যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে যে যুদ্ধের সূত্রপাত করেছিল, যুদ্ধের ৪০তম দিনে এসে প্রাণঘাতী এ যুদ্ধের লাগাম টানতে দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গতকাল বুধবার ১৪ দিনের সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে যুদ্ধরত সব পক্ষ। তবে যুদ্ধ থামলেও কিছু সংশয় রয়েই গেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে সায় দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু; তবে লেবাননে হামলা অব্যাহত থাকবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। ফলে এই যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ শুরুতে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ থেকেই গেল। ইসরায়েলের অতীত ইতিহাসও এই শঙ্কার পক্ষে কথা বলছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া গাজা শান্তিচুক্তি কার্যকর হওয়ার পরও নিয়মিতভাবে ফিলিস্তিনে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে দখলদার রাষ্ট্রটি। হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতির পরও লেবাননে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর গতকাল বুধবার রাজধানী বৈরুতসহ বিভিন্ন জায়গায় অস্বাভাবিক হামলা চালায় ইসরায়েল। স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় মাত্র ১০ মিনিটের ব্যবধানে লেবাননের প্রায় ১০০ জায়গায় হামলা চালায় দখলদারদের বিমানবাহিনী; এতে কয়েকশ মানুষ আহত ও নিহত হয়েছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্পের সামনে এর চেয়ে ভালো কোনো বিকল্প ছিল না। ওয়াশিংটনভিত্তিক চিন্তক প্রতিষ্ঠান কুইন্সি ইনস্টিটিউটের ইরানবিষয়ক নীতিবিশেষজ্ঞ ত্রিতা পার্সি আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, পরিস্থিতি অনেকটা এমন ছিল যে ট্রাম্প এই চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছেন।
এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় পশ্চিম এশিয়ার এই অঞ্চল। একদিকে যৌথ হামলায় ইরানে ব্যাপক সামরিক-বেসামরিক ক্ষতি হয়েছে, অন্যদিকে ইরানের পাল্টা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছিল ইসরায়েল ও অঞ্চলটির বিভিন্ন দেশে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা। ইরানে হামলা স্থগিতের ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্র ও তেহরান উভয় পক্ষই সাময়িক এই যুদ্ধবিরতিকে নিজেদের বিজয় বলে দাবি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানে তাদের ‘পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত বিজয়’ অর্জিত হয়েছে। হোয়াইট হাউজ থেকেও যুদ্ধবিরতিকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিজয়’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলও যুদ্ধবিরতিকে নিজেদের ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ বলে দাবি করেছে। বুধবার কাউন্সিলের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই ইরান তাদের ১০ দফা প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রহণ করতে বাধ্য করেছে। ওই প্রস্তাবে ভবিষ্যতে আগ্রাসন না চালানোর নিশ্চয়তা, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখা, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, অঞ্চলটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী প্রত্যাহার এবং ক্ষতিপূরণের কথা উল্লেখ আছে। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আগামীকাল শুক্রবার ইরান যুদ্ধ বন্ধে একটি শান্তি আলোচনা শুরুর কথা রয়েছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্র্রতিক যুদ্ধবিরতিকে ঘিরে বিশ্বরাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ইরানের মিত্র রাশিয়া ও চীন উভয়ই নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে, যেখানে সামরিক পদক্ষেপের সমালোচনা করে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে ‘একতরফা, আগ্রাসী ও উসকানিহীন হামলা’ চালায়, যার ফলাফল হয়েছে ‘শোচনীয় পরাজয়’। স্পুটনিক রেডিওকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, শুরু