্রচলিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইনি সুরক্ষা সীমিত করা হয়েছে। যেমন মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বসম্মত রায়ের প্রয়োজন নেই, দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির জন্য ক্ষমা বা শাস্তি লাঘবের সুযোগ নেই। আইনে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে একটি তথাকথিত ‘গ্রে এরিয়া’ ঘিরে। দখলকৃত অঞ্চলে যদি কোনো ফিলিস্তিনি ব্যক্তি ইসরায়েলি সৈন্য, বেসামরিক নাগরিক বা বসতি স্থাপনকারীদের ওপর হামলা চালায়, তাহলে ইসরায়েল সেটিকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে। কিন্তু অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে, কেউ কেউ এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে দখলদারত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বা আত্মরক্ষার চেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করে।
এই ভিন্ন ব্যাখ্যাই আইনটির সবচেয়ে সংবেদনশীল ও বিতর্কিত দিকগুলোর একটি। এর ফলে এখন আর ইসরায়েলি বাহিনীর দখলকৃত অঞ্চলে ফিলিস্তিনিরা কোনো প্রতিবাদ করতে পারবেন না। করলে এখন আর গুলি করার দরকার নেই। আইনতই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যাবে। এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের প্রধান প্রসিকিউটর করিম খান ২০২৪ সালে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করেন। যার প্রেক্ষিতে বিগত ২১ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের বিচারকরা প্রাথমিক পর্যালোচনায় মত দেন যে, অভিযোগগুলোর পক্ষে ‘যথেষ্ট প্রাথমিক প্রমাণ’ রয়েছে । এর ভিত্তিতে আদালত আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। এর অর্থ হলো, আদালত মনে করেছে অভিযোগগুলো তদন্তের জন্য যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে, যদিও এটি কোনো চূড়ান্ত রায় নয়। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে বেসামরিক জনগণের ওপর আক্রমণ চালিয়ে ক্ষতিসাধন, খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহ সীমিত বা বন্ধ করে ‘starvation’ কৌশল ব্যবহার, এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ। নেতানিয়াহুর শাসন ব্যবস্থায় এমন বিতার্কিক আইন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক হাতিয়ার হবে এ কথা নিঃসঙ্কোচে বলা যায়।
প্রকৃতপক্ষে ‘সন্ত্রাসবাদ’ শব্দটির ব্যাখ্যা সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে অত্যন্ত সংবেদনশীল । একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে একপক্ষ নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখলেও, অন্যপক্ষ তাকে প্রতিরোধযোদ্ধা হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। এ ধরনের বাস্তবতায় যদি মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত শাস্তি যুক্ত হয়, তাহলে বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, প্রমাণের মান এবং অভিযুক্তের ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকার নিয়ে উদ্বেগ থাকবে। ফলে কাগুজে আইন যতই নির্দিষ্ট মনে হোক, বাস্তবে এর প্রয়োগে বৈষম্য বা পক্ষপাতের সম্ভাবনা কোনো মতেই অস্বীকার করা যাবে না । আশার কথা হচ্ছে, খোদ ইসরায়েলের নাগরিক অধিকার সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর সিভিল রাইটস ইন ইসরায়েল (ACRI) বিতর্কিত আইনটি পাস হওয়ার পরক্ষণে, ইসরায়েলের সুপ্রিমকোর্টে একটি পিটিশন দায়ের করেছে। পিটিশনে তারা এই আইনকে অবৈধ, অমানবিক ও আদালত-বিরুদ্ধ হিসেবে ঘোষণা করার অনুরোধ করেছে এবং আদালতকে আইনটি স্থগিত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি লিগ্যাল সেন্টার আদালাত এবং আরও কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন মিলে আরেকটি জরুরি পিটিশন ইসরায়েলি সুপ্রিমকোর্টে জমা দিয়েছে। পিটিশনে তারা দাবি করেছে, আইনটি ‘বৈষম্যমূলক বিধান’ এবং এটি নির্বাচিতভাবে ও জোরপূর্বক প্রয়োগ করা হচ্ছে। তাই আদালতকে আইনটি বাতিল করার নির্দেশ দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
লেখক : আইন-পরামর্শক ও চেয়ারম্যান
ইক্ষাণ ল অ্যাসোসিয়েটস অ্যান্ড কনসালট্যান্সি ফার্ম
zzamanjakirshashi@gmail.com