থেকেই মস্কো এই আগ্রাসন বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিল এবং স্পষ্ট করে বলেছিল যে, এই সংকটের কোনো সামরিক সমাধান নেই। ইরানের আরেক মিত্র চীন যুদ্ধবিরতি ও সংলাপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বলেছেন, একটি দায়িত্বশীল বৃহৎ দেশ হিসেবে চীন উপসাগরীয় অঞ্চল ও মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে থাকবে। তিনি বলেন, বেইজিং সব পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানায় এবং উত্তেজনা প্রশমনে রাজনৈতিক সমাধান ও সংলাপের পথকেই সবচেয়ে কার্যকর বলে মনে করে। ইরানের সঙ্গে ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চুক্তির তীব্র সমালোচনা করেছেন ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কড়া সমালোচনা করে তিনি একে ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে অভিহিত করেছেন। এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে লাপিদ লিখেছেন, ‘আমাদের ইতিহাসে এমন কূটনৈতিক বিপর্যয় আগে কখনো ঘটেনি। আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার মূল বিষয়গুলো নিয়ে যখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছিল, তখন ইসরায়েল আলোচনার টেবিলেই ছিল না।’ লাপিদ তার পোস্টে উল্লেখ করেন, নেতানিয়াহু কূটনৈতিক ও কৌশলগতভাবে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন এবং তিনি নিজে যেসব লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন তার একটিও পূরণ করতে পারেননি। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী আরও যোগ করেন ‘নেতানিয়াহুর অহংকার, অবহেলা এবং পরিকল্পনার অভাবের যে ক্ষতি হয়েছে, তা মেরামত করতে আমাদের বছরের পর বছর সময় লাগবে।’
কুইন্সি ইনস্টিটিউটের ইরানবিষয়ক নীতিবিশেষজ্ঞ ত্রিতা পার্সির মতে, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি পুরোদস্তুর যুদ্ধ শুরু হলে তা ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিকে ধ্বংস করে দিত। তিনি বলেন, ট্রাম্প বড় বড় হুমকির কথা বললেও সবাই জানত ইরানের জ¦ালানিসম্পদ ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় হামলা হলে ইরানও জিসিসি (উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ) দেশগুলোর ওপর পাল্টা আঘাত হানবে। এতে বিশ্ব এক ভয়াবহ জ্বালানি সংকটে পড়ত, যা বর্তমান পরিস্থিতির চেয়েও কয়েক গুণ খারাপ হতো। পার্সি বলেন, ট্রাম্পকে এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতেই হতো। তিনি দিনের শুরুর দিকে হুমকিগুলো দিয়েছিলেন, যাতে এমন একটি আবহ তৈরি করা যায় যে, সন্ধ্যায় তিনি যে চুক্তিতে পৌঁছেছেন এবং তা তার নিজের শর্তেই হয়েছে।
দুই সপ্তাহের শর্তসাপেক্ষ যুদ্ধবিরতি এবং কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি সাময়িকভাবে খুলে দেওয়ার ঘোষণায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধস নেমেছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক শেয়ার বাজারগুলোতে ফিরেছে স্বস্তির হাওয়া। দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির খবর আসার পরপরই বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫ ডলারের বেশি কমেছে। বর্তমানে এটি ৯৩ দশমিক ৮২ ডলারে লেনদেন হচ্ছে। এশীয় বাজারে লেনদেনের একপর্যায়ে তেলের দাম সর্বনি¤œ ৯১ দশমিক ৭ ডলারে পৌঁছেছিল। উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগে তেলের দাম ছিল প্রায় ৭২ ডলার; যুদ্ধবিরতির ঘোষণার আগে ব্যারেল প্রতি তেলের দাম ১১০ ডলার ছাড়িয়েছিল। জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক ৫.৪৫ শতাংশ বেড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক বেড়েছে ৭.৭ শতাংশ এবং অস্ট্রেলিয়ার বাজার বেড়েছে ২.৫৫ শতাংশ। এছাড়া হংকংয়ের হাং সেং ৩ শতাংশ এবং চীনের শেনচেন কম্পোজিট সূচক ৪ শতাংশ বেড়েছে। ইউরোপের বাজারগুলোতেও ব্যাপক উত্থান দেখা গেছে। গতকাল বুধবার ব্রিটেনের এফটিএসই ১০০ সূচক ২.৬ শতাংশ বেড়েছে। জার্মানির ড্যাক্স ৫.২ শতাংশ এবং ফ্রান্সের সিএসি ৪.৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।